নীড় পাতা » বিশেষ আয়োজন » প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী এক লেখকের স্বীকৃতি

প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী এক লেখকের স্বীকৃতি

Prabhangshu-tripuraঅতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের বুদ্ধি-বৃত্তির চর্চা বা জ্ঞান- চর্চা চিন্তার জগৎ বলতে রাঙ্গামাটি সদরকেই বুঝানো হত। কেননা বৃটিশ আমলের সৃষ্ট প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু, চাকমা রাজপরিবার ও তার বলয় এবং পাকিস্তান আমলে রাঙ্গামাটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রাঙ্গামাটি জ্ঞান-চর্চার ক্ষেত্ররূপে পরিচিতি লাভ করে। তখনকার সময়ে বিভিন্ন পূজা- পার্বন উপলক্ষে মাঝে মধ্যে কিছু ম্যাগাজিন প্রকাশিত হত। সেখানে অনেক জ্ঞানগর্ভ রচনা থাকত। ঊনিশ‘শ আশির দশকে স্বনামধন্য সাংবাদিক একে এম মকসুদ আহমেদের সম্পাদনায় বনভূমি নামে একখানা সাপ্তাহিকী প্রকাশনা শুরু হয়। সেখানে এতদাঞ্চলের সংবাদের পাশাপাশি সমাজ, সংস্কৃতি, পরিচিতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা সম্পর্কে অনেকেই লিখতে আরম্ভ করেন এবং লেখার চর্চা পরবর্তীতে বেশ শানিত হয়ে উঠে। দ্বিতীয়ত পন্ডিত অশোক কুমার দেওয়ানের নেতৃত্বে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট প্রতিটা লাভ করে। উক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন সাময়িকীতে আদিবাসীদের লুপ্তপ্রায় সাহিত্যসহ নানান বিষয়ে গবেষনামূলক লেখা বা রচনা স্থান পেত না। রাঙ্গামাটির বাইরের অঞ্চল থেকেও জনাকয়েকলেখার অভ্যাস করতে অনুপ্রানিত হন। বর্তমানে অনেক খ্যাতিমান অথবা পরিচিতি লেখক, কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিকের লেখার হাতেখড়ি বনভূমি, গিরিদর্পন ও ‘উসাই’ এর প্রকাশনা শাখা।
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী কিংবা বাঙ্গালি কোন পেশাদার লেখক ছিলেন না এবং এখনো নেই। যাঁরা লেখেন তাঁরা অন্য আয়ের উপর নির্ভরশীল থেকে সময় পার করে একান্ত মনের তাগিদেই লেখেন। কোন আত্ম-প্রচার অথবা অর্থকরি উপার্জনের জন্য নয়। নিজের ভাল লাগার জন্যই লেখেন। তবে পাঠকের মাধ্যমে নিজস্ব অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করে সমাজকে সঠিক পথে চালিত করবার একটা অর্ন্তগত প্রয়াস থাকে। খাগড়াছড়ি; কোন সাহিত্য চর্চার স্থান ছিল না। কাজেই লেখক শ্রেনীও গড়ে উঠে নি। তবে তখনকার সময়ে অর্থ্যাৎ আশিক দশকে খাগড়াছড়ি থেকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন লেখক বনভূমি, গিরিদর্পন, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিয়ের ম্যাগাজিন ও বিভিন্ন কিছু কিছু প্রকাশনায় প্রায় লিখতেন। তাদের মধ্যে প্রভাশু ত্রিপুরা অন্যতম। তিনি খাগড়াছড়ি জেলার প্রত্যন্ত এলাকা পানছড়ির এক অজপাড়া গাঁয়ের নির্বিবাদী মানুষ। সহজ, সরল ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন। বিশেষত ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের উপর তাঁর লেখার উপজীব্য। তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে ত্রিপুরাদের অপ্রকাশিত সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা, তন্ত্র মন্ত্র; নানা বিষয়ে সমকালীন পরিবেশে গ্রহণযোগ্য ও সখপাঠ্য লেখা উপস্থাপন করে এসেছেন দীর্ঘ তিনযুগব্যাপী। উপাদান, অনুসন্ধান, বিশ্লেষন এবং লেখার চর্চা করতে করতে ক্রমান্বয়ে তাঁর হাত শানিত হয়েছে। তিনি কোন সম্মাননা পাওয়ার কিংবা আত্মপ্রচার করতে লিখছেন না, লিখতেন নিজের ভাললাগা এবং পাঠক ও সমাজকে অনুৎঘাটিত তথ্যের সাথে পরিচয় দেওয়া। তাঁর লেখার অংশবিশেষ উপরে বর্ণিত পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে এবং যথেষ্ট পাঠক নন্দিত হয়েছে।
এ নীরব নিভৃতচারী লেখক ত্রিপুরা সাহিত্যে তাঁর গবেষণা কর্মে অবদানের জন্য ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমী কর্তৃক সম্মাননা লাভ করেছেন। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে তিনিই প্রথম এমন বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। প্রভাংশু ত্রিপুরা‘র মত একজন প্রচারবিমুখ লেখকের জাতীয় পর্যায়ের এক সম্মাননা লাভ আমাদের পার্বত্যবাসীর জন্য এক বড় গৌরবের বিষয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম ধর্ম-বর্ন-নির্বিশেষে মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন, আমরা তাঁর এ চেতনা দীর্ঘ সময়ব্যাপী উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি সগৌরবে। কিন্তু মহাকালের এ বিবর্ণ সময়ে পার্বত্য এলাকাতেও সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়াতে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তৎপর। এ অপতৎপরতার থাবায় আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিপদের মুখে, ঠিক তখনি এ এলাকারই এক মাটির সন্তান তাঁর লেখনীর গুনে এক জাতীয় স্বীকৃতি প্রাপ্তির সংবাদ আমাদেরকে আবার সাম্যতা ও সহাবস্থানের সাহস যোগাবে। পাশাপাশি খাগড়াছড়িতে একটা লেখক শ্রেনী গড়ে উঠতে সাহায্য করবে এবং তাদের লেখার মাধ্যমে এলাকা সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য আরো সমৃদ্ধি লাভ করবে।

লেখক : ফিল্ড সুপারিনটেনডেন্ট, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড
Micro Web Technology

আরো দেখুন

ভাষা শিক্ষায় আশার আলো

একটা সময় ছিলো যখন প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারকে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মনে করতেন অনেকেই। …

Leave a Reply