পাহাড়ে প্রভাব কমছে ইউপিডিএফ’র!

UPDF-flag-coverপাহাড়ের রাজনীতি ও ভৌগলিক মানচিত্র নিয়ন্ত্রণে প্রভাব কমে আসছে পার্বত্য চুক্তি নিয়ে ‘অসন্তোষ’ ও ‘ভিন্নমত’ জানিয়ে আত্মপ্রকাশ করে গড়ে উঠা পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’র।

পার্বত্য রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একথা এখন বলাই যায় যে, প্রতিষ্ঠার প্রায় আঠারো বছর পর এখন বেশ নাজুক অবস্থায় পড়েছে সংগঠনটি। গত কয়েকমাসে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মী খুন, গ্রেপ্তার ও মামলার ভয়ে পলাতক থাকার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে বলে স্বীকার করছেন খোদ সংগঠনটির দায়িত্বশীল নেতারাও। সবশেষ গত ১৪ জুন লংগদুতে সংগঠনের তিন কর্মীকে হত্যা ওই উপজেলায় সংগঠনটির সাংগঠনিক অবস্থানকে আরো নড়েবড়ে কওে দিয়েছে। অথচ বছর খানেক আগেও এই উপজেলার প্রায় ৬২ জন নেতাকর্মীকে একযোগে অপহরণ করে দীর্ঘদিন আটকে রেখে নিজেদেও ‘শক্তিমত্তা’ ও ‘আধিপত্য’ প্রদর্শন করেছিলো প্রসীত খীসার দলটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জনসংহতি সমিতির আধিপত্যের কারণেই ইউপিডিএফ সাময়িক কোণঠাসা হয়ে পড়ছে বলে পাল্টা অভিযোগ ইউপিডিএফের। যদিও এনিয়ে ভিন্নমত রয়েছে দুই সংগঠনের নেতাদের।

ইউপিডিএফের অভিযোগ, জনসংহতি সমিতি চুক্তি বাস্তবায়নে ডেডলাইন ঘোষণার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে যে অসহযোগ আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে, সে হুমকি চুক্তি বাস্তবায়নে নয়; মূলত ইউপিডিএফের অস্তিত্ব ধ্বংসের হুমকি। যা বর্তমানে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে জনসংহতি সমিতির দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতায় সাধারণ জনগণ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তাই তাদের প্রভাব কমে আসছে।

বরাবরই খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের ভালো অবস্থান থাকলেও এখন এই জেলায়ও এই সংগঠনের অবস্থা আগের মতো নেই। দীঘিনালায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন নিয়ে গত মার্চে সৃষ্ট জটিলতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় মামলার কারণে বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া আরো বেশ কিছু নেতাকর্মী পলাতক রয়েছে বলে পুলিশ জানায়। ধারণা করা হয়,ইউপিডিএফ এর সবচে বড় ‘রাজনৈতিক ভুল’ ছিলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বাধাদানের চেষ্টার ঘটনা।

গত সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী খাগড়াছড়ি সফরের সময় সমাবেশে আসা নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়ার কারণেও বেশ ভুগতে হচ্ছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। ঐ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী সমাবেশে বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। ওইদিন খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী ও সাধারন মানুষকে জনসভায় আসার পথে বাধাদানের ঘটনায় দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় আসামী হন কয়েকশ ইউপিডিএফ নেতাকর্মী, গ্রেপ্তারও হন অনেকেই। এই ঘটনার দৃশ্যত চাপে পড়ে যায় পাহাড়ের রাজনীতিতে ‘গরম পার্টি’ হিসেবে পরিচিত সংগঠনটি। প্রধানমন্ত্রীর জনসভা নিয়ে বাড়াবাড়িকে ভালোভাবে নেয়নি কেউই। সরকারি দল,আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী, সাধারণ মানুষ এর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এবং পাহাড়ের অন্যান্য আঞ্চলিক দলের এই বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশই জানান দিচ্ছিলো, খড়গ নামছে সংগঠনটির ওপর। আর বরাবরই সংগঠনটিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ‘অস্ত্রবাজ-চাঁদাবাজ’ সংগঠন হিসেবে তাদের নিষিদ্ধের দাবি করে আসা প্রতিপক্ষ জনসংহতি সমিতিও বিষয়টিকে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হওয়ায় চ্যালেঞ্জে পড়ে সংগঠনটির কার্যক্রম।

