নীড় পাতা » বর্ষপূর্তির বিশেষ লেখা » বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচন কাভারেজ ও কিছু স্মৃতি

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচন কাভারেজ ও কিছু স্মৃতি

shankar-Horeসেদিন ১৩ মার্চ। রাত তখন এগারোটা। মুঠোফোনে এলাহী ভাইয়ের কল। রিসিভ করতেই বললেন, ‘আগামীকাল তোমাদের বাঘাইছড়ি যেতে হবে। পরশু বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। নির্বাচনটা এই অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করছে না। এই প্রথম তিন আঞ্চলিক দলের প্রতিনিধিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। তাই পাঠকের কাছে বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ পরের দিন দুপুরে পাহাড় টোয়েন্টি ফোর ডট কম এর আরো দুই সহকর্মীকে নিয়ে সড়ক পথে রওয়ানা দিলাম বাঘাইছড়ির উদ্দেশে। বিকালে খাগড়াছড়িতে পৌঁছার পর চা খেতে দোকানে ঢুকলাম। আমাদের খাগড়াছড়ি টিমের সদস্য অপু দত্ত আসলেন। আমরা এক সাথে চা খাওয়ার পর খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাব ঘুরে আবারো রওয়ানা দিলাম বাঘাইছড়ির উদ্দেশে। দিঘিনালা পার হওয়ার পর বাঘাইছড়িতে ঢোকার পরই বাঘাইছড়ির সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। সন্ধ্যা হওয়ায় জোসনা আলো পাহাড়কে আরো সুন্দর করে তুলেছে। জোসনার আলোয় ঝলসানো পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা বাঘাইছড়ি পৌঁছলাম। পৌঁছে বাঘাইছড়ি বাজারে শাপলা হোটেলে উঠলাম। এর মধ্যে আমরা তিনজনই টিম মিটিং সারলাম। আমাদের লক্ষ্য যেহেতু সবার আগ্রহ রয়েছে এই নির্বাচন নিয়ে, তাই যত বেশি সম্ভব নিউজ পৌঁছানো। অন্তত বিশটা নিউজ আমরা বাঘাইছড়ি থেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। হঠাৎ কল আসল বাঘাইছড়ি পৌরসভার মেয়র সংবাদ সম্মেলন করবেন। এর কিছুক্ষণ আগে জেএসএস(এমএন লারমা) সমর্থিত প্রার্থী সুদর্শন চাকমা সংবাদ সম্মেলন করলেন। কিন্তু দেরি হওয়াতে আমরা সে সংবাদ সম্মেলনটা মিস করলাম। পরবর্তীতে স্থানীয় সংবাদ কর্মীদের সহযোগিতায় নিউজটা পাঠিয়ে দিলাম। পাল্টা সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন মেয়র। এই নিউজটাও আমরা সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দিলাম। রাতে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে আরেকটা নিউজ পাঠালাম। তবে আমাদের নিউজ পাঠাতে হয়েছে মুঠোফোনে। অর্থাৎ আমাদের সম্পাদক ফজলে এলাহী ভাই কম্পিউটারের সামনে বসা ছিলো। আর আমরা ফোন করে ওনাকে নিউজ বলে দিতাম। কারণ বাঘাইছড়িতে লো-ভোল্টেজ এর কারণে ল্যাপটপ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। যাই হোক সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম তারা সবাই উৎকণ্ঠায় রয়েছে। তাদের আশঙ্কা তিন গ্রুপই সশস্ত্র অবস্থায় রয়েছে। রাতে এলাকা দখল চলবে। তাই রাতে গোলাগুলিও হতে পারে। যাই হোক আমরা রাতেই তিন প্রার্থীর সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তাদের ব্যস্ততার কারণে আর সম্ভব হয়নি।
পরদিন সকাল আটটায় বের হলাম আমরা। আমাদের গাড়ি পুরো সদর চষে বেড়াচ্ছে। প্রার্থীরা যেদিকে ভোট দিতে যাচ্ছে আমরাও সেখানে পৌঁছে যাচ্ছি। এভাবে প্রায় দুইঘণ্টা চলল। জেএসএস প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা তাঁর এলাকায় ভোট দিতে যাওয়ার জন্য পুলিশের সাহায্য চাইলেন। তিনি নিরাপত্তাবোধ না করায় পুলিশ ছাড়া যেতে চাচ্ছিলেন না। এলাকাটি নাকি তার নিয়ন্ত্রনে নেই। তাই যেকোনো সময় তাঁর জীবননাশ হতে পারে। পরবর্তীতে তাকে পুলিশ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে রওয়ানা দিতে দেখা যায়। আমরাও তার গাড়ির পেছনে পেছনে রওয়ানা দিলাম। এর আগে ঐ ভোটকেন্দ্র থেকে আসার সময় ঐ এলাকার ভোটারদের সাথে কথা বললে তারা জানায়, বড়ঋষি চাকমা অনেক আগে থেকে তাঁর নিজের এলাকাছাড়া। আজও তার আসার সম্ভাবনা নেই। আসলে গন্ডগোল হতে পারে। তাই আমরা যখন তাঁর গাড়ি অনুসরণ করছি আমাদের মনও ঢুক ঢুক করছে। কি না কি ঘটে। তবে সেরকম কিছুই হয়নি। তিনি ভোট দিয়ে আবার চাঁদের গাড়িতে সে স্থান দ্রুত ত্যাগ করলেন। শুধু তিনিই নন আরো দুই প্রার্থী সুদর্শন চাকমা ও বিশ্বজিৎ চাকমাও নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাইরে তেমন একটা যেতে পারিনি। যাই হোক আমরা সকাল থেকে সব প্রার্থীর সাথে কথা বলে তাদের বক্তব্য সাথে সাথে এলাহী ভাইকে জানাচ্ছি। এলাহী ভাই সারা রাত জেগে থেকে প্রতিদিন ভোরে ঘুমাতে যায় আর সাধারণত সকাল দশটা বা এগারোটায় ঘুম থেকে উঠলেও সেদিন সকাল আটটা থেকে তিনি কম্পিউটারের সামনে বসা। অন্যদিকে আমাদের আরেক প্রতিনিধি সবুজ ভাই কাউখালী উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কাভার করছেন।
আমাদের নিউজ যে কি মারাত্মক ইফেক্ট করলো তা আমরা বুঝতে পারলাম কিছুক্ষণ পর। একটি ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার অপরাধে একজনকে আটক করার পর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে তৎক্ষণাৎ শাস্তি দেয়। এই নিউজটি আমরা সাথে সাথে সম্পাদককে জানিয়ে দিলে এর কিছুক্ষণ পর নিউজটি এলাহী ভাই পাহাড় পোর্টালে দিয়ে দেন। আমরা কেন্দ্রটি ত্যাগ করে আরেকটি কেন্দ্রে গেলে সেখানে এক পরিচিত এসে জানাল, তারা নিউজটা পাহাড়ে দেখার পর জাল ভোট দেয়া আপাতত বন্ধ রেখেছে। কারণ পাশের কেন্দ্রেই চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে।
দুপুর পর্যন্ত আমরা আমাদের টার্গেট পূরণ করেছি। বিকেলে ভোট শেষ করার পর রাতেই আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শহরে এসে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত হলাম। তখন প্রায় রাত আটটা। আমরা সবাই ক্লান্ত। এখন আমাদেরকে আবার জাতীয় পত্রিকায় নিউজ পাঠাতে হবে। ক্লান্তির মধ্যে আবার সেখানে বসে ঢাকার পত্রিকায় নিউজ পাঠাচ্ছি। এর মধ্যে এলাহী ভাই আমাদের কানে কানে এসে বললেন, পাহাড় অনলাইন শুরুর পর জাতীয় নির্বাচনে একদিনেই সর্বোচ্চ পাঠক হিট করেছিলো,আজ তাও ক্রস করেছে। তাই তোমাদের ধন্যবাদ। তাঁর কথা শুনে আমাদের ক্লান্তি দূর হলে গেলো। আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলাম। সারাদিনের ক্লান্তি যেনো মুহুর্তেই যেনো উধাও।  গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের ক্ষেত্রে এরকম যাত্রা আমাদের ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
আমাদের অনলাইনের বয়স তখন মাত্র সাড়ে চার মাস। কিন্তু এই সাড়ে চার মাসে আমাদের অনলাইনের যে পাঠক। পাঠকের যে প্রত্যাশা। তা সত্যিই অবাক করার বিষয়। এরপর পাঠক সংখ্যা আরো বেড়েছে। সেদিনের সর্বোচ্চ পাঠক সংখ্যা আরো অনেকবার ক্রস হয়েছে। এমনকি এমন হয়েছে একটি নিউজের জন্য একদিনে সর্বোচ্চ পাঠক সংখ্যা ক্রস করেছে। এটা পাহাড় টোয়েন্টি ফোর ডট কম এর একজন হিসেবে আমি গর্ববোধ করি। আজ আমরা একবছরে পদার্পণ করেছি। এই দিনে পাঠকের চিন্তা করলে আমরা সন্তুষ্টির স্থানে রয়েছি। আবার পাঠকদেরও সব চাহিদা আমরা পূরণ করতে পারিনি। সে চাহিদা পূরণের অঙ্গিকার করছি। সাথে সাথে একটা আপসোস থেকেই যায় সাবলিলভাবে একটা পোর্টাল চালাতে গেলে আর্থিক বিষয়টাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমরা চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এই এলাকার ব্যবসায়ীরা তেমনভাবে এগিয়ে না আসায় যেভাবে একটি অনলাইন চালানো প্রয়োজন সেভাবে অনলাইন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পাঠকের কাছে আরো নিউজ জানাতে ও একটি পেশাদার অনলাইন হিসেবে পাহাড় টোয়েন্টি ফোর ডট কম কে দাঁড় করাতে বিজ্ঞাপনের কোনো বিকল্প নেই। তাই পাহাড়ের একটি মুখপত্র হিসেবে পাহাড় টোয়েন্টি ফোর ডট কম কে প্রতিষ্ঠিত করতে এই এলাকার ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসা খুবই জরুরি। প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যেভাবে পাঠক পেয়েছি আশা করবো দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও আমরা সেভাবে পাঠক পাবো। একই সাথে বিজ্ঞাপনও পাবো।

লেখক : সদস্য,পাহাড়টীম,রাঙামাটি

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বান্দরবানে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা

বান্দরবানের লামা উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাচিং প্রু মারমার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা …

Leave a Reply