নীড় পাতা » ব্রেকিং » পুলিশের গাড়ী থেকে আসামী ছিনিয়ে নিলো ছাত্রলীগের দুই নেতা !

পুলিশের গাড়ী থেকে আসামী ছিনিয়ে নিলো ছাত্রলীগের দুই নেতা !

police-01
পুলিশের এই গাড়ী থেকেই ছিনিয়ে নেয়া হয় আটককৃত তিনজনকে

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য,রাঙামাটি শহরে বিরল এক ঘটনার জন্ম দিলেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজন,কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বাপ্পা ও তাদের সহযোগিরা। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টায় দুই আসামীকে নিয়ে যখন পুলিশ থানায় যাচ্ছিলো,তখনো পেছন থেকে একটি কারে করে এসে পুলিশের গাড়ীতে হামলা করে আসামীদের ছিনিয়ে নিয়েছে তারা।

police-02
পুলিশের গাড়ী আটকে বাকবিতন্ডা করছে সুজন ও বাপ্পা

জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো: জমিরউদ্দিনের পুত্র রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহউদ্দীনের মোটর সাইকেল চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই আসামী কলিম ও এরশাদকে আটক করে পুলিশ। তাদের সাথে থাকা আসিফ নামের আরো একজনকে আটক করা হয়। তিন আটককৃতদের নিয়ে থানায় যাওয়ার সময় পুরাতন বাস স্টেশন এলাকায় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি কার নিয়ে এসে পুলিশের গাড়ীর গতিরোধ করে সুজন ও বাপ্পা। যে কারটিতে করে এসে পুলিশের গাড়ী আটক করা হয় কারটির নাম্বার-চট্টমেট্টো-গ-১২০২২৯।

police-03
ছাত্রলীগের দাপটে বিপন্ন অসহায় পুলিশ !

এসময় কার থেকে নেমে আসে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বাপ্পা ও জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজন। তার পুলিশকে গালিগালাজ করতে থাকে এবং ওসিকে ফোন করে ঘটনাস্থলে আসার নির্দেশ দিতে থাকে। একই সাথে আরো কিছু ছাত্রলীগ কর্মীকে ফোনে ডেকে এসে জড়ো করে এবং পুলিশের পিকআপ থেকে তিন আসামীকে নামিয়ে নিয়ে চলে যায়। এসময় পিকআপে থাকা পুলিশ ও এসআই প্রিয়তোষ নির্বাক হয়ে পড়েন এবং কোন বাধাই দেননি বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

এসআই প্রিয়তোষ বলেন, ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা হতভম্ব হয়ে গেছিলাম। ওরা আমাদের সাথে যে আচরণ করেছে তা নজিরবিহীন। আমরা চাকুরি জীবনে এমন ঘটনা কমই দেখেছি।
তিন আসামীকে নিয়ে দাপুটে ভঙ্গীতে চলে যায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এসময় ছাত্রলীগ কর্মীরা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনা যায়, ‘ছাত্রলীগ সভাপতিই জেলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী…’।

ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে আসে আরো কয়েক পিকআপ পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ)মোঃ শহীদুল্লাহ,সহকারি পুলিশ সুপার চিত্তস রঞ্জন পাল,ওসি মুহম্মদ রশিদ। এসময় ঘটনাস্থলে আসা পৌর আওয়ামীলীগের নেতা নাসিরের সহায়তায় ছাত্রলীগ নেতাদের ঘটনাস্থলে ডেকে আনে পুলিশ। তবে ঘটনাস্থলে এসেও সুজন,বাপ্পা,মামুন,মিজান পুলিশের সাথে বিতন্ডায় জড়ায় এবং উদ্ব্যত্বপূর্ণ ভাষায় বক্তব্য রাখতে থাকে। পুলিশ বারবার আসামীদের তাদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ করলেও তাতে কোন পাত্তাই দেয়নি তারা। পরে ‘হতাশ’ ‘ক্ষুদ্ধ’ হয়ে ফিরে যান পুলিশ কর্মকর্তারা।

police-04
এসময় বন্ধ হয়ে যায় সড়কে যান চলাচল

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: শহীদুল্লাহ বলেন, এই ঘটনা নজিরবিহীন। এটা পুলিশের মর্যাদার প্রশ্ন। এভাবে আসামী ছিনিয়ে নিয়ে তারা যে অপরাধ করেছে তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না। আমরা বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা কোন অনুরোধই শোনেনি। এখন আমরা আইনগত পদক্ষেপ নিবো।
পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন,সরকারি কাজে বাধাদান এবং গাড়ী থেকে আসামী ছিনিয়ে নেয়া অনেক বড় অপরাধ। এর সাথে জড়িতদের কোন ছাড় দেয়া হবেনা। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