ফলে জনসংহতি সমিতি চাপ, প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশে বাধা ও দীঘিনালায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার কারণেই মূলত এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে এই সংগঠনটি। এখন খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গা ও দীঘিনালায় কিছুটা সাংগঠনিক কর্মকা- দেখা গেলেও জেলার অন্য কোনো উপজেলায় তেমন একটা কর্মকা- চোখে পড়ে না এই সংগঠনের। অপরদিকে রাঙামাটিতে একসময় শহরের কাছাকাছি চলে আসলেও এখন বরকল-বাঘাইছড়ি-কাউখালির কিছু নির্দিষ্ট এলাকা, লংগদুর কাট্টলিসহ কিছু এলাকা, আর নানিয়ারচর উপজেলা ছাড়া রাঙামাটি জেলায় আর তেমন একটা সাংগঠনিক অবস্থান নেই ইউপিডিএফের।

কয়েকদিন আগে ইউপিডিএফের তিন কর্মীকে গুলি করে গোলাছড়ির যে জায়গায় হত্যা করা হয়েছে, এলাকাটি ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এই ঘটনার পর ওই জায়গাটিও জনসংহতি সমিতির দখলে চলে এসেছে। জেলার মধ্যে আর অবস্থান রয়েছে রাঙামাটি সদরের কুতুকছড়ি ও ঘিলাছড়ি, নানিয়ারচর উপজেলা, কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া বাজারের দক্ষিণ রাস্তা ছাড়া পুরো উপজেলা ও বাঘাইছড়ির একটা অংশ। একসময় নানিয়ারচর, বাঘাইছড়ি ও কাউখালী উপজেলায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে সংগঠনটি বেশ সক্রিয় থাকলেও বিভিন্ন কারণে তাও কমে এসেছে।

ইউপিডিএফের মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেছেন, পাহাড়ে এখন যে সংঘাত হচ্ছে তা আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত নয়; এটা আদর্শিক সংঘাত, এটা রাজনৈতিক সংঘাত। ইউপিডিএফ জাতির অধিকার নিয়ে আন্দোলন করলেও সন্তু লারমা এখন বিভিন্ন শক্তি নিয়ে সেই আন্দোলন বন্ধের জন্য ষড়যন্ত্র করছে। সন্তু লারমা বিভিন্ন সভায় ইউপিডিএফ নির্মূলের কথা বলে প্রকাশ্যেই পাহাড়ে বিভিন্ন হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমরা এলাকা দখলের রাজনীতি করি না। আমরা জাতিসত্তার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করছি। প্রশাসন ইউপিডিএফকে এখন আন্দোলনে মাঠে নামতে দিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, সন্তু লারমা অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে মূলত সরকারকে সাথে এখন ইউপিডিএফকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে। তাদের অসহযোগ আন্দোলনের হুমকি ইউপিডিএফের অস্তিত্ব ধ্বংসের হুমকি। জাতিসত্তার আন্দোলনে তাদের কোনো দরদ নেই বলেও দাবি করে তাদের সাংগঠনিক অবস্থার কোন পরিবর্তন কিংবা দুর্বলতার বিষয়টি দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ইউপিডিএফের যে অভিযোগ তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অসহযোগ আন্দোলনের আল্টিমেটামের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তারা আমাদের আন্দোলনকে অপব্যাখা করছে। আমাদের আন্দোলনের আল্টিমেটাম পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য। এর সাথে ইউপিডিএফ নির্মূলের কোনো সম্পর্ক নেই।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, রাঙামাটিতে বিভিন্ন সময় যে হত্যাকান্ড ঘটছে, তার জন্য এখনো বিশেষ কোনো অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না। আপাতত নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে রমজানকে সামনে রেখে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

২ comments

  1. Sokol ansolik rajnoti dol gulo ak 7te kaj korar jonno bini2 ahoban janassi.

  2. Sokol ansolik rajnoti dol gulo ak 7te kaj korar jonno bini2 ahoban janassi.

Leave a Reply

%d bloggers like this: