নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » পাহাড় ঝিরি পেরিয়ে দূর্গম পথে যে শৈশব

পাহাড় ঝিরি পেরিয়ে দূর্গম পথে যে শৈশব

doloi-01পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো বহু দূর্গম পাহাড়ী গ্রাম আছে, যেখানে এখনো শিক্ষার আলো পৌছেনি। এসব স্থানে ভূ-প্রকৃতিগত কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও কঠিন। খাগড়াছড়ির কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকায় নেই প্রাথমিক বিদ্যালয়,তেমনি একটি গ্রাম দরিদ্র পীড়িত ‘ধলিয়া’। ওখানকার কয়েকটি পাড়ার শিশুরা দূর্গম পাহাড়ী পথ, ছড়া পেরিয়ে পড়তে যায় স্কুলে। বর্ষা মৌসুমে একটু বৃষ্টিতেই স্কুলে যাওয়া-আসার পথটি বন্ধ হয়ে যায়। সব শিশুকে স্কুলগামী করতে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধলিয়া (ধল্যা) এলাকায় একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তাই জোরালো হচ্ছে ক্রমশ:।

খাগড়াছড়ি-মহালছড়ি সড়কের ঠাকুরছড়া হয়ে পাঁয়ে হেটে যেতে হয় ধলিয়াসহ আশপাশ এলাকায়। অত্যন্ত দূর্গম এই পথে পাড়ি দিতে একে একে পথে পড়বে, ছড়া-ঝিরি-মেঠো আইল আর খাড়া পাহাড়। আসতে-যেতে প্রায় ১০/১১ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে লাগে অন্তত ৩ ঘন্টা। এতটা পথ হেঁটেই স্কুলে আসতে হয় ওইসব গ্রামের শিশুদের। স্কুলটি জেলা সদরের ঠাকুরছড়ায় হলেও ধলিয়া গ্রামটি পড়েছে মাটিরাঙ্গা উপজেলায়। বর্ষায় পাহাড়ী পথ পিচ্ছিল হলে এবং ছড়ায় পানি বাড়লে স্কুলে যাওয়া হয়না ছাত্রছাত্রীদের। এমনও হয় যে, পরীক্ষাও দেয়া হয়না তাদের। প্রবল বৃষ্টিতে ছড়ায় পানি বাড়লে স্কুলে আসা কমলমতি শিশুরা পড়ে কঠিন বিপদে। শুধু তাই নয়; স্কুলে আসা যাওয়ার মধ্যেই অনেক শিশুর সারাদিন কেটে যায়। সেই ভোরে আসা শিশুদের খাবার ব্যবস্থা নেই। আরো কত না বলা কষ্ট আছে তাদের। এছাড়া দুরবর্তী হওয়ায় বহু শিশু তো স্কুলেই আসেনা। পড়াশোনার সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছে তারা।
ঠাকুরছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্রী ধলিয়া গ্রামের সুমিতা ত্রিপুরা জানায়, মা-বাবা জুমচাষী। ভোরে শাক সিদ্ধ দিয়ে ভাত খেয়ে এসেছে। বাড়ী ফিরতে সন্ধ্যা হবে। এই ৯/১০ ঘন্টার মধ্যে আর কিছুই খাওয়া হবেনা তার। একই স্কুলের চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র কাপপাড়া গ্রামের প্রনব ত্রিপুরা সকাল ৭টার দিকে বৃষ্টিতে ভিজে ছড়া দিয়ে আসছিল। তখন এই প্রতিবেদককে বলেছে, ‘আমরা বৃষ্টি হলে স্কুলে আসতে পারিনা। বৃষ্টিতে বই ভিজে যায় এবং পানি বড় (বৃদ্ধি পেলে) হলে স্কুলে যেতে পারিনা।’ দ্বিতীয় শ্রেনীর ছাত্রী মেলেনা ত্রিপুরার আকুতি ‘ধলিয়া গ্রামে একটি স্কুল হলে ভালো হতো।’

মাটিরাঙ্গা ৬নং সদর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড এর সদস্য চন্দ্র কিরণ ত্রিপুরা বলেন, ধলিয়া (ধল্যা), কাপপাড়া, কমলচরণ কার্বারীপাড়া, হিরেন্দ্র কার্বারীপাড়া, দেরাইচন্দ্র কার্বারী পাড়াসহ ৬টি পাড়ায় দেড়‘শ পরিবার বসবাস করে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ওই গ্রামে স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও সরকারীভাবে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। গড়ে উঠেনি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জুমচাষ নির্ভর পাহাড়ীদের পক্ষে স্কুল গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। তাই পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে সরকারীভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

ওই এলাকার কার্বারী রুপন ত্রিপুরা জানান, এখানে একটি এনজিও স্কুল থাকলেও অনিয়মিত। জুমচাষী পরিবারের এসব শিশুদের পক্ষে নিয়মিত ৫/৬ কিলোমিটার দুরের ঠাকুরছড়া স্কুলে পাঠানো সম্ভব হয়না।doloi-02

ঠাকুরছড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সত্যপ্রিয় ত্রিপুরা জানান, ‘ধলিয়াসহ আশপাশ এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করতে আসে। অনেক শিশু সেই ভোরে ভাত খেয়ে স্কুলে আসে আবার বিকালের দিকে বাড়ীতে ফিরে। ক্ষুধা নিয়ে তাদের লেখাপড়াই বা কি হবে। ওই গ্রামেই একটি স্কুল হলে শিশুরা অন্তত ঘরে খেয়ে স্কুলে পড়তে পারবে। এতে স্কুলেগামী শিশুর সংখ্যাও বাড়বে।’
ত্রিপুরা কল্যান সমিতির পক্ষ হতে সম্প্রতি মাটিরাঙ্গার ধলিয়া ও পানছড়ির ভাইবোনছড়ার দূর্গম রবিধনপাড়ায় দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চেয়ে ইতিপূর্বে জেলা পরিষদের কাছে আবেদন জানিয়েছে।

জাবারাং কল্যান সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, দুরবর্তী এবং প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়মনীতি শিথিল করে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং দুপুরে শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা খুব প্রয়োজন। এছাড়া দূর্গম গ্রামের শিশুদের পড়াশোনার সুবিধার্থে কাছাকাছি স্থানে এলাকা নির্বাচন করে হোস্টেল নির্মান করা হলে ভালো হয়।

শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার জন্য ৩০টির বেশি শর্ত পুরন করতে হয়। সর্বশেষ নিয়ম অনুযায়ী সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা যাবেনা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রমেন্দ্র নাথ পোদ্দার জানিয়েছেন, ‘মাটিরাঙ্গার ধলিয়া গ্রাম এবং পানছড়ির রবিধনপাড়ায় স্কুল না থাকার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় স্থানীয়ভাবে প্রস্তাবনা পেলে সরকারের নজরে আনা সহজ হবে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ওইসব দূর্গম গ্রামে শর্ত শিথিল করে হলেও বিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরী বলে মনে করি।’

ধলিয়া, রবিধনপাড়াসহ স্কুলবিহীন এলাকার শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো পৌছাতে পার্বত্য জেলা পরিষদ এখনই এগিয়ে আসবে বলে আশা করেন খাগড়াছড়ির শিক্ষানুরাগীরা। উল্লেখ্য, খাগড়াছড়ির ৮ উপজেলার আরো বহু দূর্গম গ্রামেই প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লকডাউনে ফাঁকা খাগড়াছড়ি, বাড়ছে শনাক্ত

সারা দেশের মতো দ্বিতীয় দফায় সরকারের ঘোষিত লকডাউন চলছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। প্রথম দফার লকডাউন …

Leave a Reply