নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » পাহাড়ে নববর্ষ সবার

পাহাড়ে নববর্ষ সবার

নববর্ষ বলতেই সবাই বাংলা নববর্ষকেই বোঝেন। আড়ম্বর, অংশগ্রহণের ব্যাপকতা এবং সর্বজনীনতার কারণে অন্য সব জাতির নববর্ষকে ছাপিয়ে গেছে আমাদের বাংলা নববর্ষ।
এই ‘সর্বজনীন উৎসব’ হয়ে ওঠার জন্যে বাংলা নববর্ষের কিছু দিকও আছে। অন্য সব ক্যালেন্ডারে কোন ধর্ম প্রবর্তক, যাজক বা কোন মণীষির জন্মদিন, জন্মস্থান ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে যাওয়া (হিযরত) বা কোন ধর্মীয় ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে বছরের প্রথম দিন নির্ধারিত হয়। আর বাংলা ক্যালেন্ডার রচিত হয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষ এবং ফসল উৎপাদনের দিনক্ষণ নির্ভর হয়ে। আমাদের প্রকৃতি ও প্রতিবেশ যেন বাংলা সনের অন্যতম অনুষঙ্গ।
এর ফলে বাংলা পঞ্জিকা হয়ে ওঠে বিষুবীয় অঞ্চলের নানা ধর্ম, নানা বর্ণ ও নানা জীবিকার মানুষের পরম আরাধ্য। তাই বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে কৃষিনির্ভর বিষুবীয় অঞ্চলে চলে বর্ষবরণের ব্যাপক প্রস্তুতি। নতুন প্রত্যাশার আগামীতে আবাহনের জন্যে রক্তে নাচন ধরে। নতুন বছরের প্রথম দিন আসার মাস খানেক আগে থেকেই নববর্ষের গান অনুরণন তোলে জনে জনে।
নদী মেখল কৃষি সভ্যতার দেশগুলোর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশেই বিশাল আয়োজন নিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়। তবে আমাদের আজকের প্রসঙ্গ রমনা বটমূলের বর্ষবরণ উৎসব বা গ্রামীণ মেলা নয়, আমরা আমাদের দৃষ্টি নিবন্ধিত করতে চাই পাহাড়ের নববর্ষ উদ্যাপনের দিকে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বাদ রেখেই বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের চেয়ে অন্য ভাষাভাষি মানুষের সংখ্যাই বোধহয় বেশি। এ সংখ্যাতত্ত্ব ধারণা দিতে পারে— এখানে বোধহয় বাংলা নববর্ষ তত ঘটা করে আসে না। কিন্তু যাঁরা দেশের দক্ষিণ—পুর্বাঞ্চলের এই পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকেন বা এখানকার জীবনযাত্রার খোঁজ খবর রাখেন, তাঁরাই জানেন— অন্য সব অঞ্চলের চেয়ে কত বেশি বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রাণের ছোঁয়ায় এখানে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়। এতো বর্ণের মানুষ, এতো ধর্মের মানুষ, এতো পোষাকের মানুষ এবং এতো রঙের সমারোহ আর কোথায় পাওয়া যায়?
