নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর পার্বত্য চট্টগ্রাম

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর পার্বত্য চট্টগ্রাম

pahar-03প্রাচীনকাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলো বৈষম্যের শিকার। মানুষের মাঝেও বৈষম্য এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যেটা প্রত্যাশিত নয়। বর্ণ, গোত্র, ধর্ম, শ্রেণি, অঞ্চল এবং লিঙ্গসহ সর্বত্র বৈষম্য ছড়িয়ে পড়েছে। এ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে সাধারণ জনগণ। শিক্ষা, পেশা, অর্থনীতিসহ জীবন, জীবিকায় সর্বত্র বৈষম্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার জনগণ তাদের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যর্থ হয় যা পরবর্তীতে দেশের উন্নয়নে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে আঞ্চলিক বৈষম্যের বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণে এ অঞ্চলের লোকগুলো তাদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলগুলো থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক এলাকা তুলনামূলকভাবে অনেক বড়। এ অঞ্চলটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী। উদাহরণস্বরুপ পাহাড়ি এলাকা যেমন-খাগড়াছড়ি তেল, গ্যাস এবং খনিজ সম্পদে ভরপুর। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বনজসম্পদ এর উৎস পার্বত্য চট্টগ্রাম। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান কক্সবাজার ও সুন্দরবনের পরেই তৃতীয় অবস্থানে। এখানে আছে অনেকগুলো খর¯্রােতা নদী ও হাইওয়ে। যোগাযোগ সুযোগ-সুবিধাসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নের ধারা থেকে বঞ্চিত। পার্বত্য চট্টগ্রাম বঞ্চিত হওয়ার ফলে পুরো দেশও প্রভাবিত হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাপক পাহাড়ি অঞ্চল। পাহাড়ি জেলা যেমন-খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি গঠিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মায়ানমার, উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে মিজোরাম এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা অবস্থিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আয়তন ১৩,১৮৪ বর্গকিলোমিটার যা বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৯%। ১৯৯১ এর সেনসাস রিপোর্ট অনুযায়ী ১.০৪২ মিলিয়ন বা ১০ লাখ ৪২ হাজার যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ০.৭৪%। বাংলাদেশের যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯৫৩ জন লোক বাস করে সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ৭৯.০৪ জন। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাতে অনেকগুলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। বাংলাদেশে ৪৫ টি উপজাতির মধ্যে ১৩ টি উপজাতি যেমন-বম, চাক, চাকমা, খেয়াং, খুমি, লুসাই, মারমা, মুরং, পাঙ্খো, রাখাইন, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা-এর বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামে।

এরা সবাই মঙ্গোলিয়ান রেসের। ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তীতে এটি আরাকান, ত্রিপুরা এবং তার পরে এটি আবারও আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৬৬৬ সাল থেকে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত এটি মুঘল শাসনাধীন ছিল। ১৭৬০ সালে এলাকাটির কর্তৃত্ব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়। ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখল করে একে ব্্িরটিশ-ভারতের অংশে পরিণত করে। তারা এর নামকরণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম (চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস)। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এটি পাকিস্তানের শাসনাধীন ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে চট্টগ্রামের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উঁচু নিচু পাহাড় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক এলাকা একটা বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। সমতল ভূমির পরিমাণ কমের কারণে এটি চাষাবাদের উপযোগী নয়। কিন্তু এখানে প্রকৃতিকভাবেই বনায়ন গড়ে ওঠেছে। পাহাড়ের দু’ধারে এবং ঢালে পাহাড়িরা বিভিন্ন শস্য যেমন-ধান, তুলা, তৈলবীজ, চা, কলা এবং আনারস চাষ করে যাকে বলা হয় জুমচাষ। মাদুর, ঝুড়ি এবং বস্ত্র তৈরি করা তাদের পেশা। এইসব এলাকার পাহাড়িদের বানানো পোশাকই আমাদের কাছে বার্মিজ পোশাক নামে পরিচিত। ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এর ভৌগলিক আয়তন বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৯%। যদিও বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১% জনগণ এখানে বাস করে। জনসংখ্যার পরিমাণ কম মাত্রায় হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। এইসব পাহাড়ি এলাকাগুলো গ্যাস, তৈল ও জ্বালানি উপাদানের উৎস হিসেবে সম্ভাবনাময়ী। ১৯৬৯ সালের পাকিস্তানের জাতীয় তেল কোম্পানি সিমুলার্জ গ্যাস ও তেলফিল্ড আবিষ্কার করেন। অন্যান্য যে সব খনিজ উপাদান সচরাচর পাওয়া যায় তা হচ্ছে বালি, পাথর এবং কয়লা। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলো হচ্ছে – কর্ণফুলি, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী। যদি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তাহলে নদীর দুই তীরে ছোট বড় শিল্প কারখানার স্থাপনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম যেহেতু খরা এবং মরুকরণ থেকে মুক্ত তাই এ এলাকা শিল্পায়নের জন্যে উপযোগী। যেটা অন্যান্য এলাকার মত নয়। চন্দ্রঘোনা কাগজ কলটি স্থাপন করা হয়েছিল খর¯্রােতা নদীপথ এবং বিদ্যুৎ, বাঁশ, কাঠ ও বেত সুলভ মূল্যে পাওয়ার কারণে। যদিও কৃত্রিমভাবে আমেরিকার আর্থিক সহযোগিতায় কাপ্তাই লেকে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা দু’ভাবে উপকৃত হচ্ছি প্রথমত বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বিতীয়ত সুলভমুল্যে জলবিদ্যুৎ এর সুযোগ-সুবিধা। এ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করছে। এ ছাড়া ক্রমবর্ধমানশীল মৎস্যখামার স্থাপনের মাধ্যমে অধিক মাছ উৎপাদন করে আমাদের দেশীয় চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করেও আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবো। পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত ভূমি ও নদীর সুযোগ-সুবিধা থাকার কারণে এখানে ক্ষুদ্র শিল্প, মৎস্য খামার এবং ডেইরি ফার্ম স্থাপন করা যেতে পারে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর সার্বিক উন্নয়নের জন্যে। সেগুন, গজারি (গর্জন) এবং বেতের বনায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার বাসা-বাড়ি ও ফার্নিচার বানানোর জন্যে কাঠের গুড়ি সরবরাহ করা যেতে পারে। এভাবে গৃহ নির্মাণের ব্যয়ভার ও কমে যাবে।

সমতল ভূমির লোকদের চাইতে পাহাড়িরা যথেষ্ট পরিশ্রমী। কম বিনিয়োগের কারণে এখানে উৎপাদন কম। আর এ কম বিনিয়োগের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে নিরাপত্তা ঘাটতি। আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের লোকগুলো শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত। আর এ বঞ্চনাই তাদেরকে করে তুলেছে বিদ্রোহী। পূর্ববর্তী সরকার বিদ্রোহীদের দমানোর জন্যে প্রচুর অর্থ ব্যায় করলেও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর সার্বিক উন্নয়নের জন্যে ব্যয় করার মত প্রয়োজনীয় অর্থ তাদের ছিল না।

এখন সময় এসেছে সম্ভাবনাময়ী পার্বত্য চট্টগ্রামকে উৎপাদনমুখী একটি অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা। আর এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে আরো স্থলপথ ও নৌপথ নির্মাণ করতে হবে। নদীপথে মালামাল পরিবহনসহ যাতায়ত ব্যবস্থা ভালো করার জন্যে কিছু গুরুত্বপূর্ন নদী ড্রেজিং করতে হবে।

একইসাথে বনায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্যে তাদেরকে বাংলা, ইংরেজি ভাষা এবং কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান শিখাতে হবে। এটা করা যাবে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরের উদ্যেগে ছোট বড় শিল্প কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে।

এশিয়ার অন্যান্য মঙ্গোলিয়ানদের মতই পাহাড়িরা বলিষ্ঠ এবং যথেষ্ঠ পরিশ্রমী। উপজাতিদের মেধাকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি তাদেরকে শিক্ষা, চাকুরি, ব্যবসাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। পাহাড়িরা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে যদি তারা দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে উৎসর্গ করে এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অখণ্ড বাংলাদেশ এর আলাদা কোন অঞ্চল নয়। যখন বিনিয়োগকারীরা শান্তিপূর্ণ স্থান খুঁজে পাবে তখন তাঁরা ঐসব এলাকার সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে উৎসাহিত হবে। এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমনি শিল্পায়নে সমৃদ্ধশালী হবে তেমনি দেশও উন্নতি লাভ করবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নানিয়ারচর সেতু : এক সেতুতেই দুর্গমতা ঘুচছে তিন উপজেলার

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পর এক নানিয়ারচর সেতুতেই স্বপ্ন বুনছে রাঙামাটি জেলার দুর্গম তিন …

Leave a Reply