নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে সরকারী সংস্থা ও এনজিও’র সমন্বিত উদ্যোগ’র ভূমিকা

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে সরকারী সংস্থা ও এনজিও’র সমন্বিত উদ্যোগ’র ভূমিকা

03শিক্ষা প্রতিটি মানুষের অধিকার। প্রতিটি মানুষ বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করবে এবং তা বাধ্যতামূলক। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় শিক্ষার অধিকারের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন হল সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম লক্ষ্য। এমডিজি অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রের বাইরেও এদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে শিক্ষা মৌলিক প্রয়োজন বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির গণমূখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।
এদেশকে নিরক্ষরমুক্ত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সকলকে শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ, শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নয়ন তথা সকলের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
সরকার সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সর্বতভাবে এ শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নের জনগণের সচেতনতাসহ বেসরকারী উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। বেসরকারিভাবে বিভিন্ন এনজিও শিক্ষার উন্নয়ন তথা প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে এবং উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে । এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা ,এনজিও, উন্নয়ন সহযোগি সকলে একসাথে দুর্গম ও প্রান্তিক অন্ঞলের মানুষসহ সকলের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করবে, এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা আয়তনে দেশের বৃহত্তম জেলা। পাহাড়ি এলাকা হওয়ার কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেক কঠিন এবং অনেক এলাকায় যাতায়াতের জন্য কোন কাচা রাস্তা পর্যন্ত নেই, পাহাড়ি আঁকা- বাকা, উঁচু- নিচু জায়গা দিয়ে চলাফেরা করতে হয় । এই দুর্গম ও পাহাড়ি অন্ঞলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়ন অনেক কঠিন কাজ । তবুও সরকার এই দুর্গম ও প্রান্তিক অন্ঞলের মানুষের শিক্ষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে । রাঙ্গামাটিতে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সচেতনতার অভাব, শিক্ষা বিষয়ে অনীহা, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব, দারিদ্র্য, ঝরে পড়ার অত্যাধিক হার ইত্যাদি। রাঙ্গামাটি জেলার প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান চিত্র যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যায় বর্তমানে মোট ৫৫০টি বিদ্যালয়ে ১,০২,৬৮৩ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এই পাহাড়ী জনপদে ৭০ টি এনজিও এখানকার মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তন্মধ্যে প্রায় ২০ টি এনজিও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচেছ । সুবিধা বঞ্চিত ও পাহাড়ী এলাকার মানুষকে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে তারা বিদ্যালয়, পাঠ কেন্দ্র, পাড়া কেন্দ্র স্থাপন করছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩৭ টি বিদ্যালয় ও প্রায় ১৯৭ টি পাড়াকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে ।এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ ও বই বিতরণ করছে। এছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে তারা প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের ব্যবস্থা করছে। এক্ষেত্রে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগিদের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে । এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসমূহ বিভিন্ন জাতীয় এনজিও যেমন-ব্র্যাক, ঢাকা আহছানিয়া মিশন ইত্যাদি হতে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা গ্রহণ করছে। এছাড়া এ অঞ্চলের জনগণকে শিক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করছে। এনজিও দের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবী রাখে।

এনজিও কার্যক্রম হবে সরকারের সাথে সহযোগীতামূলক কার্যক্রম। এনজিও পরোক্ষভাবে সরকারেরই কাজ করে থাকে । সরকারী বিভিন্ন সংস্থার সাথে এনজিও’এর কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরী। সরকার ও এনজিও পরস্পর সহযোগিতা ও সমন্বয় সাধন করে কার্যক্রম করলে, কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হবে, এবং এতে জনগণ উপকৃত হবে।এ সমন্বয় সাধন করার লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকার ও এনজিও সমন্বয় কমিটি রয়েছে। সমন্বয় সঠিক ভাবে না হলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয় । যেমন-
নতুন কোন বিদ্যালয় বা পাঠ কেন্দ্র স্থাপন করার ক্ষেত্রে এনজিও গুলো উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসনের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয় হয় না অথবা এ সংক্রান্ত উপজেলা বা জেলা কমিটিতে এ বিষয়ে কোন আলোচনা করা হয় না। ফলে দেখা যায় যে, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে নির্ধারিত দুরত্বে বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হচ্ছে না ফলে একই এলাকায় সরকারী ও এনজিও’র একাধিক বিদ্যালয় হচ্ছে কিন্তু অন্য এলাকা অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। এছাড়া দেখা যায় যে, এনজিও গুলো প্রত্যন্ত ও বেশী দুর্গম এলাকায় কোন বিদ্যালয়/পাঠকেন্দ্র স্থাপন করছে না। এনজিও সমূহ সদর, কাউখালি, কাপ্তাই এর মত উপজেলা গুলোতে অধিক কাজ করছে কিন্তু দুর্গম উপজেলাগুলোর ক্ষেত্রে একই ভাবে কাজ করছে না । অত্যন্ত দুর্গম এলাকার ১/২ টি কাজ করলেও বেশিরভাগ এলাকায় এনজিও সমূহ শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছে না । যে কারণে কার্যক্রমের সফলতা আশানুরূপ হচ্ছে না ।
সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করছে। এনজিও সমূহের চাহিদার উপর ভিত্তি করে এনটিসিবি কর্তৃক প্রকাশিত বই সমূহ সরকার সরবরাহ করছে। জানা যায় যে, কিছু এনজিও বেশী কেন্দ্র দেখিয়ে বইয়ের আবেদন করে কিন্তু পাশ্ববর্তী সরকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে যাচাই করে দেখা যায় যে, অনেক কেন্দ্রেই কোন শিক্ষার্থী নেই। এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এনজিও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিসংখ্যানে দেখানো হচ্ছে ।
এনজিও সমূহ মূলত দাতা সংস্থার সহযোগীতা নিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টের আওতায় এ বিদ্যালয়/পাঠ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছে কিন্তু যখন মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে তখন বিদ্যালয়টি পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। যদি উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সাথে সমন্বয় থাকে তাহলে এ সকল সমস্যাগুলো অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় সাধন এবং সুবিধাভোগিদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এনজিও বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ আয়োজন করে থাকে । এটি একটি ভালো উদ্যোগ কিন্তু যা শুধু প্রোগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং এতে বিভিন্ন ধরনের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয় কিন্ত কোন স্থানে বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে, কিভাবে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান ও সকলকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা যাবে , কিভাবে স্থানীয় জনগণকে অধিক সম্পৃক্ত করা যাবে এসব বিষয়ে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না ।05
এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এনজিওদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন বিষয়ে যেমন-নতুন বিদ্যালয়/পাড়াকেন্দ্র স্থাপনের স্থান, বই ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা, অর্থায়নের ব্যবস্থা, বিশেষ কোন প্রজেক্টের আওতায় হলে প্রজেক্ট শেষে কিভাবে পরিচালিত হবে, এলাকার জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে জনপ্রতিনিধি, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সাথে সমন্বয় সাধন করতে হবে এনজিও গুলোকে, তাহলে এনজিও সমূহের কার্যক্রম সরকারের জন্য সহায়ক হবে অন্যথায় জনগণ উপকৃত হবে না। এনজিওগুলোকে তাদের কর্মকান্ড নিয়ে স্বচ্ছতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে আর সরকারী সংস্থা (বিশেষ করে উপজেলা প্রশাসনকে) প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এনজিওদেরকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করার প্রয়োজনীয় সুযোগ বা ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিও সমূহের মধ্যে যত বেশি সমন্বয় সাধিত হবে, তত বেশি সফলতা আসবে এবং প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন হবে । সরকারী সংস্থা ও বেসরকারী সংস্থা গুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

করোনার গ্যাড়াকলে মধ্যবিত্ত

জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুম আহমেদ বলেছেন- ‘‘মধ্যবিত্ত হয়ে জন্মানোর চেয়ে ফকির হয়ে জন্মানো ভাল। মধ্যবিত্তরা …

Leave a Reply