ঠিক বাংলা নববর্ষ না হলেও বছরের প্রায় এ সময়টিতেই হাজার বছর ধরে পাহাড়ের মানুষ নতুন বছরকে কেন্দ্র করে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। এখানকার ১১টি আদিবাসীর মধ্যে অন্যদের মধ্যে নানা নামে নববর্ষ উদ্যাপিত হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে বড় চাকমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রায় সমসাময়িক সময়েই উদযাপিত হয় নববর্ষ। এসব আদিবাসীর বাংলা নববষর্ষ নামটিও গ্রামীণ বাঙালি সমাজের কাছাকাছি উচ্চারণের। যেমন আমাদের বাঙালি লোকজ উচ্চারণের ‘বিউ’ চাকমা সমাজে বিজু, ত্রিপুরা সমাজে বৈসু এবং তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বিহু/বিষু নামে পরিচিত। এটিকে আমি বাঙালিদের অন্ধ অনুকরণজনিত বলতে চাই না। আমার ধারণা, প্রায় কাছাকাছি জীবন যাপন এবং সংস্কৃতির কারণে নামটি যেন কাছাকাছি উচ্চারণেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।
মারমা নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা অন্য সব পর্ব ছাপিয়ে ‘সাংগ্রাইং’ নামেই সমধিক পরিচিতি পেয়েছে। বুদ্ধাব্ধ বা মঘী ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে সাংগ্রাইং উৎসব ক্রম উদযাপিত হলেও এর সাথে বাংলা ক্যালেন্ডারের বেশ খানিকটা মিল রয়েছে।
যেমন বাঙালি সনাতন সমাজে চৈত্র সংক্রান্তির (এ বছর ১৩ এপ্রিল) আদলে মারমা সমাজে ১৪ এপ্রিল পুরাতন বছরকে বিদায় জানানোর রূপক প্রকাশ হিসেবে বাড়ি—ঘর পরিস্কার করা, বুদ্ধ মূর্তি স্নান ও বয়স্কদের পায়ে পানি ঢেলে পুরাতন বছরের জীর্ণতাকে ধুয়ে বিদায় দেয়া, ১৫ এপ্রিল লগ্ন বা সময় ক্ষণ গণনার হিসেবে পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমন সন্ধিক্ষণ এবং ১৬ এপ্রিল আসবে নতুন বছরের প্রথম দিন। অনেকেই মনে করেন, মায়ানমারের ক্যালেন্ডার অনুসরণ করার কারণেই বোধ হয় দিন—তারিখে পরিবর্তন ঘটতে পারে। কিন্তু মারমা সমাজপতিরা বলেছেন, বিষুব রেখায় নতুন বছরের আগমনের গাণিতিক হিসেবকেই তাঁরা বর্ষক্ষণ গণনা করে আসছেন। এখানে ক্যালেন্ডার কোন কারণ (ফ্যাক্টর) নয়।
তবে বান্দরবানের বাইরে বোমাং সার্কেলভুক্ত চন্দ্রঘোণা এবং রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সমাজে বাংলা ক্যালেন্ডারের সাথে মিল রেখেই নববর্ষ উদযাপিত হবার রেয়াজ রয়েছে।
অন্যদিকে চাকমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা আদিবাসীর নববর্ষ উদযাপন ক্রমের সাথে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অমিল না থাকায় বাংলা নববর্ষ, ত্রিপুরাদের বৈসুক, চাকমাদের বিজু এবং তঞ্চ্যঙ্গাদের বিহু’র ব্যঞ্জনা পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে রাঙিয়ে দেয়।
এসব বর্ণনার বাইরে সর্বজনীন উৎসবের আর কোন ব্যাখ্যা আছে কিনা জানি না। আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রাণচাঞ্চল্যের দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় পাহাড়ি—বাঙালিদের মধ্যে নববর্ষ উদযাপনের পর্বগুলোকে খুব একটা আলাদা করা যায় না। নববর্ষকে উপলক্ষ্য করে যেন ‘সকলেই সবার’ হয়ে যান।
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি এবং রাঙ্গামাটিতে সব আদিবাসীর বসবাস নেই। পাংখোয়া ছাড়া সংখ্যায় কম হলেও অন্য ১০টি আদিবাসীর সবারই বসতি রয়েছে বান্দরবান জেলায়। এ কারণে এই জেলায় নববর্ষ আসে বহুমাত্রিকতায়।
