নীড় পাতা » পাহাড়ে নির্বাচনের হাওয়া » প্রসিত খীসার নির্বাচনী ইশতেহার

প্রসিত খীসার নির্বাচনী ইশতেহার

updf-flagনির্বাচনী ইশতেহার
দুর্বৃত্ত-দুষ্টচক্র থেকে সমাজ রক্ষার্থে ভোট বিপ্লব সংগঠিত করুন!
আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
২৯৮ নং খাগড়াছড়ি আসনে

সমাজ পরিবর্তনের নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক
প্রসিত বিকাশ খীসা’কে

হাতি মার্কায় ভোট দিন!
২৫ ডিসেম্বর ২০১৩

জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয় কমিটি

প্রস্তাবনা ও আমাদের পর্যবেক্ষণ
লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে আজও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই। কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও সুদূর পরাহত। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও হানাদার পাকসেনাদের কায়দায় ভিন্ন ভাষা-ভাষী জাতি ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ঘরবাড়ি-মন্দির-উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ-লুটপাট-নারী নির্যাতন ও উচ্ছেদ অভিযান চলে। তাইন্দ্যং-রাঙ্গামাটি-রামু-উখিয়া-সাতকানিয়া-পটিয়া-সাতক্ষীরার ক্ষতচিহ্ন এখনও রয়েছে দগদগে অবস্থায়। সাধের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আজও শাসকের গুলি খেয়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের। সাধারণ কর্মজীবী নিরপরাধ মানুষকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ দিতে হয় অবরোধ-হরতালের দিনে–যা যে কোন জাতির জন্য খুবই বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক।
আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব সংঘাতে ইতিমধ্যে শতাধিক প্রাণহানিসহ অর্থনৈতিক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বিপুল পরিমাণ। দেশে এভাবে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ও সহিংস ঘটনায় ইউপিডিএফ গভীরভাবে উদ্বিগ্œ। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের সকলের প্রতি ইউপিডিএফ সম্মান ও তাদের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছে। যারা অবরোধ হরতালে আক্রান্ত ও জখম হয়ে হাসপাতালে নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করছেন, তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছে ইউপিডিএফ।
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ যে সব অঞ্চলে ভিন্ন ভাষা-ভাষী জাতি-জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণে যারা সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে খুন-গুম, আক্রান্ত ও নানাভাবে লাঞ্ছিত, ক্ষতিগ্রস্ত, ঘরছাড়া-এলাকাছাড়া বা সর্বস্বান্ত হয়েছেন– তাদের সবার কথা গুরুত্বের সাথে ইউপিডিএফ স্মরণ করে। সকল শহীদদের প্রতি গভীর সম্মান, তাদের পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানায় ইউপিডিএফ এবং অধিকার আদায় তথা ন্যায় নীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্দোলনরত ব্যক্তি-সংগঠনের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।
১। নির্বাচনী সংকট : শর্ষের মধ্যে ভূত
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বর্তমান সংকট আকস্মিক বা নতুন নয়। সংকটের মূল উৎস হচ্ছে দেশের বর্তমান সংবিধান। বহু সংশোধনের পর এটি বিতর্কিত ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে, খোদ শাসকদলই তা লংঘন করে চলেছে। সংকটের অন্য প্রধান কারণটি হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী, যা প্রকারান্তরে পাকিস্তানি শাসকচক্রের মনোভাবেরই প্রতিফলন। ক্ষমতায় থাকলে ভিন্ন মত ভিন্ন জাতির অস্তিত্ব সহ্য না করা, দমন-পীড়ন চালিয়ে সর্বোত উপায়ে তাদের কোণঠাসা ও প্রান্তিক করে রাখাই ক্ষমতাসীন সরকারের নীতি হিসেবে গৃহীত হয়। একটি রাষ্ট্রে-সমাজে সংখ্যাগুরু জাতির বাইরে সংখ্যালঘু আরও ভিন্ন জাতি-সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব থাকে, তারাও সংখ্যাগুরু জনগণের মত একই নাগরিক, অধিকার-মান মর্যাদা পাবার অধিকারী– ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলে তা বিবেচনায় থাকে না শাসকচক্রের। নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ও চিরস্থায়ী করতে ন্যায়-নীতির থোড়াই পরোয়া করে, ছলা-কলা হীনপন্থা হয় তাদের অবলম্বন।
নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বহুল বিতর্কিত “বাঙালি জাতীয়তা”। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল, পছন্দমত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তফশিল ঘোষণা করিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ক্ষণ নির্ধারণ করে ফেলেছে। অবস্থাদৃষ্টে এটা বুঝতে কারোর বাকী থাকে না, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’কে বাদ দিয়েই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি জোটভুক্ত ১৮ দল তা মেনে নিতে পারছে না। আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিএনপি বলয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তা বলাই বাহুল্য।
ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপিও ’৯৬ সালে অনুরূপ বন্দোবস্ত করেছিল, তখন আওয়ামী লীগ তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপি’র এক তরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয় নি, সে সংসদও টিকে নি। বড় ধরনের সংঘাত ক্ষয়-ক্ষতি হবার আগেই তা থেকে সরে এসে বিএনপি নির্বাচন দিয়েছিল, যা সরকার-বিরোধী দল উভয়ের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে নিজেদের ছক বাঁধা পথে এগুতে চাচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
পরিহাসের ব্যাপার এই, বর্তমানে বিএনপি’কে ক্ষমতাসীন দলের ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপের বিরোধিতা করতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগকেও বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তাই করতে হয়েছিল। ফৌজি শাসক এরশাদের জাতীয় পার্টি (১৯৮৪-১৯৯০) ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ বলতে গেলে সব দলকেই স্বৈরাচার বিরোধিতায় রাজপথে নামতে হয়েছিল। ক্ষমতা ও সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে দেশের আর অন্য কোন দল, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব-মর্যাদা-অনুভূতি-স্বার্থ, মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় না নেয়াই হচ্ছে উপরোক্ত ফ্যাসিস্ট দলসমূহের বৈশিষ্ট্য।
ফ্যাসিস্ট সে পি-ি-ইসলামাবাদের পাঞ্জাবি হোক কিংবা ঢাকা-উত্তরপাড়ার বাঙালি হোক কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি হোক, সে কখনই জনগণের মিত্র হতে পারে না। ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন দল ও ব্যক্তির জরুরি কর্তব্য।
২। জনগণের কাঠগড়ায় অপরাধী
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে ক্ষমতাসীন দল কার্যত দেশকে বর্তমান সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। “দশম সংসদ” নির্বাচন সম্পন্ন না হতেই “একাদশ সংসদ” নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে খোদ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে সরকারি দলের অভ্যন্তরেও দ্বিধা দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সংবিধান-আইন রচিত হয় আপামর মানুষের প্রয়োজনে। আওয়ামী লীগ সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে আইন তৈরি করেছে। স্বাভাবিকভাবে এজন্য সরকারি দল জনতার কাঠগড়ায় অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হবে। গরীব দেশ যেখানে বিশ্বের সবচে’ বেশি লোক দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে, সেখানে পর পর দু’টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান জনগণের অর্থ শ্রাদ্ধ করা ছাড়া আর কী বলা যায়।
পার্বত্যবাসীদের নিকট প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ‘বাঙালি জাতীয়তা’ আরোপ, তাইন্দ্যং-সাজেক-রাঙামাটি হামলা, সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ, আঞ্চলিক পরিষদ-জেলা পরিষদে নির্বাচন না দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি-ক্ষমতার অপব্যবহার — ইত্যাদি বহুবিধ কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি সবাই ক্ষমতাসীন দলের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। এ দলের সাথে যুক্ত হয়ে কতিপয় লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। অর্থ-বিত্ত-বাড়ি-গাড়ি কোন কিছুই তাদের বাকী নেই, ব্যবসা-ঠিকাদারি-লাইসেন্স-পারমিট সবই তাদের হাতে। বেকার যুবকদের একাংশ সহজে প্রতিষ্ঠা পাবার স্বপ্নে যারা এ দলে ভিড়েছে, তারা ব্যক্তিগতভাবে তেমন কিছু অর্জন করতে পারে নি, আওয়ামী চেলাচামু-াদের হাতে প্রতারিত হয়েছে। সমাজে তাদের মান-মর্যাদা খোয়া গেছে, ‘পেটলীগ’ হিসেবে তারা জনগণের তিরষ্কার লাভ করেছে।
পার্বত্য খাগড়াছড়ির আসনটি জাতীয় পার্টির নিকট ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ একদিকে তার দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি অবিচার করেছে, অন্যদিকে খাগড়াছড়িবাসীকে তা চরমভাবে অপমান করার সামিল। যদি এখানে আঞ্চলিক দলের কোন প্রার্থী না থাকতেন, তাহলে খাগড়াছড়ির আসনটি জাতীয় পার্টির ঘরে যেত! তা হত পুরোপুরি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রের কাজ কারবারের মত, যা কারোর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ স্বৈরাচারি এরশাদের জাতীয় পার্টিকে কখনই রায় দেয় নি। মানুষের ভোটের অধিকারের কথা বলতে শেখ হাসিনা মুখে ফেণা তুলেন, অথচ তিনি কিনা জাতীয় পার্টির এই তিক্ত বড়ি খাগড়াছড়িবাসীকে গিলাতে চাইছেন! দেশের অন্যত্র তো গিলিয়েছেন, বিতর্কিতও হয়েছেন।
বিএনপি’র ‘হাওয়া ভবন’ নিয়ে তিনি কত গালমন্দ করেছেন, অথচ গণভবনে বসে যে কাজ কারবার চলছে তা হাওয়া ভবনকে হার মানিয়েছে। স্বৈরাচারি এরশাদকে কাছে পেতে যে টানা হেঁচড়া চলছে, তা যাত্রা-নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও লজ্জা দেবে।
রাজনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য সিন্ডিকেট কারবার নয়, এটা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির চেলাচামু-ারা যত তাড়াতাড়ি উপলদ্ধি করতে সক্ষম হবেন, ততই দেশ ও জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
৩। নির্বাচন নিয়ে সংশয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), পর্যবেক্ষক দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বাইরে সংশয় আরও ঘণীভূত হল। নির্বাচনে বিএনপি না এলেও ইইউ পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে প্রস্তুতও ছিল, কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় সংস্থাটি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে (সমকাল, ২১ ডিসেম্বরর ২০১৩)। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক দৈনিক কালেরকণ্ঠ-এর প্রতিবেদকের নিকট সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে মন্তব্য করেছেন (কালেরকণ্ঠ, ২১ ডিসেম্বর ২০১৩)।
নির্বাচনে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে দেশের এক তৃতীয়াংশ সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে, কল্পনা চাকমা অপহরণ-লোগাং-নান্যাচর হত্যাকা-সহ মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে তাদের ভূমিকা এমনিতে বিতর্কিত। এ অঞ্চলে বিশাল সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবার ঝুঁকি মুক্ত হচ্ছে না, এ বিষয়টি যাতে রাষ্ট্র চিন্তাবিদগণ ভুলে না যান। নির্বাচনী কাজে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীকে নতুন করে মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না তা স্পষ্ট। তবে আইনীভাবে তাদের মোতায়েনের ফলে সেনা কর্তৃত্বকে আরও নিরঙ্কুশ করা হবে। বেসামরিক প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের ওপর সেনা সদস্যদের খবরদারিমূলক কর্মকা- বৈধতা পাবে সে আশঙ্কা আরও প্রবল হল।
ইতিপূর্বে সরকার দলীয় মাস্তানদের অনুরূপ কতিপয় সেনা কর্মকর্তার ভোটারদের প্রভাবিত করা, এলাকা বিশেষে হুমকিমূলক অবস্থান নিয়ে ভোটারদের মনে ভীতি সঞ্চার, সাম্প্রদায়িকতায় উস্কানিদান, বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে চক্রান্তে লিপ্ত হওয়া–ইত্যাদি বহু অভিযোগ রয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনা কর্মকর্তাগণের মধ্যে ক’জন বিতর্ক ও সমালোচনার উর্ধ্বে উঠে পেশাদারি নিষ্ঠা সততার সাথে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে, সেটা বলার সময় আসে নি। তবে বিগত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরপেক্ষতা ও সততা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয় নি। লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট-এর মন্তব্য প্রতিবেদনে আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা খুবই সময়োপযোগী এবং প্রণিধানযোগ্য। এর শিরোনামেই সার কথা প্রকাশ পেয়েছে ‘ঞযব পধসঢ়ধরমহ ঃৎধরষ : ঞযব ৎঁষরহম ঢ়ধৎঃু রিষষ রিহ ইধহমষধফবংয’ং বষবপঃরড়হ. ঞযব পড়ঁহঃৎু রিষষ ষড়ংব’ (দি ইকোনমিস্ট, ২১ ডিসেম্বর ২০১৩, এশিয়া প্রিন্ট সংস্করণ) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতবে, বাংলাদেশ হারবে।
নির্বাচন কমিশন ও পর্দার অন্তরালের খেলা : বর্তমান নির্বাচন কমিশন নানা কর্মকা-ের ফলে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কমিশনের দুর্বলতা ও পক্ষপাতিত্ব দিবালোকের মত স্পষ্ট। জেএসএস (লারমা)-এর সভাপতির একই মনোনয়নপত্র খাগড়াছড়িতে বাতিল হলেও, রাঙামাটিতে তা গৃহীত হয়। আর বান্দরবানে সরকারি দলের প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তা রিটার্নিং অফিসার বাতিল করে দিতে সক্ষম হন নি। অথচ খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ-এর এক প্রার্থী অংগ্য মারমার সমর্থনকারীকে চূড়ান্তভাবে যাচাইয়ের সুযোগই দেয়া হয় নি। আরও রহস্যজনক ব্যাপার, ইউপিডিএফ-এর অপর প্রার্থী উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা খাগড়াছড়ি আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও তা রিটার্নিং অফিসার গ্রহণ করেন নি, লটারি দিয়ে তার মার্কাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বুঝতে বাকী থাকে না, এ আসনে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভোটে বিভাজন ঘটাতে একটি শক্তিশালী পক্ষ বেশ সক্রিয়। কেন্দ্রীয় নির্দেশে জাতীয় পার্টির সমর্থনে খাগড়াছড়ির আওয়ামী লীগের প্রার্থী নিজ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন করেও একই কারণে তা গৃহীত হয় নি। অথচ দেশের অন্যত্র প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৩ ডিসেম্বরের ২ দিন পর ১৫ ডিসেম্বরেও আওয়ামী লীগের লোকজন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। সে কারণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫৪-এ, বিরোধী দল বিএনপি এভাবে নির্বাচিত হওয়াকে আসন বরাদ্দ বলে নিন্দা করছে।

৪। দশম সংসদ ও ইউপিডিএফ
সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক হত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তা নয়। নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি ও এর জোটভুক্ত ১৮ দল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। কেবল তাই নয়, নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে এ দল অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে, এমনকী নির্বাচন প্রতিহত করার কর্মসূচিও গ্রহণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিন্ন অন্যত্র নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনমনে আগ্রহ ও উত্তেজনা কম হওয়াই স্বাভাবিক। স্মরণাতীত কালে এবার অর্ধেকের বেশি ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা সমালোচনা চলবে।
তবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপট সারা দেশীয় অবস্থা থেকে বহুলাংশে ভিন্ন, এ বাস্তব সত্য কেউ অস্বীকার করতে সক্ষম হবেন না। ক্ষমতাসীন দল ও বিএনপি’কে সঙ্গত কারণে এ অঞ্চলের জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে বিবেচনাও করা হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান দেশের অন্য অঞ্চলের মত নয়। এখানে এ দল দু’টি অন্য দশটি সাধারণ দলের মতই। কারণ এখানে জনগণের পক্ষে সংগ্রামরত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলই বড় ফ্যাক্টর। দেশের অন্যত্র আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনসমূহের প্রার্থীগণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জন নির্বাচিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সে অবস্থা নেই। এখানে নির্বাচন প্রার্থী শূণ্য বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নয়, বরং এখানে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তার অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে প্রধান কারণটি হচ্ছে, এখানে ক্ষমতাসীন দল দীর্ঘদিন দলবাজী করে সব কিছু কুক্ষিগত করে রেখেছে। তা থেকে মুক্তি পেতে চায় এলাকাবাসী। আসন্ন নির্বাচন জনমত প্রতিফলন ঘটানোর একটা উপলক্ষ। সে কারণে পাহাড়ের নির্বাচনের আমেজ দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন।
৫। দ্বন্দ্ব কেবল ক্ষমতাসীন আর বিরোধী দলের নয়
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব বর্তমানে কেবল আওয়ামী লীগ আর বিএনপি দু’টি জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক অর্থে জনগণের সাথে সরকারের দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাজনীতিকে সিন্ডিকেট বাণিজ্যের স্টাইলে পরিণত করে ফেলেছে। জাতীয় পার্টিসহ আরও ক’টি নামসর্বস্ব দলের সাথে বোঝাপড়া সাপেক্ষে আসন ভাগাভাগি করে ৫ জেলার নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। নিজেদের মতামত প্রদানের তথা ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে দেশের নাগরিকদের বর্তমানে রাজপথে নামতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সকল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিককে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবার দাবি জরুরি হয়ে পড়েছে।

