নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » পাহাড়ে সহিংস ঘটনার দায় কার ?

পাহাড়ে সহিংস ঘটনার দায় কার ?

Untitled-1 copyপার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত ঘটছে খুন,অপহরণ,গোলাগুলি, চাদাঁবাজি। আর এসবের কারণে আতংকে থাকতে হয় এই জনপদের মানুষগুলোকে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরিন কোন্দলের ফলে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনার জন্য উত্তেজনা, আতংক, উদ্বেগতো লেগেই আছে।

সর্বশেষ ১৭ অক্টোবর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় প্রতীম কুমার ত্রিপুরা (২৫) নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বত্তরা। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তি  ইউপিডিএফ এর সমর্থক বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

২৩ অক্টোবর খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় চারজনকে অপহরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার রাতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রত্যেককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিজ নিজ ঘর থেকে তুলে  নিয়ে যায়। অপহৃতরা হলেন, উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ১নং যৌথ খামার প্রকল্প গ্রামের যতীন বিকাশ চাকমা (৩৮), বাজেইছড়া গ্রামের সরল কুমার চাকমা (৬০), মিন্টু চাকমা (৪০) এবং রীপন চাকমা (২৫)। এ ঘটনার জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) পরস্পরকে দোষারোপ করছে।  এই ঘটনাটিতে নিজেদের জড়িত থাকার কথা যেমন আঞ্চলিক দলগুলো স্বীকার করেনি তেমন অতীতের সহিংস ঘটনাগুলোতে নিজেদের জড়িত থাকার কথাও বরাবরই অস্বীকার করে আসছে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো।

পার্বত্য চট্টগ্রামে মূলত তিনটি আঞ্চলিক দল পাহাড়ীদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালাচ্ছে। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা পিসিজেএসএস, সুধাসিন্ধু খীসা ও রূপায়ন দেওয়ানের নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস (এমএন লারমা) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)

পাহাড়ে যেকোন সংঘাত বা সহিংস ঘটনার পর পরস্পরের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে একে অন্যকে দোষারপ করে থাকে এই দলগুলো। ইউপিডিএফ এর কোন কর্মী সমর্থক হামলার স্বীকার হলে দায়ী করা হয় জেএসএস সন্তু গ্রুপ কে। আবার জেএসএস সন্তু গ্রুপের কোন কর্মী সমর্থক মারা গেলে তার দায় পড়ে ইউপিডিএফ’র ঘাড়ে। অন্যদিকে জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের কর্মী সমর্থকদের উপর হামলা হলে তার দায়ও পড়ে সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন সংগঠনের উপরে। বিপরীতভাবে তাদেরও বিরুদ্ধে উঠে অভিযোগের আঙ্গুল।

প্রতিটি সংগঠন পাহড়ের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্টা, ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধসহ নানান মুখরোচক শ্লোগানে শান্তির কথা বললেও তা কতটুকু সত্য আর কতটুকুই বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটাই বুঝে উঠতে পারছেনা পাহাড়ের সাধারন মানুষ।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)’র কেন্দ্রীয় নেতা প্রদীপন খীসা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলা প্রতিটি সহিংস ঘটনার সাথে সন্তু লারমা’র নেতৃত্বাধীন জেএসএস দায়ী। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য নানাভাবে সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের নির্মূলের মিশনে নেমেছে। তারা আমাদের ২৪৬ জনেরও অধিক কর্মী সমর্থককে হত্যা করেছে। এবং এক হাজারের অধিক অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা এ দায় কোনভাবে এড়াতে পারবেনা।
নানা সময় জেএসএস(সন্তু লারমা)”র নেতাকর্মীদের কারা হত্যা করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সন্তু লারমার একনায়তন্ত্র, স্বৈরাচারী মনোভাব এবং তার নেতাকর্মীদের নির্যাতনের কারণে জুম্ম জনগন আজ অস্থির। তারাই প্রতিরোধ করে থাকতে পারে। তাছাড়া জেএসএস’র বিদ্রোহী আরেকটি দলতো আছেই। তারাও হত্যাকান্ড চালিয়ে থাকতে পারে বলেও দাবি করেন এই ইউপিডিএফ নেতা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)’র খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি সুধাকর চাকমা বলেন, তিনি (সন্তু লারমা) গনতন্ত্রে বিশ্বাসী না। সব জায়গায় চুক্তি বাস্তবায়নের জোরদাবি জানালেও বাস্তবে তা মিথ্যা। যেহেতু আমরা পাহাড়ে শান্তি চাই বলে নতুন সংগঠন গঠন করে গনতন্ত্রের চর্চায় নেমেছি তখন তিনি অন্য সকল বিরোধী দলকে হত্যার মিশনে নেমেছেন। আর সেই মিশনে নিহত হচ্ছে আমাদের নেতাকর্মীরা। তারা ২০১০ সাল থেকে আমাদের ৭০ জনেরও অধিক কর্মী সমর্থককে হত্যা করেছে।

