নীড় পাতা » ফিচার » অরণ্যসুন্দরী » পাহাড় কন্যা ‘নকাটাছড়া ঝর্ণা’ (পর্ব-১)

পাহাড় কন্যা ‘নকাটাছড়া ঝর্ণা’ (পর্ব-১)

আয়তনের দিক দিকে দেশের সবচে বড় জেলার নাম হচ্ছে রাঙামাটি। বিশাল এক কৃত্রিম হ্রদ আর শত শত পাহাড়ে ঘেরা এ জেলাটি দশটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ জেলার প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ের ভাজে ভাজে রয়েছে অসংখ্যা পাহাড় কন্যা নামে পরিচিত অপরূপা নানান ঝর্ণা। তেমনি এ জেলার ঝর্ণার জন্য বিখ্যাত একটি উপজেলার নাম হচ্ছে বিলাইছড়ি। পাঠকের সুবিধাতে এই উপজেলার বিভিন্ন ঝর্ণা নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনটিতে চেষ্টা করা হবে আলাদা আলাদা ভাবে ঝর্ণাগুলোর অবস্থান, রূপ ও সৌন্দর্য্যরে কথা বর্ণনা করার।

আমরা ১১ জনের একটি টীম রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার জেটি ঘাট থেকে বিলাইছড়ি যাওয়ার জন্য একটি রিজার্ভ বোট ভাড়া করে রওয়ানা হয়েছি (বলে রাখি, রাঙামাটি সদর থেকেও বিলাইছড়ি যাওয়া যায় বোটে করে,তবে যারা চট্টগ্রাম বা ঢাকা থেকে শুধুমাত্র রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় যেতে চান তারা সরাসরি রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলা আসলে সেখান থেকে বিলাইছড়ি যাওয়া সহজ ও যাতাযাত খরচটি কিছুটা কম হবে, রাঙামাটি থেকে রিজার্ভ বোট প্রায় সাত হাজার টাকা যা কাপ্তাই থেকে পাঁচ-সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা)। কাপ্তাই থেকে আমরা সকাল নয়টায় বোট ভাড়া নিয়ে রওনা হলাম বিলাইছড়ি উপজেলার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে বিশাল কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জল আর বিশাল বিশাল আকাশচুম্বী সবুজ পাহাড়ের দেখা মিলে। জল, পাহাড় আর আকাশের এ মিলন যে কোন ভ্রমণ পিপাসু মানুষের মনে দোলা দিয়ে স্বাগত জানায়ি প্রত্যশা জোগাবে প্রকৃতির আরো অপরূপ কিছু দৃশ দেখানোর জন্যে।

বিলাইছড়ি যাওয়ার পথে অবশ্যায় জাতীয় পরিচয়পত্রের তিনটি ফটোকপি সাথে নিতে হবে পর্যটকদের। এ জাতীয় পরিচয় পত্র বিলাইছড়ির প্রবেশ মুখ গাছকাটাছড়া সেনাবাহিনী ক্যাম্পে জমা দিয়ে অনুমতি নিতে হবে বিলাইছড়ি উপজেলা প্রবেশের।

সেখান থেকে অনুমতি নিয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে এসে পৌঁছলাম সকাল সাড়ে ১১টা নাগাত। বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে বেশ কয়েকটি বোডিং/হোটের রয়েছে সেখানে রুমনিয়ে ফ্রেশ হয়ে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে ভাড়া করা বোটটি নিয়ে বেরিড়ে পড়লাম ‘ন কাটাছড়া ঝর্ণার’ উদ্দেশ্যে। আবারও সেই হ্রদ আর দূর পাহাড়ের দৃশ উপভোগ করতে করতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম বাঙ্গালকাটা আদামের ঘাটে (আদাম অর্থ গ্রাম)।

সেখান থেকে স্থানীয় গাইড সুমন চাকমা আমাদেরকে আদামের পাশ দিয়ে একটি ছড়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেলো ঝর্ণার দিকে। যাওয়ার পথে পাহাড়িদের বসতবাড়ি, জুমের খেত (জুম অর্থ পাহাড়ে চাষাবাদ) পেরিয়ে কখনো পাহাড়ের উঁচুনিচু রাস্তা আবার কখনো ছড়ার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় অসংখ্যা নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে চলতে হয়। যাওয়ার পথটিতে যেনো রোমাঞ্চকর কিছু দৃশ্যের দেখে মিলে। দুইপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত পাহাড় আর পাহাড়ের সবুজ গাছপালা যেমনই সুন্দর তেমনই ছড়ার কিছু কিছু অংশের জল প্রবাহের দৃশ্য মনকে যে কোনো এক অচিন রাজ্যে নিয়ে যাবে নিমিষে, মুহূর্ত্বেই নিজেকেই হারিয়ে বসবে পর্যটকের মন।

ছড়ার মধ্যে যাওয়ার রাস্তাটি মাঝে মাঝে কিছুটা পিচ্ছিল তবে মসৃণ পথ দিয়ে ছড়ার প্রবাহমান জলের অসাধারণ সুর শুনতে শুনতে আর তার এঁকেবেঁকে যাওয়া জলের রূপ দেখতে দেখতে মূল র্ঝণার দিকে এগিয়ে যেতে হয়। এসময়ে কিছু অংশে ছড়ার হাঁটু পানিতে যেমন নামতে হয় আবার তেমনি করে পাহাড়ি গাছের লতা দিয়ে এক পাশ থেকে অন্য পাশ যেতে হয়। এ যেনো কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে সিনেমার টার্জেন মনে করিয়ে দেয়।

পাহাড়ি ছড়ার এ পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির নানান রূপ ও সুন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে প্রায় ঘন্টা খানিক পথ হাঁটলে পৌঁছে যাবেন মূল নকাটাছড়া ঝর্ণার কাছে। পাহাড়ের গাঁ বেয়ে অজ¯্র জল ঝড়ে পড়ার দৃশ আর জলের শব্দ প্রকৃতি প্রেমীকে আরও প্রেমিক করে তুলবে। ছড়ার মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া ঝর্ণার জল যেমন সুন্দর তার চেয়ে প্রায় তিন শ ফুট উপর থেকে গড়িয়ে পড়া জল যেনো আরো অনেক অপরূপ। ঝর্ণার আঁকাবাঁকা পথে এঁকেবেঁকে গড়িয়ে যাওয়ার জলের মধ্যে গাঁ ভাসিয়ে দিলে কত যে সুখের অনুভূতি জেগে উঠে তা জলের মধ্যে গাঁ ভাসিয়ে দেয়া পর্যটকই বলতে পারেন।

দুই দিকে বড় বড় গাছপালায় ভর্তি পাহাড়, পাহাড়ের ভাজে অপরূপ জল ঝড়ে পড়ার ঝর্ণার এ দৃশ যেনো কল্পনার স্বর্গের সুখের কথায় মনে করিয়ে দেয়। ন কাটাছড়া ঝর্ণায় আধ ঘন্টার মত থাকলেই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আরো বেশি জাকিয়ে বসবে প্রকৃতি প্রেমিকের মনকে।

স্থানীয় যুবক সুমন চাকমা জানান, ‘প্রতি বছর এসময়ে বিলাইছড়ির এই স্থানে ন কাটাছড়া ঝর্ণা দেখার জন্য অসংখ্যা পর্যটকরা আসেন। তাদের সুবিধাত্বে স্থানীয়রা গাইড হিসেবে তাদেরকে ঝর্ণা ঘুরিয়ে আনেন। এ গ্রামে প্রায় ৩০টি পরিবারের বসাবস। তাদের প্রধান আয় হচ্ছে জুম চাষ। তবে পর্যটকরা এলে তাদের সুবিধাত্বে সেবা দিলে কিছু বারতি উপার্জনও হয় তাদের।’

Eyes on Bangladesh এর সিও সাকিব মাহমুদ জানান, ‘রাঙামাটির বিলাইছড়িতে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ঝর্ণা রয়েছে। আমি গত তিন বছর ধরে এ স্থানে পর্যটক নিয়ে আসছি। এবারসহ ৬ষ্ঠ বারের মতো আসা আমার এ বিলাইছড়িতে। আমি বাংলাদেশের অনেক ঝর্ণা দেখেছি কিন্তু সেগুলো থেকে বিলাইছড়ির ঝর্ণা গুলো অরেক বেশি সুন্দর।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানের পর্যটনের জন্য বিশাল এক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনকে নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়ে আরো কাজ করা প্রয়োজন। এছাড়া স্থানীয় কমিউনিটিকে উন্নত করার জন্য নজর দিতে হবে প্রশাসনকে।’

উল্লেখ্য, বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে থাকার জন্য যে হোটেল গুলো রয়েছে সেগুলোর ভাড়া পরবে ১৫০-২০০ টাকা, এখানে খাবার জন্য রুচিশীল ব্যবস্থাও করে থাকেন স্থানীয়রা। তবে এখন হ্রদের পানি বেশি থাকায় হ্রদের সুস্বাদু মাছও খেতে পারেন।

লেখক: তরুণ সংবাদকর্মী

Micro Web Technology

আরো দেখুন

‘কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আমূল পরিবর্তন হয়েছে’

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্ট্রেনদেনিং ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইন সিএইচটি (এসআইডি-সিএইচটি)-ইউএনডিপি’র বাস্তবাায়নে এবং ড্যানিডা’র অর্থায়নে পার্বত্য …

Leave a Reply