৬। কী চায় ইউপিডিএফ
আগামীতে গঠিতব্য সংসদটি পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারবে না, তা হবে অন্তবর্তীকালীন সংসদ। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীগণ “একাদশ সংসদ” নির্বাচনের প্রস্তুতির কথাবার্তা বলা শুরু করেছেন, অবস্থার চাপে তা তারা বাধ্য হচ্ছেন। কাজেই এ অন্তবর্তীকালীন সংসদে প্রতিনিধিগণের প্রধান দায়িত্ব হবে সকল দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনপ্রর্বতনের জন্য আন্দোলন সংগঠিত করা। রাজনৈতিক কারণে যে সব নেতা-কর্মী আটকাধীন রয়েছেন, তাদের বিনা শর্তে মুক্তির বন্দোবস্ত করা হবে আশু কর্তব্য।

আসন্ন নির্বাচনে ইউপিডিএফ নিন্মোক্ত বিষয়কে গুরুত্ব দেবে :Prosit-Khisa
১। বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল জাতিসত্তার জাতীয়তার স্বীকৃতির দাবিতে জনমত গঠন ও আন্দোলন সংগঠিত করা। দুর্বল, সংখ্যালঘু, অনগ্রসর, পশ্চাদপদ পিছিয়ে পড়া জাতি, সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভূমিকা রাখা।
২। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, ধর্মান্ধতার বিরোধিতার পাশাপাশি আঞ্চলিকতা ও গোত্রভিত্তিক সংকীর্ণ জাতীয়তা যাতে গড়ে না ওঠে সে ব্যাপারে সযতœ ভূমিকা রাখা। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি-বাঙালি জনগণের মধ্যে বৈরিতা কাটিয়ে তুলে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করা।
৩। প্রত্যাগত, বঞ্চিত ও আভ্যন্তরীণ শরণার্থী, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা শান্তিবাহিনী (’৮৫ ও ’৯৮) সবার যথাযথ পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ভূমিকা রাখা।
৪। ভূমি বেদখল রোধ ও বহিরাগতদের জীবিকার নিশ্চয়তাসহ সম্মানজনকভাবে তাদের আদি আবাসস্থলে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সহায়তাদান।
৫। সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া এবং দেশ রক্ষা ও উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রামের যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে জনমত সৃষ্টি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৬। পাহাড়িদের মধ্যকার রাজনৈতিক বিরোধ উস্কে দিয়ে তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার ধ্বংসাত্মক নীতি বন্ধ করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। পাহাড়িদের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় বিভাজন রোধ কল্পে ভূমিকা রাখা। মারমা জাতিসত্তার আভ্যন্তরীণ সমস্যাকে রাজনৈতিক মদদ দিয়ে সম্প্রদায় হিসেবে তাদের বিভক্ত ও দুর্বল করে রাখার শাসকচক্রের নীলনক্সা কার্যকর হতে না দেয়া।
৭। সমাজে নেশা জাতীয় দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, অপসংস্কৃতি রোধ, সুস্থ বিনোদনের বন্দোবস্তকরণ; নারী অধিকার নিশ্চিতকরণ, যুব শক্তিকে দেশ গড়ার কাজে নিযুক্ত করতে উদ্বুদ্ধকরণ।
৮। বন-প্রকৃতি ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার্থে সাধ্যমত ভূমিকা পালন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনগণকে সংগঠিত করে মোকাবিলা করা।
৯। সমাজে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার করা এবং ক্ষমতাসীনদের সিন্ডিকেটের কবল থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, টেন্ডার-পারমিট ও চাকুরি অবমুক্ত করে সবার সমান সুযোগ প্রদানে ভূমিকা রাখা।
১০। দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বহিঃ হস্তক্ষেপ-এর বিরোধিতা করা।
ইউপিডিএফ-এর বিস্তারিত কর্মসূচি ও দাবিনামা জানতে দেখুন : প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে গৃহীত কর্মসূচি ও দাবিনামা সম্বলিত পুস্তিকা (প্রকাশকাল ৪ ডিসেম্বর ২০০৬)।
দুর্বৃত্ত-দুষ্টচক্র থেকে সমাজ রক্ষার্থে ভোট বিপ্লব সংগঠিত করুন!
সমাজে ন্যায় নীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হাতি মার্কায় ভোট দিন

২৫ ডিসেম্বর ২০১৩
খাগড়াছড়ি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয় কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ফের মাটিরাঙ্গার মেয়র হলেন আওয়ামীলীগের সামছুল

মাটিরাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামীলীগ মনোনিত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী …

Leave a Reply

%d bloggers like this: