নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » সাংবাদিক শৈলেন দে : যাকে চিনতে ও বুঝতে চায়নি পাহাড়ের মানুষ

সাংবাদিক শৈলেন দে : যাকে চিনতে ও বুঝতে চায়নি পাহাড়ের মানুষ

Soilen-coverজেগে আছো, অন্তরে তুমি
রাঙামাটি শহরের বয়স যেটুক, সমান বয়স কয়েকটি পরিবারের। চাকমা রাজ পরিবার অথবা দেওয়ান-খীসা-তালুকদার; সবই ম্লান ছিলো ‘বঙ্গ গোষ্ঠী’র কাছে। ‘বঙ্গলক্ষ্মী মেডিকেল হল’। এ এক ইতিহাস, চিকিৎসা সেবা গ্রহীতাদের কাছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ক্রান্তিকালেও পরিবারটির কাছে অনুরোধ গিয়েছিলো, তাঁরা যেনো দেশত্যাগ না করেন। আজ বেঁচে নেই রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি সাইদুর রহমান। তিনি প্রয়াত হয়েছেন, অনেক আগেই; অতি সম্প্রতি প্রয়াত হলেন সাংবাদিক শৈলেন দে’ও। ‘বঙ্গলক্ষ্মী মেডিকেল হল’-র উত্তরাধিকারী প্রিয় শৈলেন দা, মারা যাবার পর ‘তুষের আগুন’র মতোই যেনো রাঙামাটির প্রবীন বাসিন্দাদের কাছে স্মৃতি জাগানিয়া হয়ে ধরা দিচ্ছে, সেসব সময়ের সুখ অথবা দুঃখবহ সেসব স্মৃতি।
বেশ ক’মাস হলো শৈলেন দা’র সাথে বিচ্ছিন্ন হলাম। দেশদ্রোহী হতে চাইনা, কিন্তু প্রায়শই আমি স্বজন অথবা পরিবার দ্রোহী অন্য এক মানুষ হয়ে উঠি। বন্ধু দ্রোহিতায় আমার জুড়ি মেলা ভার। বন্ধুতা অথবা বন্ধুত্বের উষ্ণতা যেনো, আমার জন্য মামুলি ব্যাপার।
কতো বন্ধুকে সর্ম্পকের জায়গা থেকে সরিয়ে নৈর্ব্যত্তিক  করে নিই; নিতান্তই নিজের স্বার্থেই। আবার কোন কোন বন্ধুকে নিজের প্রয়োজনেই অপরিহার্য করে নিই; তেমনিই এক অগ্রজ অথবা বন্ধু শৈলেন দে। তিনি প্রয়াত হয়েছেন, সপ্তাহ খানেক হয়।
তাঁর জন্য মায়াকান্না করার মতো তাঁর প্রচুর স্বজন রয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর যথেষ্ট পরিমাণ নিকটাত্মীয় আছেন, যাঁরা তাঁকে মনে রাখবেন; অনন্তকাল।
শৈলেন দে, কেনো এতো প্রিয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তাঁকে আবিষ্কার করি অন্যভাবে, অন্য এক মানুষকে। যাঁর অসামান্য প্রতিভা আর শ্রম ঋদ্ধ করেছে, পাহাড়িয়া শহর রাঙামাটিকে। কাপ্তাই বাঁধের বেদনা অথবা একাত্তরের আত্মপ্রকাশের ক্রান্তিকাল, সবটাই যেনো বহন করেছেন রক্ত আর উত্তরাধিকারের স্বগত চেতনা দিয়েই।
তিনি আজ নেই। প্রয়াত হয়েছেন; বেশ ক’দিন হলো।

তাঁকে নিয়ে ভাবার অথবা নষ্টালজিক হবার সীমানা অনেক বেশী কম। তবুও মফস্বলের এক অমিত সৎ আর চেতনা সঞ্চারি মানুষকে স্মরণ করাই যেনো, আমার স্বভাবজাত।
তাঁকে মনে রাখেনি, প্রিয় রাঙামাটি শহর। শুধু তাই নয়; তাঁর সততা, সাহস আর র্নিমোহ সাংবাদিকতা ভীষণ ভয় এবং শংকায় ফেলে দিয়েছে, জীবিত সাংবাদিকতাকে।
সাংবাদিকতা এই ভুখন্ডে কখনো ধুয়ো তুলসীপাতা ছিলোনা। এখনও তাই-ই। গণমাধ্যম কখনো কখনো জনশ্রত্রু’র মতো হয়ে উঠে। স্বাধীন বাংলাদেশে তাই-ই দেখছি, আমাদের প্রজন্ম।
কিন্তু কিছু কিছু মোনাজাত উদ্দিন অথবা শৈলেন দে’দের মতো মানুষ, নিষ্কলুষ মৃত্যু’র বিণিময়ে স্মরণ করিয়ে দেন; তাঁরা কঠিন নিক্তিতে মাপা সৎ ছিলেন।

গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি সরকারী কলেজে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পোশাকের জেদ্ ধরে পুরো জেলা শহরেই মারদাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলো, সাম্প্রদায়িক প্রজন্ম।
সে সময় শৈলেন’দা দৈনিক রাঙামাটি নামের একটি দৈনিকে কর্মরত ছিলেন। বন্ধুবর ফজলে এলাহী, ছিলেন ওই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক।
তাঁর কারণেই কয়েকবার ঢুঁ মেরেছিলাম, সেই হাউজে। তারও আগে একসাথে কাজ করেছিলাম, পাহাড়ের প্রথম দৈনিক ‘গিরিদর্পণ’-এ।
প্রিয় ও প্রয়াত শৈলেন’দার জীবন-যৌবন আর পৌঢ়ত্ব কেটেছে, গিরিদর্পণ’র জঠরেই। ১৯৭৮ সাল থেকে টানা সাতাশ বছর। নীতি আর নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি ছাড়লেন, ‘গিরিদর্পণ’। তিনি নিরেট সাংবাদিকতাই করেছেন, জীবনের পুরোটা সময়।
তাঁর চোখের সামনে রাঙামাটির সাংবাদিকতা, সংবাদকর্মী অথবা তথাকথিত সাংবাদিকরা ফুলে-ফেঁপে বড়ো হয়েছেন। অথচ অর্ন্তগত আভিজাত্য আর রুচির কারণে বড়ো হতে পারেননি, তিনি। রাঙামাটি শহরে যেক’টি বাঙ্গালী পরিবার ‘এলিট’ অথবা সমৃদ্ধ-স্বয়ংসম্পূর্ন ছিল; শৈলেন’দারা তাই ছিলেন।
আজ, তিনি নেই। নেই তাঁর ফর্সা-উজ্জল প্রাণবন্ত মুখটি। অম্লান সেই মুখের পানে চেয়ে আছি যেনো গভীর যৌবনবতী জোছনার রাতেও। মনে হয় কাপ্তাই হ্রদের রূপোলী ঢেউগুলো ডাকছে, প্রিয় শৈলেন’দাকে।

অভিমান; সততার অলংকার
কী এমন অভিমান ছিলো, তাঁর। হয়তো তার চেয়েও বেশী ছিলো বেদনা। সেই বেদনা নিয়েই তিনি চলে গেলেন, পরপারে।
একাত্তরের স্বজনহারা রাঙামাটি শহরের যে ক’টি পরিবার মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশালাকার ত্যাগের পরাকাষ্টা সৃষ্টি করেছেন; প্রিয় শৈলেনদা’র পরিবার তার চেয়েও বেশীকিছু।
কী হারাননি, তিনি ও তাঁর পরিবার। বাবা-কাকা-ভাই, সব-ই হারালেন তিনিই। তবুও তাঁর পরিবার পাননি, যথাযথ স্থানীয় ও জাতীয় মূল্যায়ন। এই আক্ষেপ তাঁকে ছুঁয়ে যায়নি। আর যায়নি বলেই শক্ত মনোবল নিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন জীবনের প্রায় পুরোটা সময়। সেই ১৯৭৮ সালে শ্রদ্ধেয় এ কে এম মকছুদ’দার সাথে শুরু। দীর্ঘ ২৭ বছর নিরন্তর কাটিয়েছেন, রিজার্ভ বাজারের সেই কুটির কক্ষে। তারপর দৈনিক আজাদী, ভোরের কাগজ………। জীবনের শেষ সময়ে কেনো জানি দৈনিক রাঙামাটিতে?
অভিমানীতার চরম এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন, তারুণ্য-ই জীবনের শেষ অবলম্বন, হয়তো।
অসাধারণ সাহস আর ধৈর্য্য নিয়েই তিনি মনোযোগী হয়েছিলেন প্রিয়তম বন্ধু ফজলে এলাহী’র সাথে। কোথাও কোন সুখের সন্ধান পাননি তিনি, তাবৎ জীবনে।
তৃপ্ত আর কর্মে অসুখী এক জীবনের ভার বয়ে তিনি আমাদের কাছে রেখে গেছেন, জীবনের অমিয় এক অচেনা আস্বাদ।
কতো আভিজাত্য হলে মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠেন; তাই যেনো রাঙামাটি শহরের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে রেখে গেলেন, অভিমানী এই অগ্রজ।

