পাহাড়ে সম্প্রীতির উৎসব

আবহমান বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি নববর্ষ। আমরা নববর্ষকে ঐতিহ্যবাহী লোকাচারও বলতে পারি। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের জনমানুষের কৃষি নির্ভর অর্থনৈতিক জীবন—জীবিকা নববর্ষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বিশেষ করে গ্রামীণ জীবনের প্রাত্যহিকতায় জড়িয়ে থাকে বাংলা মাস। যেমন— ফসল বোনা, ফসল কাটা, নবান্ন, হালখাতা। এ নববর্ষ কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়। বাংলাদেশের আপামর ষোল কোটি মানুষের। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী নির্বিশেষে বাংলা নববর্ষকে বিভিন্নভাবে বরণ করে থাকে। সমতল জেলায় যেমন চৈত্র সংক্রান্তি, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের মাধ্যমে বর্ষবরণ করা হয়, তেমনিভাবে পাহাড়েও ‘বৈসাবি’র মাধ্যমে বর্ষবরণ করা হয়। পার্বত্য জনপদের আদিবাসীরা বৈসু, সাংগ্রাই, বিজুর মাধ্যমে নববর্ষ উৎসব পালন করে থাকে।
আমি তখন তরুণ। খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ১৯৮৩ খ্রি: প্রথম বৈসাবি রঙে আমি রঙিন হয়েছিলাম। তারুণ্যের উদ্দাম উচ্ছ্বাসে সেদিনের বৈসাবি উৎসব আমার হৃদয়ে অসাম্প্রদায়িকতার এক অনাবিল আনন্দের জন্ম দিয়েছিল। কার বাড়িতে গিয়েছিলাম এখন আর মনে নেই। তবে অবশ্যই কোন এক সহপাঠীর বাড়ি। আমি যাওয়া মাত্র পরম আতিথেয়তার সাথে বসানো হল। বৈসাবির প্রধানতম ঐতিহ্যবাহী উপাদান ‘পাঁচন’ পরিবেশন করা হলো। যদিও শুটকীর গন্ধটা প্রকট ছিল, তদুপুরি স্বাদের ও ঝালের জন্য বেশ মজা করে খেলাম। এরপর সাদা, লাল, নীল ‘মদ’ এলো। আমি সবিনয়ে মদ প্রত্যাখান করলাম। শেষে পরিবেশন করা হলো তরমুজ ও বিভিন্ন ফল। ফল খেয়ে গল্প, গানে, আনন্দে মেতে উঠলাম। সেদিনের আনন্দের হিল্লোল আজো মনে পড়লে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।
বিভিন্ন কারণে পাহাড়ি—বাঙালির মধ্যে এক রকম অবিশ্বাস, ঘৃণা কাজ করে থাকে। কিন্তু যখনই বছর ঘুরে শ্বাশত নিয়মে নববর্ষ আসে, তখন সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এ যেন প্রাণের সাথে প্রাণের মিলন মেলা। আমার দেখা দূরন্ত তারুণ্যের আবেগে দেখা ১৯৮৩ সালের বৈসাবি এবং আজকের বৈসাবির মধ্যে তুলনামূলক কোন পার্থক্য নেই। তবে আতিথেয়তায় এসেছে ভিন্নতা। একসময় বৈসাবি উৎসবে পাহাড়ি বাড়িতে কোন মেহমান এলে তাকে ঐতিহ্যবাহী ‘পাঁচন’ এবং ‘মদ’ দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ‘মদ’ এখন একটি উপকরণ মাত্র। অত্যাবশ্যকীয় কোন উপাদান নয়। এখন অনেকে সচেতনতার সাথে মদ পরিহার করে থাকেন। আতিথেয়তার আদি ও অকৃত্রিম পাঁচনেও এসেছে ভিন্নতা। পাঁচনে এখন শুটকীর ব্যবহার কমে এসেছে। অধিকাংশই শুটকীর বদলে ছোট চিংড়ি দিচ্ছেন। বাঙালিদের মাংস, পোলাও, সেমাই, ফলফলাদিও বৈসাবিতে সংযোজিত হয়েছে।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমাকে নাড়া দেয় সেটি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বানচালের বিষয়টি। মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট মানুষে মানুষে যে জঘন্য বিভাজন তা পাহাড়ের নববর্ষে থাকে না। এ অপরূপ মিলনমেলা বিভাজনের দেয়াল ভেঙ্গে দেয়। সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি মানুষ এক হয়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। ভাবতে কষ্ট হয় অদৃশ্য অশুভ দানবের ইশারায় সম্প্রীতির এ মিলনমেলা বানচালের চেষ্টা চলে। সাম্প্রদায়িকাতর বিষবাষ্পে কালো হয় পার্বত্য জনপদেও বিশাল নিলিমা। মানুষের লাল রক্তে রঞ্জিত হয় সবুজাভ শ্যামল পাহাড়। আমি জানি না কেন এ বিভাজন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের কারণ। তবে এটুকু বুঝি পানি ঘোলা করা এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার অপকৌশল।
আসুন, আমরা সবাই জাতি—ধর্ম—বর্ণ এবং দলমত নির্বিশেষে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারী’র স্বরূপ উন্মোচিত করি, চিহ্নিত করি এবং হৃদয়ের সমস্ত ঘৃণা দিয়ে এদের প্রতিরোধ করি। এবারের বৈসাবির শ্লোগান হোক ‘সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক, মানবতা মুক্তি পাক’। পার্বত্য জনপদের সকল শান্তিকামী মানুষের পক্ষে আমার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা জানিয়ে আমিও বলতে চাই ‘জয় হোক মানুষের, জয় হোক মানবতার’। আসছে ১৪২১ বঙ্গাব্দ পাহাড়ি—বাঙালি সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তির সুশীতল বার্তা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply