নীড় পাতা » বিশেষ আয়োজন » প্রভাংশু ত্রিপুরা : আমাদের গৌরব আমাদের অহংকার

প্রভাংশু ত্রিপুরা : আমাদের গৌরব আমাদের অহংকার

Prabhangshu-tripuraপ্রভাংশু ত্রিপুরা একজন বলিষ্ঠ মানুষ। জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যিনি সাফল্যের ছোঁয়া রেখেছেন। তাঁর ঐকান্তিক নিষ্ঠা, আন্তরিকতা প্রয়াস তাকে সাফল্যের কাছে নিয়ে গেছে। একনিষ্ঠ চিন্তা, গবেষণা এবং প্রকাশের আঙ্গিক তাঁর সাফল্যেকে সত্যনিষ্ঠ করেছে।
প্রভাংশু ত্রিপুরা বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন এবছর। অর্থাৎ ২০১৪ সালে। তাঁর এই অর্জন আমাদের গৌরব। আমাদের অহংকার।
পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি জাতিসত্ত্বার আলোকিত জীবনে উদ্ভাসিত হবার প্রেরণা, উদ্দীপনা। নিজের মায়ের ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সস্কৃতি সযতেœ লালনের পাশাপাশি জাতীয় সাংস্কৃতিক মূল ধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে যে সফলতার ছাপ রেখেছেন প্রভাংশু ত্রিপুরা তা সত্যই উজ্জিবনী শক্তি যুগিয়েছে।
প্রভাংশু ত্রিপুরা একজন মানুষের নাম। স্বনামেই খ্যাতিমান তিনি। ইতিহাসে সুপরিচিত ত্রিপুরা জনজাতির একজন হলেও মানবিক মূল্যবোধের দিক থেকে তিনি একজন সফল মানুষ। সংকীর্নতার উর্ধ্বে একজন নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।
প্রভাংশু ত্রিপুরার সঙ্গে পরিচয় তিন দশকের ও বেশি সময় আগে । কাছে থেকে দেখা একজন মানুষের কথা বলব- ১৯৮৭ সাল, বছর তিন এক হয় খাগড়াছড়ি জেলায় উন্নীত হয়েছে। অবকাঠামো ঠিকভাবে গড়ে উঠেনি। এ সময় পহাড়ী জীবন সংস্কৃতি ভিত্তিক বনফুল অনুষ্ঠান খাগড়াছড়িতে ধারণের পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়। বিটিভির এই অনুষ্ঠানের সংগঠক হিসেবে লেখক স¤্রাট সুর চাকমা, শিল্পী সংগঠক মংসাথোয়াই চৌধুরীর সংগে যোগাযোগ করি ।
বন্ধু শিল্পী জীবন রোয়াজার পরামর্শে প্রভাংশু ত্রিপুরার সংগে কথা বলি। ত্রিপুরা সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অজয় ত্রিপুরার সঙ্গে প্রভাংশু ত্রিপুরা যোগাযোগ করিয়ে দেন। নিজে ত্রিপুরাদের অংশ গ্রহনে ছিলেন সহযোগি । পাহাড়ী জাতিসত্ত্বার সংস্কৃতি বিকাশের প্রতি প্রভাংশুর অনুরাগ একেবারে স্বচ্ছ, প্রচ্ছন্ন।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোকলোকালয় অনুষ্ঠানে প্রভাংশু ত্রিপুরার একটি অনু সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়। সাক্ষাতকারে ত্রিপুরা জাতিসত্তার ইতিহাস এবং লোকজ সংস্কৃতির নানাদিক তিনি তুলে ধরেন। তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ বিবরণ বিশ্লেষন এবং বিবৃত করার নিজস্ব অধ্যায় প্রভাংশুর অত্যন্ত আকর্ষনীয়। বয়সে আমার চেয়ে ৬-৭ বছর বড় হলেও আমাদের দু’জনের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় নিষ্ঠ ।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির শিল্পীদের সঙ্গে বাংলাদেশের পাহাড়ী শিল্পীদের যোগসূত্র স্থাপনে প্রভাংশু ত্রিপুরা, জীবন রোয়াজা এবং আমার ভ’মিকা প্রকাশ করার মতো। ১৯৯৮ সালে সাংস্কৃতিক বিনিময় ধারায় পাহাড়ী শিল্পীদের প্রথম ভারত সফর শুরু হয়। সূচনা হয় সাংস্কৃতিক যোগাযোগের। পারস্পরিক সেতু বন্ধন সৃষ্টিতে প্রভাংশু ত্রিপুুরার ভূমিকা উজ্জ্বল। তার দৃঢ় নেতৃত্ব সে সময় চোখে পড়েছে।
২০০৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ত্রিপুুরা জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে নির্মিত বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রভাংশু ত্রিপুরা ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন দিক বর্ণনা করেন। ত্রিপুরা জনজাতির ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি, উৎসব, পার্বণ এ সবকিছুর নিবিষ্টতায় সাংস্কৃতিক জীবনের ছন্দ-আনন্দ কি বার্তা গ্রামীন জীবনে বিস্তৃত করে এ বিষয়টি স্বচ্ছভাবে প্রভাংশু বর্ণনা দিতে পারেন।
নৃত্যকলার বৈশিষ্ট্য এবং আঙ্গিকের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে তাঁর সহজ পাঠ রয়েছে। হাজার বছরের ত্রিপুরা ইতিহাস ও সংস্কৃতির নিখুঁত গবেষক- বিশ্লেষক প্রভাংশু ত্রিপুরার ঠোঁটের কাছে যেন ত্রিপুরা মহারাজা, রাজন্যবগর্, রাজ্যসীমা বিস্তৃতি, বিপন্ন, বিপত্তি বলা যায় সম্পর্কিত ইতিহাস উপস্থিত। যার বহমান ধারা তার লেখনীতে প্রতিফলিত হয়েছে। কৃষ্টি, সংস্কার- বিশ্বাস, যাবতীয় কর্ম-কৃতি, রীতি-নীতি, দান-অনুদান, উপদান, আচার-অনাচার, আচরন-বিকিরন, অনুভব-অনুভ’তি, অনুনয়-অনুকম্পা, আনন্দ¯œাত সাহচার্য, ধর্মবোধ-ধর্মপ্রাণতা, অফুরান্ত প্রাণপ্রাচুর্য এবং অবিচল আস্থার সুপ্রীতি, ত্রিপুরা সমাজের পরিচয় স্বাতন্ত্রিক অস্তিত্ব সম্পর্কিত গাঁথুনি তাঁর লেখায় সুস্পষ্ট।
ত্রিপুরা ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়ক লেখক, গবেষক, প্রচারক বরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা, নবীন কুমার ত্রিপুরা, কৃষ্ণ মোহন ত্রিপুরা, মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, প্রভাংশু ত্রিপুরা উল্লেখযোগ্য। পূর্বসূরিদের আলোকিত পথে প্রভাংশু ত্রিপুরা আজ সফলতা নিয়ে এসেছে।
ত্রিপুরা জাতিসত্তার বলিষ্ঠ আঙ্গিক, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক সাফল্য গাথা প্রভাংশু ত্রিপুরার লেখনিতে গ্রন্থীত রয়েছে। লেখক প্রভাংশু দিক ভ্রষ্ট হননি। ইতিহাসের কাছে আশ্রিত প্রভাংশু ত্রিপুরা লক্ষ্য নির্ভর গতিপথে এগিয়েছেন বলে আজ আমাদের দেশে একজন সফল সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। নীরবে নিভৃতে চর্চা ও অনুশীলনের ধারায় লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা আমাদের কাছে আজ সরব।
প্রভাংশু ত্রিপুরা শুধু পাহাড়ের সফল মানুষ নয়, তিনি বাংলাদেশের শক্তিমান কৃতি সন্তান।

লেখক : অনুষ্ঠান সংগঠক উপস্থাপক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বিষয়ক লেখক, গবেষক
Micro Web Technology

আরো দেখুন

ভাষা শিক্ষায় আশার আলো

একটা সময় ছিলো যখন প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারকে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মনে করতেন অনেকেই। …

Leave a Reply