তিনি আরো বলেন,আর চোর কখনো বলবেনা চুরি করেছে। তেমনি তারা আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করে বলবেনা হত্যা করেছে। মূলত সন্তু লারমা এবং তার সংগঠন পাহাড়ের সহিংস ঘটনার জন্য একমাত্র দায়ী। আর আমাদের সংগঠন আজ পর্যন্ত কোন সহিংস ঘটনার সাথে জড়িত ছিলোনা। যা অতীত ঘাটলেই বুঝতে পারবেন।

তবে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র সহ সভাপতি উষাতন তালুকদার বলেন, যদি দুই পক্ষের কাছে অস্ত্র থাকে তাহলে গোলাগুলিতো হবেই। আর গোলাগুলি হলেই নিহত বা আহত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এমন ঘটনায় নিজেদের লোক নিহত হলে অন্য দলকে দায়ী করা স্বাভাবিক বিষয়। আর কে আমাদের দায়ী করলো এতে আমাদের কিছুই যায় আসেনা।
পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিটি সহিংস ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করে এই পার্বত্য নেতা বলেন, তারা কখনো রাজনৈতিক দল হতে পারেনা। তারা হলো চাদাঁবাজ ও সন্ত্রাসী বাহিনী। তারা যতদিন থাকবে ততদিন পাহাড়ে শান্তি আসবে না। সংঘাত চলবেই। তাদের উচিৎ সময় থাকতে অস্ত্র জমা দিয়ে দেয়া, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা।
ইউপিডিএফ’র ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধের আহ্বান সম্পর্কে জানতে চাইলে পাহাড়ী এই নেতা বলেন, সন্ত্রাসী, চাদাঁবাজ দল আমাদের ভাই হতে পারেনা। তাই ওদের সাথে সমঝোতার প্রশ্নই আসেনা। আর জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) ‘আবেগের সংগঠন’ বলেও জানান তিনি।

তবে স্থানীয়রা মনে করেন এই তিন রাজনৈতিক দলের নেতারা স্বীকার করুক আর নাই করুক প্রতিটি ঘটনার সাথে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো অবশ্যই জড়িত। তাদের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য এবং অভ্যন্তরিন কোন্দল ও অধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি এবং সহিংস মনোভাব থাকলে পাহাড়ে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা হবেনা। শান্তি যদি আনতেই হয় তাহলে ঐক্যমতের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন করতে হবে। বন্ধ করতে হবে সহিংস সংঘাত।

পাহাড়ের তিন রাজনৈতিক দলের বিভেদ আর সংঘাতের ঘটনায় ক্ষুদ্ধ সাধারন পাহাড়ী ও সুশীল সমাজ। ভ্রাতৃঘাতি ও আত্মঘাতি এই সংঘাতে বন্ধের দাবিতে রাঙামাটি,খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানে নানা কর্মসূচীও পালিত হয়েছে। সুশীল সমাজের পক্ষ থেকেও নানান সময় নেয়া হয়েছে পদক্ষেপ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। ফলে এই সংঘাত,সহিংসতা আর প্রাণহাতি যেনো পাহাড়ের মানুষের নিয়তিই হয়ে উঠেছে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

পিসিপি’র সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা

দেশে অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকুরীতে সংরক্ষিত ৫% কোটা পুনর্বহালের দাবিতে …

Leave a Reply