বৈচিত্র্য আর বহুমাত্রিকতায় ভরা এক তরুণপ্রাণ
কী করেননি, প্রিয় শৈলেন’দা? শিক্ষা জীবনে কলেজ পাড়ি দেয়া হয়নি, ঠিকমতো তাঁর। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভীষণ ভারী জীবনের উত্তরাধিকার তিনি টেনে বয়েছেন, একাই। সর্বহারা এক জীবনের তরী টেনে গেছেন, দূর বহুদূর।
রাঙামাটিতে ‘প্রকল্পনা সাহিত্য অঙ্গন’, আলোকিত সময়ের স্বাক্ষী। সেই সংগঠনের হাত ধরেই রাঙামাটিতে স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠেছেন, অনেক মেধাদীপ্ত মানুষ। মেধাবী গল্পকার শাহরিয়ার রুমী, এখন লন্ডনে প্রবাসী। চৌধুরী আতাউর রহমান, আদিবাসী অন্তপ্রাণ হয়ে চষে বেড়ান দেশজুড়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইল। রাজ পরিবারের মেধাবী অংশীদার প্রতিম রায় পাম্পু, কেন্দ্রের রাজনীতির পাঠ চুকিয়ে এখন রাঙামাটি শহরে আইন পেশায় থিতু হয়েছেন। আরো কতো বন্ধু আছেন, আমার চেনা-অচেনা।
সেই ‘প্রকল্পনা’র হয়ে নাটক-আবৃত্তি-কবিতা লেখা এবং প্রকাশনা বের করা; এতো পান্তাভাত হয়েছে যেনো এই প্রজন্মে।Sholen-da

কর্মহীনতা’ই যেনো চরম অর্জন
জীবনের শেষ সময়ে, এখন থেকে বছর কয়েক আগে; প্রিয় শৈলেন’দা একেবারে সাংবাদিকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। চরম কষ্ট আর দুঃখকে জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছিলেন। কেউ কী জানেন, রাঙামাটি শহরে সত্তরের দশকে যেক’টি দোতলা বাড়ী ছিলো, তার একটি বাড়ী শৈলেনদা’দের-ই ছিলো!
শুধু তাই নয়, অসীম অভিজাত্যও ছিলো বঙ্গ গোষ্ঠি খ্যাত শৈলেনদা’দের। ষাট সালে মরণঘাতী কাপ্তাই বাঁধের পরে তাঁদের খামারবাড়ী গড়ে উঠেছিলো খাগড়াছড়ি’র গুইমারাতে। একাত্তরের শরণার্থী জীবনের সন্ধিক্ষণে সেই খামারবাড়ীটি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির অনেক মানুষের কাছে জীবনের শ্বাস ও বিশ্বাসের এক অন্তিম ঠিকানায় পরিণত হয়েছিলো।

বন্ধুদের কাছে এখনো অম্লান অসাধারণ এক সাহসী মানুষ
তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে চাকমা রাজ পরিবারের উত্তরাধিকার প্রতিম রায় পাম্পু, বয়সে ছয়-সাত বছরের ছোট। নিকটাত্মীয় ও অগ্রজ সুনীল কান্তি দে, কমপক্ষে দশ বছরের বড়ো। কিন্তু তারপরও তাঁরাই ছিলেন, তাঁর (শৈলেন দে) প্রিয়তম বন্ধু। স্বল্পভাষী এই মানুষটির নৈতিকতা কতোটা এবং নিষ্ঠা কতোটা তীব্র ও একাগ্র ছিলো; সেই প্রশ্নের উত্তর বিনির্মাণ করবে উত্তর প্রজন্ম। কিন্তু কখনো কী তাঁর নির্মোহ-বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা রাঙামাটিকে ম্লান করেছে কিনা, সেই প্রশ্ন তো কেউ তুলতে পারেনি, এখনো।
আর তাই তাঁর নান্দীপাঠ করতে যাঁকেই ফোন দিয়েছিলাম, তাঁরাই যেনো আবেগঘন অনুভুতিতে পরাণ উজাড় করে বলেছেন; শৈলেন দে,র মতো মানুষ সত্যিই ক্ষণজন্মা-ই হন।

(অসমাপ্ত)

প্রদীপ চৌধুরী :  পাহাড়ের সংবাদকর্মী

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ফুটবলের বিকাশে আসছে ডায়নামিক একাডেমি

পার্বত্য এলাকা রাঙামাটিতে ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা, তৃনমূল পর্যায় থেকে ক্ষুদে ফুটবল খেলোয়াড় খুঁজে …

Leave a Reply