নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » বীরাঙ্গনা চাইন্দাউ মারমার দুঃখগাথা

বীরাঙ্গনা চাইন্দাউ মারমার দুঃখগাথা

chandobiএকজন মানুষের কত কষ্টের কথা শুনলে অপর একজন মানুষ ব্যথিত হতে পারে তা ঠিক বলা মুশকিল। তবে চাইন্দাউ মারমার দু:খগাথা জীবনের কাহিনী শুনলে যে কেউ চোখের জল ফেলবেন নিশ্চিত। পঁচাত্তর বছর বয়সেও তিনি নিজে রান্না করে খান। মা-বাবা-ছেলে-মেয়ে; এমনকি স্বামীও বেঁচে নেই। ভিক্ষা ছাড়া এক বেলা ভাত জুটেনা তাঁর। এক টুকরো ভূমিও নেই, যেখানে আশ্রয় নেবেন। অন্যের জমিতে ৫/৭ ফুট একটি ভাংগাচুড়া ঘর তুলে বসত করছেন। অনেকের খোয়াড় ঘরটিও আরো বড় থাকে। আরো কত কষ্ট; বলার মত নয়, শোনার মত নয়, নয় সহ্য করার মতও। অথচ তারই সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র’র জন্ম হয়েছে। তিনি বাংলার একজন গর্বিত বীরাঙ্গনা। বীরাঙ্গনা চাইন্দাউ মারমার বাড়ী খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার থলিপাড়ার পাহাড়ে।
মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার কারনে ১৯৭১ সালের জৈষ্ঠ্য মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাক হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসররা থৈসাপ্রু মারমাকে ধরে নিয়ে যায়। কৌশলে তিনি পালিয়ে গেলে পাঞ্জাবীরা বাড়ীতে এসে তারই বড় বোন চাইন্দাউ মারমাকে ধরে নিয়ে যায়। বর্তমানে মহালছড়ি সোনালী ব্যাংক ও আশপাশ এলাকা তখন পাক বাহিনীর ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেখানেই আটকে রাখা হয় তাকে। প্রায় ২ মাস ধরে নানা ধরনের পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় তার ওপর। অন্যদিকে জেলার গুইমারায় আত্মœগোপনে ছিলেন ছোট ভাই থৈসাপ্রু মারমা।
ছোট ভাই একটু আধটু কথা বলতে পারলেও বড় বোন চাইন্দাউ মারমা ভালোভাবে কথা বলতে পারেননা। তাই মুক্তিযদ্ধের বহু স্মৃতিই তাঁর মুখে শোনা সম্ভব হয়নি। তবুও আকার ইঙ্গিতে আর ভাংগা ভাংগা বাংলায় অনেক তথ্যই জানা গেলো তাঁর কাছ থেকে। শোনা গেলো, পাকবাহিনী আর এদেশীয় দোসরদের নানান অপকর্মের কাহিনী।
মুখে মুখে তাকে ‘বীরাঙ্গনা’ বলা হলেও এখনো সরকারীভাবে কোন স্বীকৃতি পাননি চাইন্দাউ মারমা। স্বীকৃতি দূরে থাক, এক কেজি চালও তাঁর কপালে জুটেনি। প্রাপ্য বৃদ্ধভাতাও দেয়া হয়নি তাঁকে। পাহাড়ী বলেই কিনা তিনি বীরঙ্গনার খেতাব পাননি; এমন প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
চাইন্দাউ মারমার ছোট ভাই থৈসাপ্রিু মারমা জানান, ‘তখনো বিয়ে হয়নি চাইন্দাউ‘র। বিয়ে দেয়ার জন্য ভালো পাত্র খোঁজা হচ্ছিল। হঠাৎই যেন সব কিছু পাল্টে গেলো। বাড়ীতে আমাকে না পেয়ে পাকবাহিনীর সদস্যরা তাকে নিয়ে গিয়েছিল। ক্যাম্পে পাশবিক নির্যাতন ছাড়াও মারধর করা হয়। যখন বাড়ীতে ফিরে আসেন চাইন্দাউ মারমা, তখন সমাজ তাকে আর আগের মত দেখেনি। চাইন্দাউকে বিয়ে দেয়াটা কঠিন হয়ে যায়। দেশ স্বাধীনের কয়েক বছর পর তাকে আথিইবাই মারমার সাথে বিয়ে দেয়া হলেও সুখ হয়নি। পরে স্বামীও মারা যায়। এরপর থেকে একেবারেই একা চাইন্দাউ মারমা। দেখার মত সামর্থ্যবান কেউ নেই। বোনটি এখন যেন বোঝা।’
বীরাঙ্গনা চাইন্দাউ মারমা ভাংগা ভাংগা বাংলায় বললেন, ‘আমাকে পাঞ্জাবীরা জোর করে ধরে নিয়ে ২ মাস আটকে রাখে। সেখানে শ্লীলতাহানি ছাড়াও বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হয়। তখন দু‘একজন ভালো মানুষ আমাকে সহযোগিতা না করলে আজ বেঁচে থাকতে পারতাম না। সে সময়ের দু:খ কষ্টের সীমা ছিলনা।’
এই বীরাঙ্গনার এখন দু:খ হলো, কেউ তাকে দেখছেনা। মুক্তিযুদ্ধের এত বছরেও কেউ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসলোনা।
কেবল চাইন্দাউ মারমাই নয়; একই উপজেলার বাবুপাড়ার হ্লা¤্রাসং মারমাও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এছাড়া জেলার গুইমারার বদংপাড়ার পাইসান্দা মারমাকে পাকবাহিনী ও এদেশীয় দোসরা নানাভাবে নির্যাতন চালিয়েছে।
বাবুপাড়ার হ্লা¤্রাসং মারমার স্বামী ইন্দুমোহন চাকমা চোখে দেখেননা। ভিক্ষা করেই জীবন চালান স্বামী-স্ত্রী। দারিদ্র্যতার সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা এই বীরাঙ্গনার আজো চোখে মুখে ভয় আর হতাশার ছাপ। বীরাঙ্গনা হ্লা¤্রাসং মারমা ক্ষোভ করে বলেন, ‘বেঁচে থাকাটাই আমার অপরাধ। এমন জীবনের চেয়ে মৃত্যুই ভালো।’
হ্লা¤্রাসং মারমা জানান, ৭১ সালের ভাদ্র মাসে স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় পাকবাহিনীর সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে অন্তত ৭দিন আটকে রেখেছিল। নির্মম পাশবিক নির্যাতন চালানোর পর ছেড়ে দেয়া হয়। তিনি বলেছেন, ওসব খারাপ মানুষদের নির্যাতনের কথা বললে দীর্ঘ সময় লাগবে। বলতেও লজ্জা লাগে ওসব। এত বছরেও সরকারিভাবে কোন সহযোগিতার হাত বাড়ানো হয়নি। বৃদ্ধ ভাতাও পেলামনা। এই বীরাঙ্গনা চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তারা ভোট নিয়ে আর গরীবের কথা ভাবেননা,সরকারের দেয়া সব সুবিধা এরা নিজেরাই খেয়ে ফেলেন।
বৃদ্ধ ভাতা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে মহালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান লাব্রেচাই মারমা বলেন, বীরঙ্গণাদের সম্পর্কে কিছুই জানিনা। বৃদ্ধ ভাতা দেয়ার মালিক প্রশাসন।
এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ির সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মংসাথোয়াই চৌধুরী জানিয়েছেন, খাগড়াছড়ি জেলায় ৩ জন বীরাঙ্গনার তথ্য আছে। তবে জানা মতে এসব বীরাঙ্গনাদের জন্য সরকারীভাবে কোন সাহায্য সহযোগিতা বা স্বীকৃতি মিলেনি।
মহালছড়ি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার চলাপ্রু মারমা দু:খ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পরও বীরাঙ্গনাদের দুরাবস্থা কাটলোনা। মানবেতর জীবন যাপনকারী এসব বীরাঙ্গনাদের খোঁজ খবর নেয়ার যেন কেউ নেই। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকা সত্বেও তাদের কিছু হলোনা, আর কোন দিন তাদের জন্য কিছু হবে, প্রশ্ন রাখেন উপজেলা কমান্ডার।
মহালছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোনা রতন চাকমা বললেন, ‘বিষয়টি আমরা খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। খুব সহসাই বৈঠক ডেকে বীরাঙ্গনাদের অন্তত একটি বৃদ্ধভাতা কার্ড দেয়া হবে। এছাড়াও অন্যান্য সরকারী সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহন করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লক্ষীছড়ির ৬ সেতু নির্মাণে শ্লথগতি, চরম দুর্ভোগ

পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা লক্ষীছড়ি। যেতে হয় মানিকছড়ি উপজেলা হয়ে। মানিকছড়ি থেকে লক্ষীছড়ি …

Leave a Reply