ঘটনাস্থলে ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজন,চিৎকার করে করে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর ভঙ্গী ও ভাষায় বক্তব্য দিতে থাকেন। আসামীদের তারা ছিনিয়ে নেননি বরং পুলিশই গাড়ী থেকে নামিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করতে থাকেন তিনি। এসময় ভুল ইংরেজীতে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে আপত্তিকর ভাষায় চিৎকার করে কথা বলতে থাকে সুজন। তিনি পুরনো প্রসঙ্গ টেনে নিজেকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ (!) নেতা বলেও দাবি করেন।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো: জমীরউদ্দিন বলেন, আমার এবং আমার এক প্রতিবেশী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার দুটি মোটর সাইকেল চুরির ঘটনায় ২৬ এপ্রিল আমরা মামলা করেছি থানায়। পুলিশ তদন্ত করে সন্দেহভাজন হিসেবে ওদের আটক করেছে। এখন ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ যদি পুলিশের গাড়ী থেকে আসামী ছিনিয়ে নেয় এটা দু:খজনক,নজিরবিহীন এবং লজ্জাজনক। ছাত্রলীগের নামে কেউ এমন অপকর্ম করলে এ দায় আওয়ামীলীগ নিবেনা বলেও স্পষ্ট করে দেন তিনি।police--cover

জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক প্রকাশ চাকমা বলেছেন, এটা অত্যন্ত দু:খজনক ঘটনা। আমাদের কেউ যদি আটক হয় এবং সে যদি নিরাপরাধ হয় সেটা আমরা আইনগতভাবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারতাম। কিন্তু পুলিশের গাড়ীতে হামলা করে আসামী ছিনিয়ে নেয়া আমাদের জন্যই লজ্জার। তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে, সুজন বা বাপ্পা মানেই ছাত্রলীগ নয়, এটা ওদের ব্যক্তিগত বিষয়। এর সাথে কোনভাবেই ছাত্রলীগকে জড়ানো যাবেনা। ছাত্রলীগ অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়াতে পারেনা।

কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহউদ্দীন বলেন, যাদের  আটক করা হয়েছে,তারা কেউই ছাত্রলীগ করেনা। তারা তো ছাত্রই না,ছাত্রলীগ কোত্থেকে করবে ? আমার মোটর সাইকেল চুরি হয়েছে,পুলিশ সন্দেহভাজনদের আটক করেছে, এখন যদি কেউ ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে পুলিশের কাজে বাধা দেয়, তাতো আমাদের ছাত্রলীগের জন্যই লজ্জার। ছাত্রলীগ এসব অপতৎপরতাকে সমর্থন করবেনা।

ক্ষুদ্ধ-হতাশ-স্তব্দ পুলিশ
পুলিশের গাড়ী থেকে আসামী ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনার আকস্মিকতায় যেনো নির্বাক হয়ে পড়ে পুরো পুলিশ বিভাগ। ঘটনার পর সেখানে প্রায় অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও কেউ কারো সাথেই কথা বলছিলেন না। সবার চোখে মুখেই ক্ষোভ,হতাশার চিহ্ন ছিলো স্পষ্ট। বেশ কয়েকজন কনস্টেবল ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন। তারা সিনিয়র অফিসারদের কাছে পিটুনির অনুমতি চাচ্ছিলেন। স্তব্দ হয়ে পড়েন উপস্থিত বেশ কয়েকজন এসআই এবং ডিবি-এসবি’র কর্মীরা। তারা বিষয়টি পুরো পুলিশ বিভাগের জন্যই ‘অপমানকর’ এবং ‘ অবমাননাকর’ বলেও মন্তব্য করছিলেন। কেউ কেউ পুলিশের অসহায়ত্বের কথাও বলছিলেন। পুলিশের গাড়ীতে হামলা, আসামী ছিনতাই,পুলিশকে গালাগালির ঘটনায় ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানান তারা।

একজন এসআই এসময় ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বলেন, আমাদের কিছু কর্মকর্তাদের দলবাজির কারণে পুলিশ সবসময় রাজনৈতিক দলের চাপে পিষ্ঠ থাকে এবং নানাভাবে ব্যবহৃত হয়,পুলিশের মান সম্মান ধুলোয় মিশে যায়। এভাবে চাকুরি করার মানে হয়না !

সর্বশেষ
এদিকে রাত আনুমানিক বারোটার দিকে ছিনিয়ে নেয়া দুই আসামী কলিম ও এরশাদকে আবারো পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। রাতে বারবার অনুরোধেও আসামী ফিরিয়ে না দেয়ার পরও এনিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ এবং বেশ কিছু সাংবাদিক উপস্থিত হওয়ায় এবং পুরো ঘটনা মুহুর্তেই শহরে ছড়িয়ে পড়লে এবং পুলিশ অফিসার ও কনস্টেবলরা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছেন এমনটা টের পেয়ে তৎপর হয়ে উঠেন আওয়ামীলীগ নেতারা। তারা ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামাল উদ্দীনকে পাঠালে রাত আনুমানিক বারোটার দিকে জেলা আওয়ামীলীগ অফিসে ছিনিয়ে নেয়া আসামীদের পুলিশের হাতে পুনরায় তুলে দেয়া হয়।

কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ মুহম্মদ রশীদ আসামী তুলে দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে কোন শর্তসাপেক্ষে তুলে দেয়া হয়েছে কিনা,তা স্বীকার করেননি তিনি। আটককৃত দুজনই থানা হাজতে আছে বলে জানান তিনি। অপরাধী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন নিজের নিয়মেই চলবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জুরাছড়িতে গুলিতে নিহত কার্বারির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় স্থানীয় এক কার্বারিকে (গ্রামপ্রধান) গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারী সন্ত্রাসীরা। রোববার …

Leave a Reply