বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে দীপংকরের যূথবদ্ধ লড়াই

Dipankarr১৫ আগষ্ট ১৯৭৫। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে ঘাতকেরা। নির্মম,পাষান আর ভয়াবহ হত্যাকান্ডে সারা বিশ্ব কেঁপে উঠলেও যে প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ হওয়ার কথা ছিলো জাতির জনকের নিজের স্বদেশে,তা হয়নি প্রত্যাশামতো। অবশ্য এর পেছনেও ছিলো নানান প্রেক্ষিত।

কিন্তু ঠিকই জাতির পিতার হত্যার প্রতিবাদে তৎকালিন শাসকগোষ্ঠী ও খুনীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে একদল তরুন। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকির নেতৃত্বে গড়ে উঠা সেই প্রতিরোধে ছিলেন তৎকালিন সময়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা এবং পরবর্তীতে পাহাড়ের নেতা দীপংকর তালুকদার। নিজের সহযোদ্ধাদের নিয়ে তার সেই সংগ্রামের গল্প কজনই বা জানেন পাহাড়ের মানুষ। খোলামেলা আলোচনায় দীপংকর বলেছেন,সেইসব দিনের গল্পই। সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদের সেই লড়াইয়ে এক পাহাড়ী তরুণের অংশগ্রহণ নি:সেন্দেহে অসাম্প্রদায়িক স্বপ্নবান বাংলাদেশেরই যেনো প্রতিনিধিত্ব করছিলো প্রতিরোধ বাহিনীতে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী, রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেন,১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ঘাতকরা মনে করেছিল এদেশ থেকে আওয়ামীলীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ মাথা তুলে আর দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু ঘাতকদের সে ধারনাকে ভুল প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধুর তনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ আবার ঘুরে দাড়িয়েছে পর পর ৩ বার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।

প্রতিরোধ বাহিনীর অন্যতম নেতা দীপংকর তালুকদার সে সময়কার স্মৃতিচারন করতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নির্মম হত্যার পর তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মত আমাদের শক্তি ও সামর্থ্য ছিলোনা এবং আমার জাতীয় রাজনীতিতে কোন পদ পদবীও ছিল না। তবে সে সময় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড আমরা মেনে নিতে পারিনি। বিবেকের তাড়নায় আমার মত অনেকেই এই নির্মম হত্যাকান্ড মেনে নিতে পারিনি। সে সময় কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের নেতৃত্বে আমিসহ সৈয়দ তালুকদার, নাসিম ওসমান, শাহ আজিজ, মান্নান, তরুন, ফারুক আহমদ, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, আব্দুল হালিম, সাইদুর রহমানসহ অনেকেই আমরা প্রতিরোধবাহিনী গড়ে তুলি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে সে সময়কার লড়াইয়ে প্রায় ৭ হাজার দলীয় এবং নির্দলীয় সাথী বন্ধু প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগদেন। আর সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে কমপক্ষে ২শতাধিক লোক মারা গেছে এবং প্রায় এক হাজার কর্মী আহত হন বলেও জানান দীপংকর তালুকদার।
সেদিনের তরুণ দীপংকর আজ বয়সী চোখেও ফিরে যান দূর অতীতে। আবেগে ছলছল চোখে বলেন, আমাদের মত অনেকেই যারা সে সময় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তারা মন্ত্রী হবো, চেয়ারম্যান হবো, এমপি হবো, বিশাল অর্থ বিত্তের মালিক হবো, এই আশায় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ গড়ে তুলিনি। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছিলো, বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে ভালোবেসেছিলো, বাংলাদেশকে ভালোবেসেছিলো এবং সর্বোপরি আওয়ামীলীগকে ভালোবেসেছিল বলে প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে আওয়ামীলীগের পতাকার নীচে একজীবন কাটিয়ে দেয়া দীপংকর তালুকদার আরো বলেন, যারা জীবনবাজি রেখে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো, তারা তো কিছু চায়নি, তারা আর্দশিক চেতনা থেকে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো সেদিন। তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটা অনেক গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছিলো।
আমরা কি করতে পেরেছি, কি করতে পারিনি সেটি বড় কথা নয় সে সময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের ভুমিকা কি ছিল সেটি ইতিহাসই একদিন বলবে। আমাদের তখন উদ্দেশ্যে ছিল আন্দোলন আর আন্দোলন। এই আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে আটক হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরন করেছেন অনেকেই তবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা মনে করেছিল আওয়ামীলীগ নিশ্চিহৃ হয়ে যাবে তারা ভাবতে পারিনি আওয়ামীলীগ আবার ঘুরে দাড়াবে।

দীপংকর তালুকদার বলেন,সেইদিনের দু:সময়ের সেই প্রতিরোধ যোদ্ধাদের জন্য এবং তাদের কল্যাণে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু করা যেতে পারে। তাদের জন্য বিশেষ কল্যান তহবিল গঠন করা যেতে পারে। যেহেতু আওয়ামীলীগ এখন সরকারে আছে। যে সমস্ত এলাকায় প্রতিরোধ বাহিনীর যুদ্ধ করেছে বিশেষ করে নেত্রাকোনার দুর্গাপুর, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটসহ যে সব এলাকায় বাহিনীর সদস্যরা যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের নামে রাস্তা, স্কুল কলেজের নামকরন করা হলে তাদের প্রতি সম্মান দেখানো হবে।

বর্তমান জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের কাছে আমি জোর দাবী জানাব সে সময় যারা জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধবাহিনীতে অংশগ্রহন করেছিল, তাদের মধ্যে যে সব সাথী এখনো বেঁচে আছেন, তাদের নিয়ে একটি মহাসমাবেশ করার জন্য। সবাইকে অন্তত একত্রিত হওয়ার সুযোগ দিলে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলামেলা কথা বলতে পারবেন। বাহিনীর যে সব যোদ্ধা এখনো বেঁচে আছেন, তারা আর্দশিক রাজনৈতিক চেতনার কারনে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ এবং যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল, তারা তো জীবনে কিছু চায়নি আমরা যদি তাদের রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে পারি, তাহলে অন্তত ইতিহাসের দায়ভার কিছুটা লাঘব হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে দীপংকর তালুকদার বলেন, ১৫ আগষ্ট জাতির জনককে হত্যার পর প্রতিরোধ বাহিনী গঠনে আমাদের মুল শক্তি ছিল আর্দশিক চেতনা আর জনগনের সহযোগিতা। আমাদের প্রতিরোধ কমিটি কয়েকটা সেক্টরে ভাগ করা ছিল, বাংলাদেশে আমাদের দ্বিতীয় হেড কোয়াটার ছিল মহাদেবপুর। এ ধরনের যুদ্ধে আমরা পাহাড়ী এলাকাকে বেছে নিয়েছে কারণ যুদ্ধে আমাদের নিরাপদ জায়গা দরকার ছিলো, যেখান থেকে আমরা সংগঠিত হতে পারি। আমাদের যোদ্ধারা নিরাপদ মনে করেছিল ময়মনসিংহের পাহাড়ী এলাককেই।

১৫ আগষ্ট জাতির জনককে হত্যার পর সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় হয়। দলীয় নেতা কর্মী এবং জনগনের সহযোগিতা ছাড়া আমরা এই যুদ্ধ করতে পারতাম না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী আত্মস্বীকৃত খুনীদের মধ্যে যারা এখনো বিদেশে অবস্থান করছেন তাদের দেশে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবি জানান দীপংকর।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply

%d bloggers like this: