নীড় পাতা » আলোকিত পাহাড় » পাহাড়ে সংষ্কৃতি আর ঐতিহ্য রক্ষার বাতিঘর

পাহাড়ে সংষ্কৃতি আর ঐতিহ্য রক্ষার বাতিঘর

usai-pic-22পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুভাষিক আর বহুমাত্রিক সংষ্কৃতিকে লালন,পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ও সংরক্ষণে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উপজাতীয় সাংষ্কৃতিক ইন্সটিটিউট, যা এখন ক্ষুনৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট নামেই পরিচিতি লাভ করেছে।  ‘আরণ্য জনপদে’ খ্যাত লেখক আব্দুল সাত্তারকে পরিচালক নিয়োগ দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসকারী এগারোটি জনগোষ্ঠীর লুপ্তপ্রায় ভাষা,সাহিত্য,রীতিনীতি,বিশ্বাস,আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও গবেষনার কাজ করে আসছে। একই সাথে উপজাতীয় সংষ্কৃতির জীবনধারা ও লোক সাহিত্যের পান্ডুলিপি সংগ্রহ,পুস্তক ও সাময়ীকি প্রকাশ,সেমিনার ও প্রদর্শনীর আয়োজন, স্থানীয়-জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক আয়োজন, উপস্থাপন,উপজাতীয় সংস্কৃতিকর রেকর্ডকর,সংলক্ষন ও প্রচার,চারু ও কারুশিল্প,পোষাক পরিচ্ছদ,অলংকার,সংগীত,যন্ত্র,মুদ্রা,অস্ত্রশস্ত্র সংরক্ষন ও নিজস্ব জাদুঘরে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে।
প্রতিষ্ঠার ৩৪ বছরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের ঐতিহ্য ও সংষ্কৃতি নিয়ে প্রায় ৭০ টি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস,সংগীত,জীবনাচারণ সংক্রান্ত গবেষনাগ্রন্থই বেশি। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইংরেজীতে প্রকাশিত কয়েকটি বইয়ের বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেছে ইন্সটিটিউট।
আবার ‘গিরিনির্ঝর’ নামে একটি নিয়মিত প্রকাশনা বের হলেও ১৯৮৯ সালে ৯ টি সংখ্যা প্রকাশের পর এটি এখন আর নিয়মিত নয়। তবে প্রতিবছর বর্ষবরণ ও বিদায়ের উৎসব ‘বৈ-সা-বি’ পালনের সময় এখনো একটি নিয়মিত প্রকাশনা বের হয়,প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন নামে। পাশাপাশি প্রতিবছরই বের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুস্তক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোকে পুস্তক প্রকাশনার হার একেবারেই কম। সর্বশেষ বছরে প্রকাশিত হয়েছে ‘ক্ষু-নৃগোষ্ঠীর নির্বাচিত গান’শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। Rangamati-pic-02
প্রকাশনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতি রক্ষায় চাকমা,মারমা,ত্রিপুরা ও তংচঙ্গ্যা ভাষায়  স্বল্পকালীন এবং দীর্ঘকালীন প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ২ বছরের সার্টিফিকেট কোর্সটি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন,পার্বত্যাঞ্চলে আসা দেশী বিদেশী অতিথিদের সামনে স্থানীয় বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করা,জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ইভেন্টে সাংষ্কৃতিক উপস্থাপনাকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি। একই সাথে চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া নানা তথ্য,উপাত্ত সংগ্রহ ও গবেষনার কাজ।
এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকমা ভাষা ও বর্ণমালা শেখানো হয়। শিক্ষকরা সাত দিনের এই ভাষা শিক্ষা কোর্স গ্রহণ করে তা নিজ নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চারমাসব্যাপী শিক্ষা প্রদান করে থাকেন। এর মাধ্যমে স্কুল পর্যায়েই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ভাষা ও বর্ণমালা সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের ‘ রাঙামাটি পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিকাশ ও সংরক্ষণ কর্মসূচী’ প্রকল্পের আওতায় এই ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমটি চলছে বলে জানিয়েছে ইন্সটিটিউট ।
এই প্রতিষ্ঠানের সবচে আকর্ষনীয় দিক হলো ২০০৩ সালে ১ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত জাদুঘর কাম লাইব্রেরীটি। এই জাদুঘরটি একবার ঘুরে দেখলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় সবগুলো জনগোষ্টীর জীবনাচার,সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের নান্দনিক উপস্থাপনা রয়েছে এই জাদুঘরে। তবে চমৎকার একটি ভবনের আকর্ষনীয় এই জাদুঘরটি প্রচারের  আলোয় না থাকায় রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকরা বঞ্চিত হন এর নান্দনিক ছোয়া থেকে। ত্রিতল ভবনে ছোট অথচ সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরীও আছে আগ্রহী গবেষকদের জন্য। লাইব্রেরীতে প্রায়  দশহাজার বই আছে। গত অর্থবছরে ৬ লক্ষ টাকার বই কেনা হয়েছে,এবারও প্রায় সমপরিমাণ বই কেনা হবে বলে জানিয়েছেন ইন্সটিটিউট কর্তৃপক্ষ।
আবার শহরের সবচে আধুনিক অডিটোরিয়ামটির মালিকানাও এই প্রতিষ্ঠানটির। ২৫০ আসনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সব আয়োজন।
পার্বত্য সংষ্কৃতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বরাদ্ধ একেবারেই নগণ্য। সর্বশেষ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিলো মাত্র ৮০ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে কর্মচারীদের বেতনভাতা আর দাপ্তরিক ব্যয়েই চলে যায় বড় একটি অংশ। আবার প্রতিষ্ঠানে রয়েছে কমচারী সংকটও। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাদুঘরে কোন কর্মচারীই নিয়োগ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির ২৯ টি পদের মধ্যে খালি পড়ে আছে ১০ টি। এমনকি খালি পড়ে আছে পরিচালক আর সহকারী পরিচালকের ৪ টি পদও । আর দীর্ঘ সময়েও প্রবিধান প্রণয়ন না করায় অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা কর্মচারীরা কিছুই পাননি চাকুরী জীবন শেষে,আবার দীর্ঘদিন ধরে চাকুরী করেও প্রমোশন আটকে আছে অনেকের। শুরু থেকেই সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের অধীনে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৩ সালের ১ মে পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। তবে এই প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে জেলা পরিষদ আজ অবধি কোন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন বা গবেষনা প্রকল্প হাতে নেয়নি বলে জানা গেছে। Rangamati-pic-01
তবে আশার কথা হলো আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রায় ৪ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি প্রশিক্ষন  কেন্দ্র ও শিল্পীদের আবাসিক ভবন,একটি মাচাং ঘর,সীমানা দেয়াল নির্মাণ ও সৌন্দর্যকরণের  কাজ বাস্তবায়ন করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে জনবল সংকট,অপর্যাপ্ত তহবিল,সরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট এর রিচার্স অফিসার শুভ্রজ্যোতি চাকমা বলেন-‘এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবশ্যই এই অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা হচ্ছে। এখানে যেসব গবেষনা,প্রকাশনা বা উন্নয়ন কাজ হচ্ছে তা ব্যক্তি পর্যায়ে কখনই সম্ভব নয়। অত্যন্ত মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের ইতিহাস,ঐতিহ্য,সংষ্কৃতি রক্ষায় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তা অন্য কেউ করতে পারেনি। usai-pic-011

তবে রাঙামাটির বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিশির চাকমা মনে করেন এই ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার সময় এই অঞ্চলের মানুষের যে আশা ছিলো তা পূরণ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তিনি বলেন-গত কয়েকবছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি অনেকটাই অকার্যকর হয়ে আছে,নামকাওয়াস্তে কিছু কাজ হচ্ছে বটে কিন্তু নিয়মিত কোন প্রকাশনা নেই,কার্যক্রম বা উদ্যোগও নেই। তিনি বলেন,এই ধরণের একটি প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য যে ধরণের যোগ্য ও সংস্কৃতিমনা লোক দরকার ছিলো বর্তমানে তা না থাকায় যারা আছে,তারা অনেকটা দায়সাড়াভাবে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন,ফলে এই প্রতিষ্ঠান এখন আর পাহাড়ের মানুষের কোন কাজেই আসছেনা।
তবে কেবল তিনিই নন,এই অঞ্চলের সক্রিয় সংস্কৃতিকর্মীরা মনে করেন,পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় বাজেট,সঠিক পরিকল্পনা,যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের  পরিচালক ও সহকারি পরিচালক  পদে নিয়োগ,জেলার সংস্কৃতিকর্মীদের আরো বেশি এই প্রতিষ্ঠানের কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা এবং হস্তান্তরিত বিভাগ হিসেবে জেলা পরিষদের আন্তরিক কর্মপ্রয়াসই পারে এ প্রতিষ্ঠানটিকে এই অঞ্চলের সংস্কৃতি আর সাংস্কৃতিক কর্মীদের তীর্থস্থাণে পরিণত করতে। Rangamati-pic-07

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্য বিভাগকে সুরক্ষা সামগ্রী দিলো রাঙামাটি রেড ক্রিসেন্ট

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাঙামাটির ১২টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহে স্বাস্থ্য …

Leave a Reply