নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » প্রয়াত সাংবাদিক শৈলেন দে : নষ্টালজিক সময়ের সীমিত বয়ান

প্রয়াত সাংবাদিক শৈলেন দে : নষ্টালজিক সময়ের সীমিত বয়ান

Soilen-Da-picc-coverপ্রয়াত সাংবাদিক শৈলেন দে’র জীবন ও কর্ম এবং তাঁর চারণভূমি নিয়ে চলতি সপ্তাহে হুটহাট করে দুই হাজারের অধিক শব্দচয়ন শেষ করেছি। মূলতঃ আগের দুই পর্বের লেখায় আমি তাঁকে (শৈলেন’দা) দূর এবং কাছ থেকে যতোটুক বুঝতে পেরেিেছ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ ও নিকটজনদের স্মৃতিকাতরতাকেই তুলে ধরেছিলাম।
কিন্তু তাঁর রক্তজাত স্বজনদের কারো কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশে আমি অক্ষম ছিলাম। বলা চলে শৈলেন’দাদের পরিবারের রক্তের উষ্ণতা বুঝেই আমি সেদিকে এগোতে চাইনি। একজন বর্ণনাধর্মী প্রতিবেদকের বড়ো দায়িত্বই হলো, সরেজমিনে দেখা ও শোনা।
অবাক করার মতো ব্যাপার হলো; শৈলেন’দা কে নিয়ে যখনি যাকেই ফোন দিয়েছিলাম, তখনই সাড়াটা মেলেছে অভূতপূর্ব। বিশেষ করে সুনীল’দা, এডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু এবং ফজলে এলাহী’র বয়ানগুলো আমার কাছে যতোবেশী স্পর্শকাতর এবং মর্মস্পর্শী মনে হয়েছে, তারচেয়েও বেশী অনুভুত হয়েছে কাব্যিক ও আবৃত্তিময়। বলা চলে তাঁদের উচ্চারণের র্তজমাটাই আমি তুলে ধরেছিলাম, আগের দুটো লেখাতে।
তবে কেনো জানি কম জানার সীমাবদ্ধতায় শৈলেন’দার অনেক ঘনিষ্ঠজনকেও ফোন দেয়া হয়নি। হাতের কাছেই ছিলেন, খাগড়াছড়ি থেকে প্রকাশিত দেড়যুগ বয়সী পত্রিকা “দৈনিক অরণ্যবার্তা”র সম্পাদক চৌধুরী আতাউর রহমান; প্রিয় রানাভাই। তিনিও শৈলেন’দার অন্যরকম সুহৃদ। তাঁর কাছেও জমা ছিলো প্রয়াত ও জীবিত শৈলেন দে’কে নিয়ে চিন্তার অনেক খোরাক।
ক্ষমা চেয়ে নিলাম, তিনি ও “দৈনিক রাঙামাটি” পত্রিকার সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আনোয়ার আল হক (আনোয়ার ভাই)-এর কাছে।
আশা করি, তাঁরাসহ সব শৈলেন স্বজন লিখবেন নিজেদের আঙ্গিনায়।
আগের লেখা দুটি ভালো হয়নি, এটা আমার জানা আছে। রাত জেগে এবং বন্ধু ফজলে এলাহীকে নির্ঘুম রেখেই লেখা দুটি ডিজিটাল স্ক্রিনে ভাসিয়েছি। কিন্তু মরুভূমিতে একফোঁটা পানির বিন্দু পড়লে যেমন হয়, প্রতিক্রিয়া তেমনিই হয়েছে। কেউ লিখেননি; আর তাই আমার মতো নগণ্য মানুষের লেখাও হালে পানি পেলো।
কথা ছিলো, তিন পর্বেই লেখাটি শেষ করবো। হঠাৎ নিজের জীবিকার ঠিকানা “দৈনিক সমকাল’র দায়িত্বের তাগাদায় লেখার বানে যেনো কিছুটা ছেদ পড়েছে। মনে হয়েছিলো, আমার বোধ হয়; থামা দরকার। কিন্তু বয়েসী বিদ্রোহী শ্রদ্ধেয় সুনীল’দা আর বন্ধু ফজলে এলাহী’র নিষ্ঠুর চাপের কাছে শেষতক ধরাশায়ীই হলাম।
এরমধ্যে খবর এলো ‘দৈনিক রাঙামাটি’ আগামী ২৬ এপ্রিল প্রয়াত শৈলেনদা’র স্মরণসভা উপলক্ষ্যে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। আর সেখানে সম্পাদক এবং আমার শ্রদ্ধাভাজন অগ্রজ আনোয়ার আল হক (আনোয়ার ভাই) আমার লেখা দিয়েই এক পৃষ্ঠা ভরাতে চান।
ফিরে আসা যাক, শেষ পর্বের লেখার শিরোনামে।
লেখাটি শুরু করার খানিক আগ-মুর্হুতে ফোন দিয়েছিলেন সুখ্যাত সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া। তিনি আমার বয়েসী বন্ধু। কথা প্রসঙ্গে জানালাম, আমাদের প্রসবিত প্রকাশনা’র উৎসর্গ নিবেদনে বরেণ্যে সাংবাদিক এ বি এম মুসা’র সাথে প্রয়াত শৈলেন’দার নাম গিয়েছে। তিনি আকস্মিক লাইনটি কেটে দিলেন। মনে হয়েছিলো, রাগ করেছিলেন।
কিন্তু তা নয়, তিনি হঠাৎ এই দুঃসংবাদে বাকরুদ্ধ-ই হয়েছেন। ফোন ফিরিয়ে জানতে পারলাম, তিনি পাহাড়ের যে ক’জন সাংবাদিককে (আমরা সংবাদকর্মীরা নই) চেনেন; তাঁরমধ্যে প্রিয় সুনীল’দা, মক্ছুদ ভাই (দৈনিক গিরিদর্পণ’র সম্পাদক শ্রদ্ধেয় এ কে এম মক্ছুদ) শৈলেন দে, হরি’দা (হরি কিশোর চাকমা) এবং মনুভাই (বান্দরবানের মনিরুল ইসলাম মনু) অন্যতম।
ধারাবাহিক লেখায় কিছুটা যেনো ছেদ-ই পড়লো। বিপ্রদাশ বড়ুয়া, শোনালেন সম্পূর্ন অন্যকাহিনী। ভোর-বিহানে তিনিও রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রামে যাবেন, আর শৈলেন’দা হলেন একই গাড়ীতে তাঁর সহযাত্রী। পাশাপাশি সিটে বসে রাণীরহাট অতিক্রমকালে বাক বৈরিতা ভাঙ্গলো, তাঁদের দু’জনার।
স্বভাবজাত কারণেই উৎসুক্যের বাঁধ ভেঙ্গে নিলেন, বিপ্রদাশ বড়ুয়া নিজেই। কিন্তু মুশকিল হলো, শৈলেন’দা কথা বলেন না !
বিপ্রদাশ বড়ুয়া জানালেন, সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতিকথা।
তাঁর বয়ানটিই তুলে ধরি, অবিকৃতভাবেই। ‘তাঁর সাথে চলতে চলতে রাণীরহাট পার হলাম। এরিমধ্যে তাঁর ( শৈলেন’দা) মৌনতা ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন কথাগুলোই তিনি আওড়াচ্ছিলেন। ভালোই লাগছিলো, একটি পাহাড়িয়া শহরে কীভাবে একটি রাষ্ট্রের অভ্যূদয়কালীন সংগ্রামী চেতনার স্ফুরণ ঘটেছিলো, সেই ক্ষতবাহী উত্তারাধিকারীর স্বগত বয়ান শুনতে।
বিপ্রদাশ বড়ুয়াকে থামানোর ঔদ্ধত্য আমার কল্পনারও অতীত। তিনি বলে চললেন, ‘শৈলেন তো ত্রিকালদর্শী স্ব-শিক্ষিত এক মানুষ ছিলেন। তাঁর তো দার্শনিক চিন্তা এবং ভবিষ্যত স্বপ্ন পরিষ্কার ছিলো। তাঁর রুচির সীমা তো তো পাহাড়ের সমান ছিলো। তাঁর পরিবারের ত্যাগতো মাপার মতো ব্যারোমিটার আমি পাইনি। তবে, কেনো তিনি এতো অবজ্ঞার শিকার হলেন’?
বিপ্রদাশ বড়ুয়া বললেন, ‘রাউজান পার হলাম। তাঁর কথা থেমে গেলো’।
ফোনটিও কেনো জানি কেটে গেলো।
মাস কয়েক আগে আমি, রাঙামাটির জুড়াছড়ি উপজেলার বনযোগীছড়ায় গিয়েছিলাম। উপলক্ষ, কবিবন্ধু নির্মল কান্তি চাকমা’র শাদী মোবারকে। ‘রথ দেখা, কলা বেচা’র মতোই গিয়েছিলাম প্রবীন কবি ও নাট্যকার ‘চিত্রমোহন চাকমা’র কাছে।
সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সম-সাময়িক কথার প্রসঙ্গে তিনিও বললেন, ‘দৈনিক গিরিদর্পণ’ আর শৈলেন’দার কথা।
চিত্রমোহন চাকমা, ঠিক মনে করতে পারছিলেন না; তাঁর কয়টি লেখা ছেপেছিলেন ‘শৈলেন’দা’। তবে হলফ করেই বলতে পেরেছেন, শৈলেনদা’রা একাত্তরের শহীদ পরিবার ছিলেন এবং তাঁদের ‘বঙ্গলক্ষ্মী মেডিকেল হল’ পাহাড়ীদের স্বল্পমুল্যে চিকিৎসা প্রাপ্তির অন্যরকম নির্ভরযোগ্য একটি ঠিকানা ছিলো।
আমি পাহাড়ের প্রায় সবক’টি উপজেলাতেই গিয়েছি। এক বা একাধিকবারও গিয়েছি। নৌ-গিরি, পায়ে হাঁটা, বেয়ে উঠা, হামাগুড়ি পথ; মোটামোটি সব পথ-ই চেনা হয়েছে। বন্ধু ও জীবন সহকর্মী প্রতিভা ত্রিপুরা’র বন্ধুত্বের সিঁড়ি বেয়ে চলছি নিরন্তর, এখনো।
বিগত ২০০৬ সালে প্রতিভা ত্রিপুরা, রাঙামাটি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট-এর শিক্ষার্থী ছিলো। তখন, সপ্তাহে এক-দু’দিনের জন্য প্রেমের উষ্ণতায় রাঙামাটি গেলেই আমি ঢুঁ মারতাম প্রিয় ‘দৈনিক গিরিদর্পণ’-এ। যেখানে গেলে শ্রদ্ধেয় মক্ছুদ’দা ছাড়াও দেখা মিলতো প্রয়াত শৈলেন’দা এবং সুনীল’দার সাথে।
মক্ছুদ ভাই এবং সুনীল’দাকে আমি পায়ে ধরে সালাম করতে পারলেও শৈলেন’দা প্রচলিত ভক্তিবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি সবসময় ‘হ্যান্ডশেক’ই করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি প্রতিভার সাথেও তাই করতেন। একজন মানুষ কতোটা আধুনিক এবং সংস্কারপন্থী হলেই অনুজের স্ত্রী’র সাথে সাথে হাত মেলাতে পারতেন, তা ভেবে আজ আমার নিজেকে প্রচন্ড অনাধুনিক মনে হচ্ছে।
রক্ষণশীল এবং ত্যাগী পরিবারের উত্তারাধিকার শৈলেন’দার ঘরে আমার যাওয়া হয়েছে, বেশ ক’বার। তাঁর সহ-ধর্মিনী রুনু প্রভা দে, যেনো এক ইশ্বর প্রদত্ত শান্তিদায়িনী। শৈলেন’দার ঘরে গেলে তিনি সংকোচহীনভাবে বৌদি’র তৃতীয় চক্ষুজ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করতেন।
ঘরে পানি নেই (রাঙামাটির বাস্তবতা), নেই অতিথিকে দেয়ার আভিজাত্যপূর্ন দানাপানিও। তাতে কী, রুনু বৌদি লেবু’র শরবত অথবা তাৎক্ষণিক পিঠে-পায়েস বানিয়েই খাওয়াতেন।
কিন্তু একবারের জন্যও এ নিয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ করতেন না, প্রিয় শৈলেন’দা। বাইরে কথা কম বললেও ঘরে যে তিনি বাকপটু ছিলেন, এটার বড়ো স্বাক্ষী হয়ে রইলাম, আমিই।
রাঙামাটির পিটিআই এলাকাটিকে প্রায় সবাই একটু উত্তেজনা প্রবণ এলাকা হিসেবেই চেনেন। আমি পাহাড়ী মানুষকে জীবনসঙ্গী করেছি, এটা সবাইকে প্রায় নগ্নভাবে বলতে পারলেও শৈলেন’দাকে জানানো প্রায় অসম্ভব ছিলো।
কোনো জানি তিনি বিষয়টি নিয়ে বেশ উদগ্রীব ছিলেন। একদিন কাছে ডেকে বললেন, ‘প্রদীপ, শোনো; তোমার জন্য একটি সাব্-লেট দেখেছি। প্রতিভা’র লেখাপড়া এবং তোমার জন্য বেশ ভালো হবে’।
আমি আজ তাঁর মৃত্যু’র পর বাঁধভাঙ্গা আবেগে সব কথা প্রকাশ করছি। জানিনা, তাঁর আত্মা আমাকে ক্ষমা করবে,কীনা?
রাঙামাটি শহরে তাঁর মতো ক’জন আন্তরিক মানুষ আছেন, যাঁরা কাপ্তাই বা বাঘাইছড়ি অথবা থানছি থেকে গেলে চিড়ে দই খাওয়ানোর কথা ভাবতেন?
কে, এমন জীবিত সত্তা লালন করেন, সাংবাদিকতা বুঝিয়ে দেবেন?
কেউ নেই আসলেই। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আর নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বলেই, সবাই ভালো আছেন। শুধু ভালো নেই প্রয়াত শৈলেন’দার মা; চারদশকের শোকবাহী মালতী রাণী দে, হাস্যোজ্বল-প্রিয়ভাষী স্ত্রী রুনু প্রভা দে,তাঁর কৈশোর উত্তীর্ন সন্তান সৌরভ এবং শারীরিক অসঙ্গত কন্যা স্বস্তি দে।

(অসমাপ্ত)

প্রদীপ চৌধুরী : পাহাড়ের সংবাদকর্মী

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে এক দিনেই ১১ জনের করোনা শনাক্ত

শীতের আবহে হঠাৎ করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায় করোনা সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিগত কয়েকদিনের …

Leave a Reply