নীড় পাতা » ব্রেকিং » বন্ধুতা আর মুগ্ধতার সুবর্ণজয়ন্তী

বন্ধুতা আর মুগ্ধতার সুবর্ণজয়ন্তী

BATCH-66‘জীবনকে যদি একটা ফুলের সাথে তুলনা করা যায় তাহলে ১৯৬৬ ছিল ফোটার মুুহুর্ত। ২০১৬ হচ্ছে ঝরে পড়ার সময়। জীবনকে যদি ঋতুচক্রের সাথে তুলনা করা যায় তাহলে ১৯৬৬ ছিল ফালগুনের মত মাতানো হাওয়া আর চোখ ধাঁধানো রঙের মেলায় পাখি আর প্রজাপতিদের মহানন্দে উড়ে বেড়ানোর দিন। ২০১৬ হচ্ছে হেমন্তের পূর্ণিমা রাতে কুয়াশা সাঁতরে হ্রদ উপত্যকা পেরিয়ে দূর পাহাড়ের দিকে উড়ে যাওয়া নি:সঙ্গ পাখির করুন ডানা ঝাপটাবার শব্দে ভরপুর।’

এমন বুক জমাট বাঁধা আবেগে বলে চলেন ১৯৬৬ ব্যাচের রাঙামাটি গভর্ণমেন্ট হাই স্কুল ( আজকের রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) এর ছাত্র এবং ওই বছরই তৎকালিন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের অধীনের এসএসসি পরীক্ষায় উনিশতম স্থান অধিকারি মেধাবী ছাত্র শামসুদ্দিন আহম্মেদ। যিনি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই জেলা শহরেই যুদ্ধ করেছেন,শুধু যুদ্ধই নয় ১৭ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন বন্ধু মনীষ দেওয়ানকে সাথে নিয়ে।

সামসুদ্দিন আহম্মেদ গত ১৫ এপ্রিল রাঙামাটিতে এক অসাধারন আয়োজনের মাধ্যমে নিজেকে এবং বন্ধুদের নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। ৬৬ ব্যাচের বন্ধুদের নিয়ে আয়োজন করেছেন পঞ্চাশ বছর পূর্তি বা সূবর্ণজয়ন্তী। ঠিক ৫০ বছর পর রাঙামাটি গভর্ণমেন্ট হাইস্কুল থেকে একসাথে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া বন্ধুদের মিলিত করার দুু:সাহসী কাজটিই করলেন তিনি সত্যনন্দী,অঞ্জুলিকাসহ কজন বন্ধুকে নিয়ে।BATCH-66-01

১৫ এপ্রিল সকাল থেকেই বন্ধুরা সবাই একে একে জড়ো হন হোটেল সুফিয়ায়। সেখানে নাস্তা সেড়ে দলবেঁধে সবার গন্তব্য প্রিয় স্কুল রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে আড্ডা আর স্মৃতি মাখা সেই স্কুল চত্বর ঘুরে ফিরে দেখা,অডিটোরিয়ামে স্মৃতির জাবর কাটা আর স্কুল ক্যাম্পাসে স্মৃতিস্মারক হিসেবে তিনটি গাছের চাড়া লাগানো। তারপর পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সে দুপুরের আহারের পর মিলনায়তনে আবার সবাই একত্রিত হওয়া,কথা আর স্মৃতি যেনো ফুরোয়ইনা। কত গল্প সবার,কত স্মৃতি। বন্ধুতার সেইসব ফেলে আসা দিনের গল্পে মশগুল প্রবীণেরা বয়সের ভার ভুলে কি ভীষণ উচ্ছল।

স্মৃতিময় সময় কাটানোর এক মুুহুর্তে সেখানে হাজির ব্যাচ-৯৪ এর একঝাঁক শিক্ষার্থী। তারা ফুলেল শুভেচ্ছা জানায় পুর্বসূরীদের। আকস্মিকতায় চমকে যান ব্যাচ-৬৬ এর সবাই। জানান, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার কথা।

আয়োজনের পুরোধা শামসুদ্দীন আহমেদ বলেন, এই রাঙামাটির সাথে আমার যুদ্ধদিনের স্মৃতি মিশে আছে অনেক। মিজোরামের দেমাগ্রীর বেসক্যাম্প থেকে আমি আর মণীষ নভেম্বরে শুরুতেই রাঙামাটি ডুকি। বড় হরিণা,ছোট হরিণা,কুতুকছড়ি,কাউখালী হয়ে আমরা শহরে প্রবেশ করি ডিসেম্বরের ১৭ তারিখ। তৎকালিন ডিসি অফিসের সামনে উড়াই বাংলাদেশের পতাকা। এই মাটিতে আমার অগ্রজতুল্য বন্ধু স্বপন চৌধুরীর রক্ত মিশে আছে। রাঙামাটি তাই আমার কাছে এক তীর্থস্থান।BATCH-66-02

পুনর্মিলনীতে উপস্থিত একই ব্যাচের ছাত্রী,রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক,সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অঞ্জুলিকা খীসা ভীষণ আবেগ আপ্লুত। ভেজা কন্ঠেই বললেন, জীবনের শেষ বেলায় এসে আবারো স্কুলজীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়া,সুখ দু:খ ভাগ করে নেয়া অসাধারন অনুভূতি। মনে হচ্ছে এক জীবনের সব অপূর্ণতা মুহুর্তেই ভরে গেলো। আমি ঋণী, আমার এই বন্ধুদের কাছে। মাত্রদেড়মাসের প্রস্তুতিতেই এই আয়োজন।’

শহীদ আব্দুল আলী একাডেমির সাবেক প্রধান শিক্ষক সত্য নন্দী, এই আয়োজনের অন্যতম একজন যিনি,তিনি বলেন, পঞ্চাশ বছর পর সবাইকে একত্রিত করা খুব সহজ কোন কাজ ছিলোনা। কিন্তু সামসুদ্দিন,অঞ্জুলিকাসহ সব বন্ধুদের প্রাণান্ত সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব ছিলোনা। বন্ধুদের সাথে জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি দিন কাটালাম। নানান কারণে সবাই হয়তো আসতে পারেনি,কিন্তু যারা আছে তাদের সবার মনই পড়ে ছিলো এই আয়োজনে। ’

সাবেক পৌর কমিশনার আবুল কাশেম বলেন, এরা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু,ভালো বন্ধু। আমি এদের মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই। স্কুলে অধ্যয়ন শেষে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক বন্ধু পেয়েছি,তারা কেউ এদের মতো নয়।’

আয়োজকরা জানালেন, রাঙামাটি গভর্ণমেন্ট হাইস্কুলের মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগে তারা ৪৯ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১১ জন। আর এই পুনর্মিলনীতে একত্রিত হয়েছেন ২২ জন। সুদূর আমেরিকা থেকে বাইশ বছর পর দেশে ফেরা ওসমান গণি বন্ধুতার টানে ছুটে এসেছেন আবার প্যারালাইসিসে ঘরবন্দী হিরোণ¥য় দেওয়ানও স্বজনের কাঁধে ভর দিয়ে এসেছেন বন্ধুদের সাথে দেখা করতে।BTACH-66-03

সামসুদ্দিন বলে চলেন , ‘পঞ্চাশ বছর অনেক লম্বা সময়। পঞ্চাশ বছর পর আমরা আবার এই রাঙামাটিতে এসে একত্র হব,কেউ কি ভেবেছিলাম ? আমাদেরকে এখানে এনে কে জড়ো করেছে ? কে সে ? কিংবা এটা হয়তো একান্তই কাকতালীয় ব্যাপার। আসতে আমাদের হতোই। এ একটা উপলক্ষ্য মাত্র। নিয়তি এমনই। সে যে কী করে কাকে কোথায় নিয়ে যায়, কখন কার জন্য কি নির্দিষ্ট করে রাখে , কেউ জানেনা। বেদনার ভিতর সে আনন্দ লুকিয়ে রাখে,আনন্দের ভেতর বেদনা। এ খেলার হাটে খেলতে খেলতে শৈশব-কৈশর-তারুণ্য-যৌবন-পৌঢ়ত্ব পেরিয়ে আজ বার্ধক্যের সাঁঝ বেলায় উপনীত হয়েছি। জীবন যা দিয়েছে তার জন্য তাকে অশেষ ধন্যবাদ। যা দেয়নি তার জন্য কোন আফশোস নেই। আবার কি দেখা হবে ? কবে ?’BATCH-66-04

বেলা শেষে,সব কথা শেষে,যখন স্মৃতির ঝাঁপিও খালি হয়ে আসছিলো ধীরলয়ে,তখন পুনর্মিলনীতে উপস্থিত তিন বান্ধবী অঞ্জুলিকা খীসা,পিলু দেওয়ান আর মনিকা চাকমা একসঙ্গে গেয়ে উঠেন ‘ এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়,এ কি বন্ধনে জড়ালেগো বন্ধু’…… তখন সব বন্ধুর চোখ ছলছল। তৃতীয় শ্রেণী থেকে স্নাতক পর্যন্ত একসাথে পড়াশুনা করা এই তিনবান্ধবীর হাতে ভালোবাসার শাড়ী তুলে দেন বন্ধুরা সবাই মিলে, বিদায়বেলায়। অনিশ্চিত সময় আর জীবনের হিসেবে মেলাতে মেলাতে বাড়ীর পথ ধরা বন্ধুরা যখন ঘরে ফিরছিলো,তখন বুকে বাজছিলো যেনো দূর অতীতে ফেলে আসা স্কুলজীবন,যেখানে স্বপ্ন ছিলো,সম্ভাবনা ছিলো,ছিলো প্রাপ্তি আর পূর্ণতার নানান সমীকরণ। যে জীবনে চাইলেও আর ফেরা যাবেনা !

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জুরাছড়িতে গুলিতে নিহত কার্বারির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় স্থানীয় এক কার্বারিকে (গ্রামপ্রধান) গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারী সন্ত্রাসীরা। রোববার …

Leave a Reply