নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » ফোঁটা ফোঁটা পানিই যাদের জীবনের অবলম্বন

ফোঁটা ফোঁটা পানিই যাদের জীবনের অবলম্বন

rangamatir3“আর কদোক ফারে, আমা এতো দুক খনোকেও ন দেকে, ফা-ড়োত এদিক্কিন এনজিও বোলে খাজ গরের, তারা কি ন ফারে এই আদমোর মানুষগুনোর লাই কিছু গরিত?” পাহাড়ি ভাষায় গজর গজর করে এই প্রশ্নগুলো যেনো নিজেই নিজেকে করছিল সুজাতা চাকমা। চৈত্রের কাঠফাটা রোদ উপেক্ষা করে পাহাড় বেয়ে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে চলেছেন নিজের ছোট্ট কুটিরটির দিকে। এক কাঁখে কলসি আর এক কাঁখে তিন বছরের শিশুপুত্র। কলসির ওপর আরো দু’টি পাতিল সবগুলোতেই পানি ভর্তি। কনিকার পিছন পিছন ছুটছে তার তিন বছরের মেয়ে লিপিকা। মায়ের সাথে হাঁটতে গিয়ে সে অনেকটা দৌঁড়ে চলেছে, দৌঁড়ের তালে ছলাৎ ছলাৎ করে উঠছে পানি। তার কাছেও ছোট একটি কলসি, মুখে ঢাকনা থাকলেও ঢাকনা পিছলে পথে পথে পড়ে যাচ্ছে মূল্যবান পানি।
মাথার ওপর চৈত্রের রোদের চোখ রাঙানি আর পাহাড়ি পথের দুর্গমতা যেনো এতটুকু বাধা দিতে পারছে না সুজাতার চলার গতিতে। কারণ সে জানে এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে, আর দেরি হলে জুমে যেতে আরো দেরি হয়ে যাবে। ওদিকে তার মানুষটি জুমে (ফসলের ক্ষেতে) অপেক্ষায় আছে; সুজাতা খাবার নিয়ে গেলে তবেই তার সকালের নাস্তা হবে। স্বামীকে জুমে পাঠিয়ে ভোর সকালে কুয়ায় পানি আনতে গিয়েছিলেন সুজাতা। তার বড়ি রাঙামাটির বরকল উপজেলায় শীলছড়ি আদাম। এমনি করেই প্রতিদিন ভোর বেলা উঠে সুজাতাকে খাবার পানি সংগ্রহের জন্য যেতে হয় উকছড়ি পার হয়ে আরো ভিতরে। বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে কূয়ার কাছে পৌঁছুতে পারলেও অনেক সময় পানি কপালে জোটে না। কূয়ায় গিয়ে দেখা যায় তার মতো আরো অনেক গৃহিনী কলসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ফোটা ফোটা পানি জমার অপেক্ষায়। পাহাড়ের নিচে ঢাল ঘেসে তিন চারফুট প্রস্থ আর তিনফুট গভির কূয়ায় জমা পানিই আশপাশের কয়েকটি পাড়ার মানুষের সুপেয় পানি হিসেবে পরিচিত। শুধু তেষ্টা মেটানোর জল হিসেবেই এই পানি ব্যবহার করে তারা। গৃহস্থালী কাজের পানি আনা হয় পাহাড়ি ছড়া থেকে। বছরজুড়েই পানি নিয়ে এই বিড়ম্বনার মাঝে তাদের দিন পার করতে হয়। তবে শুকনা মওসুমে এই বিড়ম্বনার যেনো শেষ নেই। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কলসি কাঁখে বেরিয়ে পড়ে গৃহিনীরা। যে যত তাড়াতাড়ি কূয়ার ধারে গিয়ে পৌঁছুতে পারে তত তাড়াতাড়ি তার কপালে পানি জোটে। দশ পনের কলস পানি নেওয়ার পর এক সময় জমানো পানি শেষ হয়ে যায়। তখন পর্যন্ত যারা পানি নিতে পারেনি তাদের অপেক্ষা করতে হয় আবার পানি জমার জন্য। অনেক সময় কার আগে কে পানি নেবে এ নিয়ে বসচাও হয় একট আধটু তবে সব দুর্ভাগ্য একগতি ভেবে তারা আবার নিজেরাই মিটিয়ে নেয় সে ঝগড়া। চলে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার লড়াই। পাহাড় খুুঁচিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদন করা জুমের ফসলে খাবার জোগাড় হলে পানি যেনো পাহাড়ি জীবনের এক মহা মূল্যবান বস্তু।

আর কদোক ফারে, আমা এতো দুক খনোকেও ন দেকে, ফা-ড়োত এদিক্কিন এনজিও বোলে খাজ গরের, তারা কি ন ফারে এই আদমোর মানুষগুনোর লাই কিছু গরিত?

এমনি এক সংগ্রামী নারীর নাম সুজাতা চাকমা। প্রথম লাইনে পাহড়ি ভাষায় বলা স্বগতোক্তি বা নিজেকে করা প্রশ্নটির ভাবার্থ হলো “ এতো কষ্ট তার শরিরে আর সহ্য হচ্ছে না। কতটা কষ্ট করতে পারে একজন মানুষ?’ এই পাহাড়ি নারীর বক্তব্য হলো, ‘এতো এনজিও পাহাড়ে কাজ করে, কেউ কি পারে না এই দুঃখী মানুষগুলোর পানির কষ্ট লাঘবে কিছু করতে?”
মাথা থেকে গায়ে গড়িয়ে পড়ছে তাঁর ঘাম। হেঁটে চলছেন তো চলছেন। কথা বলার জন্য একটু দাঁড়াতে বললে, স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে ঝামটে উঠলেন, “ওহ্ ন পারিবো”। পিছনে হাঁটতে হাঁটতে অনেক কষ্টে তার সাথে কথা বলে যা জানা গেলো, পানি নিয়ে ঘরে ফেরার পর স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে তাকে জুম ক্ষেতে যেতে হবে। সে কারণেই তার এতো তাড়া। ঘরে আর কেউ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে পানির সাথে তিন বছরের শিশু পুত্রটিকেও বয়ে নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সাত বছরের মেয়েটির হাতে পানির কলসি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বললো, ওই এলাকায় এই বয়সের সব বাচ্চাই মায়ের সাথে পানি আনতে দুই কিলোমিটার অনায়াসে পাড়ি দেয়।
আশপাশে কোনো ভালো পানির উৎস আছে কিনা, জানতে চাইলে সুজাতা জানালো, তিন গ্রামে কোনো টিউবয়েল বা রিং ওয়েল নেই। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সেই কবে দু’টি নলকূপ বসিয়েছিল এক পর্যায়ে তা বিকল হওয়ার পর, সারানোর কাউকে পাওয়া যায়নি। শুধ সুজাতার শীলছড়ি আদামই নয়, এভাবে তন্যাছড়ি, বটতলী, হাজাছড়া, উকছড়ি, বরুনাছড়ি, শিলারডাক, চেয়ারম্যানপাড়া, নাইমাছড়া, পিক্কাছড়ি, চেগেয়াছড়ি, পিচকিছড়া, মাইতছড়ি প্রভৃতি এলাকার পাহাড়ি নারীরা এভাবেই প্রতিনিয়ত পানি সংগ্রহের সংগ্রাম করে দিনাতিপাত করছে। বাঁচার তাগিদে পানি সংগ্রহের এই নিয়তি তারা মেনেই নিয়েছে। তবু মাঝে মাঝে বুকে চেপে থাকা অদম্য ক্ষোভ উথলে ওঠে, ‘যারা ভোটের সময় নানা মিষ্টি কথা নিয়ে তাদের দুয়ারে আসে’ তারা তাদের জন্য কি করে। গ্রীষ্মের শুরুতে চৈত্রের দাবদাহে গরমের মাত্রা যখন বেড়ে যায়। তখন তাদের ভাষায় “দুক” (কষ্ট) অসহ্য হয়ে উঠে। পাহাড়ি পথে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যে পরিমাণ পানি আনা যায়, তার চাইতে শরীরে ঘাম যেন আরো বেশি বের হয় সুজাতার। ভোরে গিয়েছিল পানি আনতে কিন্তু পৌঁছুতে সামান্য দেরি হওয়ায় সব মিলিয়ে তার তিনটি মূল্যবান ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে পানি আনার কাজে।
সুজাতার বাড়ি শীলছড়ি, পাহাড়ের ওপর তাঁর বাড়িটা। সাতবছরের মেয়ে লিপিকাও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ভোর হওয়ার আগে। এরপর শুরু হয় তাঁর জীবন সংগ্রাম। তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে। স্বামী কৃষি কাজ করেন। সুজাতা দেবী ও তাঁর স্বামী প্রতিদিন সকাল হওয়ার সাথে সাথে রওয়ানা দেন নিজেদের জুমক্ষেতে কাজ করার জন্য। সামনে জুমচাষের জন্য জমি প্রস্তুত করতে হবে। বিকেল পর্যন্ত চলে জুমের কাজ। এরপর বাড়ি ফেরা। বাড়িতে ফিরেই কলসি ও ডেসকি নিয়ে আবার যেতে হয় কয়েক কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি ছড়ায়। পানি সংগ্রহের পর তা বাড়িতে নিয়ে আসার পর শুরু করে রাতের খাবার তৈরি। এ যেনো ছকে বাঁধা এক সংগ্রামী জীবন।
সুজাতা জানান, পরিশ্রম ছাড়া অন্য কিছু চিন্তাও করতে পারি না আমি। আমাদের সংগ্রাম অর্থ বা সম্মানের জন্য নয়। আমাদের এই পরিশ্রম জীবন টিকে থাকার লড়াই। এইযে এতদূর থেকে পানি আনা তাও কোনো কষ্ট মনে হয় না, যখন পানি নিয়ে ঘরে পৌঁছি, তখন তা আর কষ্টকর বলে মনে হয় না। আর এই কষ্ট না করলে তো মরে যেতে হবে। তিনি আরো জানান, এছাড়াও তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নিয়ে হাটে যেতে হয়। তা বিক্রি করে ঘরের জন্য জিনিসপত্র ক্রয় করতে হয়।
সুজাতার মতো সকল পাহাড়ি নারীর একটাই চাওয়া, সাহেবরা যেনো তাদের জন্য অন্তত খাবার পানির বন্দোবস্ত করে দেন। তারা শুনেছেন বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রামে অনেক এনজিও খাবার পানির জন্য নানাভাবে কাজ করে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, পাহাড়ি ঝর্ণার ফ্লো কাজে লাগিয়ে পাইপ লাইন স্থাপন করা, তারা নলকূপ, রিং ওয়েল অথবা সাধারণ নলকূপ। কিন্তু এসব শুধু শুনেই আসছেন। এর সুখ আর তাদের কপালে জোটে না। তিনি এও শুনেছেন একবার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসার পর এটার ব্যবস্থাপনার জন্য আর কেউ না যাওয়ায় এসব প্রকল্পের অধিকাংশই অকালে নষ্ট হয়ে যায়।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

অ্যাডভেঞ্চার উৎসবের মাধ্যমে ট্যুরিজমকে জনপ্রিয় করা সম্ভব: পার্বত্য মন্ত্রী

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্প্রীতি অঞ্চল অভিহিত করে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঊশৈসিং এমপি বলেছেন, খেলাধূলার …

Leave a Reply