এক সময় ভাবা হতো বাঙালির বাইরে চাকমা—তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা এবং ত্রিপুরা সমাজেই বর্ষবরণ উৎসব উদযাপিত হয়। কিন্তু বর্তমানে এ ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এর মধ্যে খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী বম এবং লুসাই ছাড়া অন্য সব আদিবাসীর মধ্যে নববর্ষ উদ্যাপনের প্রচলন রয়েছে। নববর্ষকে সামনে রেখে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃ—গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট প্রতিবছর বিভিন্ন আদিবাসীর বর্ষবরণ উৎসব নিয়ে সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করে। এসব কর্মশালায় উঠে আসে নতুন নতুন তথ্য।
এর আগে ম্রো, চাক ও খেয়াং আদিবাসীর বর্ষবরণ নিয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে তাদের মধ্যে নববর্ষ উযাপনের নানা তথ্য তুলে ধরা হয়। এ বছর কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে খুমি সমাজে নববর্ষ উদযাপন বিষয়ে।
শুরুতে মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং ত্রিপুরা সমাজে নববর্ষ আয়োজনের উপর ধারাবাহিক কর্মশালাগুলো থেকেও বেরিয়ে এসেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
ত্রিপুরা আদিবাসী সমাজে নববর্ষ উদযাপন পর্বে উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, খ্রীস্টানরা সাধারণতঃ বড় দিন (যীশু খ্রীস্টের জন্ম দিন), ‘গুড ফ্রাই ডে’ ও ‘ইস্টার সান ডে’ ছাড়া অন্য কোন উৎসব উদযাপন করেন না। খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহনের কারণে ত্রিপুরাদের একটি বড় অংশ নববর্ষ উদযাপন থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরো ব্যাপক হয়ে পড়ায় ত্রিপুরা তরুণরা ক্রমশঃ আদি সংস্কৃতি থেকে বিমুখ হয়ে পড়ছে। কর্মশালার শেষ দিকে প্রবন্ধকার এবং আলোচকদের সবাই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ধর্ম যাই হোক, সংস্কৃতি যেন থাকে অকৃত্রিম। এ ধরনের আয়োজনের ফলে গত বছর ত্রিপুরাদের মধ্যে নববর্ষ উদ্যাপন কিছুটা বেড়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বড় (সংখ্যাগত দিক থেকে) তিনটি আদিবাসীর মধ্যে ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমা আদিবাসীর সাংগ্রাইং এবং চাকমা—তঞ্চঙ্গ্যা আদিবাসীর বিজু/বিহু/বিষু শব্দের আদ্যক্ষর নিয়ে নববর্ষ উদযাপনের আয়োজনকে ‘বৈসাবি’ নামকরণ করে উৎসব আয়োজিত হচ্ছে। এটি পাহাড়ের নববর্ষ উৎসবকে প্রাণবন্ত করলেও এই নামকরণের কারণে মনে হতে পারে— পার্বত্য চট্টগ্রামে আর কোন আদিবাসী নববর্ষ উদ্যাপন করে না।
অথচ বিচ্ছিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে সম্পূর্ণ খ্রীস্ট ধর্ম অবলম্বনকারী বম, পাংখো এবং লুসাই ছাড়া চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমি, চাক এবং খেয়াংসহ অবশিষ্ট ৮টি আদিবাসী কোন না কোনভাবে নববর্ষ উদ্যাপন করে থাকে।
তাদের নববর্ষ উদ্যাপন পর্বের নামেও রয়েছে চমৎকার মিল। ‘সংক্রান্তি’র আদলে মারমা সমাজ ‘সাংগ্রাইং’ এবং ম্রো, খুমি, চাক এবং খেয়াং, সমাজে ‘চাংক্রাই’ বা ‘চাংক্রান’ ধরণের উচ্চারণে নববর্ষ উদ্যাপিত হতে দেখা যায়।
আয়োজনের দিক থেকেও বিভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। বাঙালিরা নববর্ষকে সামনে রেখে লোকজ খেলা, পিঠা—পুলি এবং মুড়ি মুড়কির পাশাপাশি আয়োজন করে গ্রামীণ মেলা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যাদের আয়োজনেও এসব অনুষঙ্গ থাকছে। অন্যদিকে বাহুল্য না থাকলেও ম্রো, খুমি, চাক ও খেয়াং সমাজে নববর্ষকে উপলক্ষ্য করে লাঠি খেলা, ডাংগুলি খেলা, প্রবীণ পূজো, মেলা এবং পিঠা—পায়েস রান্নার প্রচলন রয়েছে।
আরো গবেষণা এবং তথ্য—উপাত্ত সংগ্রহ করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন সংস্কৃতির অনেক অমূল্য রতন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply