নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » প্রাপ্তির খাতা শূণ্যই রয়ে গেলো দুই মারমা বীরাঙ্গনার

প্রাপ্তির খাতা শূণ্যই রয়ে গেলো দুই মারমা বীরাঙ্গনার

birongonaসীমাহীন দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রনা এবং মানবেতর জীবন যাপনের ৪৩ বছর ! সমাজের লজ্জা অপমান মাথায় নিয়ে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হায়েনাদের হাতে সর্বস্ব হারানো দুই বীরাঙ্গনা। তাঁরা হলেন চাইন্দাউ মারমা ও হ্লাম্রাসং মারমা।

৯ মাস যুদ্ধের পর স্বাধীনতার দেখা মেলে। সবার মধ্যে বিজয় উল্লাস। কিন্তু তখন এমন কিছু নারী ছিল যারা সেই উল্লাসে শরিক হতে পারেনি। যাদেরকে পরবর্তীতে বীরাঙ্গনা খেতাম দেয়া হয়। যারা কিনা স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানীদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছে। আজ বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়া এই দুই বীর নারীর একজনের জীবন চলে ঘরের মধ্যে চা, বিস্কুটের ছোট দোকান দিয়ে আরেকজন করে ভিক্ষা।

তাদের দুই জন খাগড়াছড়ির মহালছড়ির হ্লাম্রাসং মারমা ও চাইন্দাউ মারমা। দীর্ঘ ৪৩ বছরেও রাষ্ট্রের কোন স্বীকৃতি বা সহায়তা মিলেনি তাদের কপালে। ভাগ্যে জুটেনি বয়স্ক ভাতা।

চাইন্দাউ মারমা খাগড়াছড়ির মহালছড়ি’র থলিপাড়া নামক গ্রামের বাসিন্দা । ৭১ সালে ষোড়শী এক নারী। তখন দেশে যুদ্ধময় পরিস্থিতি। চারপাশ পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচার। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাক-হানাদার বাহিনী ঘর থেকে জোর করে এই চাইন্দাউ মারমাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। তারপর খাগড়াছড়ি রাঙ্গামাটিতে দীর্ঘদিন আটকে নির্যাতন করা হয়। সর্বস্ব কেড়ে নেয়া হয়। দীর্ঘদিন পর পাক হানাদের খাঁচা থেকে মুক্তি পেলেও যে সমাজে বেড়ে ওঠা সে সমাজ আর ভালো চোখে গ্রহন করেনি।

ভাগ্যে জুটে বঞ্চনা, অপবাদ। যুদ্ধের অনেক পরে নিজের চেয়ে বয়সে দ্বিগুন এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেই স্বামী কয়েক বছর না যেতেই মারা যান। জীবনে নেমে আসে চরম হতাশা। এদিকে তাঁর ছেলে-মেয়েও নেই। তখন থেকেই বর্তমান পর্যন্ত ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে করে সারাদিন ঘুরে ভিক্ষা করে যা পায় তা দিয়ে অন্যজনের ঘরে খেয়ে না খেয়ে রাত কাটাতে হয়।

ফেলে আসা জীবনের কথা জানতে চাইলে দুঃসহ সেই দিন ভেবে যেন বিষন্নতা ভর করলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন জীবনের কথা, ‘একদিন বিকেলে একদল পাকসেনা এসে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর টানা ৪-৫ মাস মহালছড়ি, মাটিরাঙা, গুইমারা ও রামগড়ে আটকে রেখে দিনের পর দিন পাশবিক নির্যাতন চালায়। বেশ কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। এক পর্যায়ে রামগড়ে একটি কক্ষে আমাকে রেখে পাকিস্তানী সেনারা পালিয়ে যায়।’ পাকিস্তানীদের নির্যাতন থেকে ফিরে আসার পর সমাজের লোক আড়িঁ চোখে তাকাতো।

খুব কাছের মানুষগুলোও অনে দুরে সড়ে গেছে। শত্রুর কবল থেকে মুক্তির পর অথুই নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। তবে সন্তান হয়নি। কিন্তু স্বামীও আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। সেই থেকে ছোট ভাই থৈচাপ্রু মারমার দেওয়া একটি ঘরে তার বসবাস। সারাদিন ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে কখনো খেয়ে আবার কখনো না খেয়ে দিনযাপন করেন। এখন শরীরে নানা রোগ বাসা বেধেঁছে। তাই প্রায় অসুস্থ থাকতে হয়।

কষ্টের কথা জানতে চাইলেও দীর্ঘ বছরেও সরকারের পক্ষ থেকে কিছু না পাওয়ার যে আক্ষেপ জমে আছে তা জানাতে ভুলেননি।
তিনি বলেন, সরকারী বা বে-সরকারী কোন সংস্থা তাকে এ যাবত ফিরেও তাকাইনি। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে অথচ আমাদের মতো নির্যাতিত মহিলাদের প্রতি কোন খবর রাখেনা।

তিনি জানান, আজ স্বাধীনতার এতো বছর পরও সরকাকের পক্ষ থেকে কোন রকম সহযোগিতা পাইনি। পাইনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। অনেকে এসে খোঁজ খবর নিয়ে যায়। আমাকে সহযোগিতা করবে বলে আশা দেয়, কিন্তু তাঁর পর কোন খবর নেয়না।

শুধু চাইন্দাউ মারমা নন। পাক বাহিনীর বর্বরতার শিকার মহালছড়ির বাবু পাড়ার হ্লাম্রাসং মারমাও। যুদ্ধের সময় কোন এক সকালে বাড়ীর উঠোনে গৃহস্থালীর কাজ করার সময় পাক হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। রাতভর নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়।

হ্লা¤্রাসং মারমা জানান, ‘ঘরে ফিলে আসলেও তখন পাড়া প্রতিবেশীর কটুক্তি নিত্য দিনের ঘটনায় পরিণত হয়। যুদ্ধের অনেক পর স্বামী সাথোয়াই মারমাকে বিয়ে করি। একদিন স্বামীও মারা গেলেন। তারপর একমাত্র ছেলের দেওয়া একটি চায়ের দোকানই চা, বিস্কুট বিক্রি করে দিন কাটছে। সারাদিন বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো রকমে দিন চলে যায়।’

সরকারের প্রতি আক্ষেপ এবং অনেকটা আক্ষেপ করে হ্লাম্রারাসং মারমা জানান, আজ স্বাধীনতার এতোটা বছর হয়ে গেছে এখনো সরকারী কোন সুজোগ সুবিধা আমার ভাগ্যে জুটেনি। আর জুটবে বলেও মনে হয়না।

প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস আসলে গনমাধ্যম কর্মীদের বদৌলতে মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয় তাদের সুখ-দুখ, হাসি-কান্নার কথা, অসহায় মানবেতর জীবন যাপনের কথা। ঠিক ওখানেই শেষ। মাসজুড়ে লোকেমুখে আলোচনা হওয়ার পর আর কেউ এই তাদের খবর রাখেনা। এমনটা অভিযোগ তাদের।

এ ব্যাপারে মহালছড়ি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড চলাপ্রু মারমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এদের দুরাবস্থা দেখে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির করেও সরকারী ভাবে তাঁদের কোন সাহায্য সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তাঁদেরও সরকারী ভাবে ভাতা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

খাগড়াছড়ি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সভাপতি মংসাথোয়াই চৌধুরী বলেন, খাগড়াছড়িতে এমন অনেক নারী আছেন যারা এখন লজ্জায় নির্যাতনের কথা গোপন রেখেছেন। আমরা নানাভাবে খোঁজ খবর নিয়ে খাগড়াছড়িতে তিন বীরাঙ্গনার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পরেছি। তারা সকলেই মহালছড়ি। তবে এরমধ্যে একজন বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে।

তিনি মহালছড়ির এই দুই বীরাঙ্গনা খুব অসহায় উল্লেখ করে বলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন কথায় নয় বাস্তবেই তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ সরকারের সকল সুজোগ সুবিধা দেয়ার দাবী জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. মাসুদ করিম বলেন, ‘মহালছড়িতে দুই বীরাঙ্গনা আছেন শুনে তাৎক্ষণিক একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সত্যতা যাচাইয়ে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ পরিপূর্ণভাবে পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নাম পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়রা চান সরকার যেন দেশের এই দুই বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি নিশ্চিত করে তাদের সরকারী সব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুত কোন পদক্ষেপ নেবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লকডাউনে ফাঁকা খাগড়াছড়ি, বাড়ছে শনাক্ত

সারা দেশের মতো দ্বিতীয় দফায় সরকারের ঘোষিত লকডাউন চলছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। প্রথম দফার লকডাউন …

Leave a Reply