নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » প্রসঙ্গ : পাহাড়ের পর্যটন সম্ভাবনা

প্রসঙ্গ : পাহাড়ের পর্যটন সম্ভাবনা

সাবেক বেসমারিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী জিএম কাদের বান্দরবানে সরকারি সফরে এসে বলেছিলেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এবং ঐহিত্য সংস্কৃতি অক্ষুণœ রেখেই পার্বত্যাঞ্চলের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এদেশে পর্যটন শিল্প এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব পায়নি। পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা এবং এই শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে সম্ভাবনা আছে তা এখনো সরকারি—বেসরকারি পর্যায়ে আস্থাশীল হয়ে ওঠেনি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটক আনার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।
যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পর্যটন শিল্পে সম্পৃক্ত করে পর্যটন শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন করা হবে।
আজকের বিশ্বে সার্বিক পর্যটন উন্নয়নে সাংস্কৃতিক পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বাংলাদেশেও এ শিল্পের বিকাশ দ্রুত হচ্ছে বলা যায়। কেননা গত দুই দশকে কক্সবাজার এর পরে পাবর্ত্য এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে।
মানুষ আজ মানুষকে দেখতে চায়, মানুষের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চায় এবং মানুষের আচরণ ও জীবন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে স্বকীয়তা বহন করে। এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা এবং ইতিহাস এটিকে একটি আলাদা পর্যটন গন্তব্যে এবং এর আদিবাসীদেরকে আলাদা জাতিস্বত্ত্বা হিসেবে পরিচিত করেছে।
বাংলাদেশ ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ১০ লাখ বৈদেশিক পর্যটক আকৃষ্ট করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেজন্য অন্যান্য পর্যটন উপাদানের সাথে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহকেও বিভিন্ন মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করতে হবে। এর ফলে একদিকে যেমন বিদ্যমান পর্যটন—আকর্ষণসমূহের সাথে নতুন মাত্রা যোগ হবে, অন্যদিকে অধিক সংখ্যক পর্যটকও আকৃষ্ট হবে। পাশাপাশি বিশ্ব পর্যটন বাজারে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের তথা সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বৃদ্ধি পাবে। এটা সত্যি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য আদিবাসীদের সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে সরকারকে। তবে পর্যটনের নামে পার্বত্য এলাকার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট করা যাবে না এবং সবকিছুকে ব্যবসায়িকভাবে ব্যবহারও করা যাবে না।
পৃথিবীর বহু পর্যটন গন্তব্যের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এ শিল্প চিহ্নিত। ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী পর্যটন শিল্প বিশ্বব্যাপী ৬ ট্রিলিয়ন ডলার আয় সৃষ্টি এবং ২২১ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতি হতে পারে একমাত্র উপাদান যা একটি পর্যটন এলাকার সার্বিক আকর্ষণীয়তা (ধঃঃৎধপঃরাবহবংং) সৃষ্টি করতে পারে। আমেরিকার ঞৎধাবষ ওহফঁংঃৎু অংংড়পরধঃরড়হ (ঞওঅ) উল্লেখ করেছে যে, তাদের দেশের কম—বেশি ২০০ মিলিয়ন পর্যটকদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৪৬ ভাগ অন্তত একটি সাংস্কৃতিক উপাদান (কলা, ঐতিহ্য বা ইতিহাস) অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। ঞওঅ এবং ঝসরঃযংড়হরধহ গধমধুরহব— এর অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, কলা এবং সাংস্কৃতিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রবণতাই প্রমাণ করে যে, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং উপাদানসমূহ পর্যটকদের মধ্যে অনেকটা আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া অন্যান্য গবেষণার ফলাফলেও দেখা গেছে যে, সাংস্কৃতিক পর্যটকরা অন্য পর্যটকদের তুলনায় পর্যটন গন্তব্যে এসে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেন। ফলস্বরূপ, সাংস্কৃতিক ভ্রমণকারীরা পর্যটন গন্তব্যসমূহের জন্য একটি আকর্ষণীয় বাজার খণ্ডে পরিণত হয়েছে। সাংস্কৃতিক পর্যটন উন্নয়নের ফলে পর্যটক এবং গন্তব্যে বসবাসকারী সম্প্রদায় উভয়ের মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, সমষ্টিগত জীবনপদ্ধতি এবং অন্যান্য সামাজিক রীতি—নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন বিনির্মাণ করে। যেহেতু পর্যটক ও গন্তব্যে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে নানারকম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ওঠা—বসা ও ভাবের আদান—প্রদান হয়, সে কারণে এ ধরনের ওঠা—বসা ও ভাব বিনিময়ের ফলে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক বোঝা—পড়া সৃষ্টি হয়। ফলে ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী শান্তি, সৌহার্দ্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া একটি দেশ যখন সাংস্কৃতিক পর্যটনের উন্নয়ন ঘটায় তখন সে দেশটি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অধিক মনোনিবেশ করে। বিশেষ করে জাদুঘর, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থান, স্মৃতিস্তম্ভ¢, দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন ভবন ইত্যাদির উন্নয়ন ও সংরক্ষণে দেশটি তৎপর হয়। ফলে দেশটির অতীত ইতিহাস ও বর্তমান জীবনধারার সাথে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়। (ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক, ড. মো. আফজাল হোসেন)।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্প বিশেষ করে সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা ব্যাপক। এজন্য প্রয়োজন কাঙ্খিত সংস্কার ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ—সুবিধা সরবরাহ সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেগুলোর বাস্তবায়ন।
আশার ব্যাপার হলো যে, বাংলাদেশ সরকারও এ ব্যাপারে মোটামুটি তৎপর হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ১৯৯২ সালে প্রণীত পর্যটন নীতিমালার সংস্কার করে বাংলাদেশ পর্যটন নীতিমালা—২০১০ প্রণয়ন করেছে, বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড গঠন করেছে এবং পর্যটন সম্পর্কিত বেশ কিছু আইনও প্রণয়ন করেছে। ধীরে ধীরে ওই পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ও স্থানীয় পর্যটনকে জেলা পরিষদে হস্তান্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে এনেছে। এজন্য দক্ষ পর্যটন ব্যবস্থাপনারও প্রয়োজন।
পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটনকে কেন্দ্র করে। এমন উদাহরণ হাতের কাছেই আছে। বলা যেতে পারে মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ভারত ও সিঙ্গাপুরের কথা। অনুসন্ধানে জানা গেছে— মালয়েশিয়ায় পর্যটন খাতের বার্ষিক অবদান প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার। বিশ্ব পর্যটকদের ভ্রমণ তালিকায় মালয়েশিয়া নবম স্থানে। মালয়েশিয়া তাদের সৃষ্ট বিভিন্ন পর্যটন স্পট তৈরি করে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরও তাদের পর্যটন শিল্পকে সাজিয়েছে আকর্ষণীয়ভাবে।
এটি দারিদ্র্য বিমোচনেরও একটি বড় খাতও। পর্যটন একটি বহুমূখী কর্মসংস্থান সৃষ্টির শিল্প খাত। বিদেশি পর্যটকরা এখানে এসে যেমন কেনাকাটা করেন, তেমনি থাকা—খাওয়া এবং যাতায়াতের জন্যও তাদের ব্যয় করতে হয়। ফলে নানা পেশার মানুষ পর্যটকদের সুবাদে আয় করার সুযোগ পায়। পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারলে বেকারদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে সহায়ক হবে।
আমার বিশ্বাস, পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে বিদেশী পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। কারণ দুটো— আদিবাসীদের জীবনধারা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যত বেশি বিদেশি পর্যটক আসবেন তত বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। এ জন্য প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে আইন শৃঙখলা পরিস্থিতি। সেই সাথে স্থানীয় ও বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply