নীড় পাতা » ফিচার » অন্য আলো » পাহাড়ে জুমচাষ নিয়ে বিতর্ক

পাহাড়ে জুমচাষ নিয়ে বিতর্ক

ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে জড়িত ‘জুমচাষ’। সাধারণ পাহাড়িরা জুমচাষকে পরিবেশবান্ধব ও ঐতিহ্যবাহী
কৃষিব্যবস্থা হিসেবে মনে করেন। অন্যদিকে, জনসংখ্যা বাড়ার সাথে চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়ায় জুমচাষের পরিধিও কমছে। জুমপাহাড়ে আগুন দেওয়ার কারণে প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে বলে জুমচাষ বন্ধের পক্ষে বহুদিন ধরে কথা বলছেন কৃষিসংশ্লিষ্টরা। আর ইদানীং জুমচাষে ‘নিষেধাজ্ঞা’ দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)!

অবশ্য আদিবাসী গবেষক, কৃষিবিজ্ঞানী ও পরিবেশকর্মীদের মতে, জুমচাষ পরিবেশের জন্য কিছুটা ক্ষতিকর হলেও বিকল্প ব্যবস্থা না করে এখনই জুমচাষ বন্ধ করে দেওয়ার সময় আসেনি। এতে প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। চাষের আচরণগত প্রক্রিয়া ঠিক রাখলে জুমচাষই পরিবেশবান্ধব বলে মনে করেন গবেষকরা। তাঁরা জানিয়েছেন, দুর্গম এলাকার জুমিয়াদের জীবন বাঁচানোর জন্যে জুমচাষ ছাড়া বিকল্প আজো গড়ে ওঠেনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জুমচাষ পরিবেশবিরুদ্ধ বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও এখনই জুমের বিকল্প ভাববার সুযোগ নেই। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, জুমচাষে আগুন দিতে হয় বলে এটি পরিবেশের জন্যে ক্ষতিকর হলেও দরিদ্র জুমিয়াদের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই এটি বন্ধ করা উচিত হবে না। প্রয়োজনে সরকারিভাবে তাঁদের জন্য বিকল্প আয়ের পথ ঠিক করেই জুম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক জুমিয়ারা জুমচাষ করতে বাধার মুখে পড়ছেন। বিশেষত দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের জুম করতে দিচ্ছে না কতিপয় লোক। তাঁরা নিজেদেরকে ইউপিডিএফের সদস্য পরিচয় দেন বলে অভিযোগ করেন জুমিয়ারা। জুম বন্ধের জন্যে অস্ত্রের ভয় দেখানো হয়। এমনকি মারধরও করা হয়। বহু জুমিয়ার অভিযোগ, গত ৩/৪ বছর ধরে রাঙামাটির সাজেকে ত্রিপুরা অধ্যুষিত এলাকায় জুমচাষের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইউপিডিএফ। অতি সম্প্রতি খাগড়াছড়ি জেলা সদরের নুনছড়ির দেবতাপুকুর এলাকায় জুমে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফের সদস্যদের সাথে এলাকাবাসীর বিরোধ দেখা দেয়। এলাকার জুমচাষি নিরেন্দ্র ত্রিপুরা জানান, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জুম কাটতে গেলে ইউপিডিএফ সদস্যরা ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং এলাকার পুরুষদের ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে দাঁড় করান। এক পর্যায়ে ত্রিপুরা নারীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তাঁরা দা-ছোরা, লাঠিসোঁটা নিয়ে জুমে বাধা সৃষ্টিকারীদের প্রতিরোধ করলে অস্ত্রধারীরা পালিয়ে যায়।

বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নলেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও বাংলাদেশ ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরামের সভাপতি দেবাশীষ ত্রিপুরা অভিযোগ করেন, ইউপিডিএফ পরিচয়ে বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় জুমচাষে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং সশস্ত্র আক্রমণসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এক বিবৃতিতে তাঁরা জোরপূর্বক জুমচাষ বন্ধ করে দেওয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কার্বারি (পাড়াপ্রধান) বলেন, ‘প্রকৃত অর্থে পাহাড়ি একটি সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের জঙ্গলে লুকোনোর জায়গার জন্যেই তাঁরা জুমচাষ করতে বাধা দিচ্ছে। যদিও চাঁদা দিলেই তাঁদের (ইউপিডিএফ) অনুসারীরা জুমচাষ করতে পারছেন। ’ এদিকে, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ড. সুধীন কুমার চাকমা বলেন, ‘জুমচাষে পরিবেশ ক্ষতি নয়, পরিবেশ সুরক্ষা হয়। এই চাষে মাটি খনন করার পরিবর্তে ছোট গর্ত করেই বীজ বপন করা হয় বলে মাটির ক্ষয় হয় না বললেই চলে।’ এনজিও জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘জুমচাষের জন্য বড় গাছপালা কাটা হয় না। কারণ টিয়া পাখিসহ পরিবেশ বন্ধু পাখিরাই এতে বসে ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এছাড়া পাহাড় ধারের ছড়া হতে অন্তত দুই বাঁশ পর্যন্ত ঝোপঝাড় রেখেই জুম করা হয়। তাই জুমচাষকে পরিবেশের জন্যে অতটা ক্ষতিকর বলা যায় না।’ জুমচাষ গবেষক গিতিকা ত্রিপুরা জানান, জনবসতি বৃদ্ধির সাথে সাথে জমি কমে যাওয়ায় জুমের পরিধি কমেছে। জুমিয়াদের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে আধুনিক জুমচাষ পদ্ধতি চালুর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

কৃষিবিজ্ঞানী ড. মহব্বত উল্লাহ বলেন, ‘আধুনিক চাষবাষ পদ্ধতি কিংবা বিকল্প আয়ের উৎস না দেওয়া পর্যন্ত জোর করে জুমচাষ বন্ধ করার যৌক্তিকতা নেই। জুমনির্ভর পাহাড়িরা জুম করেই অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহ করেন।’ পরিবেশ ক্ষতির কথা বলে জুম বন্ধ করে দিলে জুমের ওপর নির্ভরশীল জুমিয়ারা না খেয়ে মরবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরেক কৃষিবিজ্ঞানী ড. শওকত আলী মল্লিক জানান, জুমচাষ লাভজনক না হলেও অনেক পাহাড়ির ৪/৫ মাসের খাদ্যের জোগান হয় ওই চাষে। জুমের বিকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সামর্থ্য না থাকায় এই মুহূর্তে জুমচাষ বন্ধ করার সময় আসেনি। বরং আধুনিক পদ্ধতিতে পরিবেশবান্ধবভাবেও টেকসই জুমচাষের ওপর গবেষণা চলছে। খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ‘জুমচাষ পরিবেশসম্মত নয়; এখন পর্যন্ত এমন ধরনের বিচার করা যাবে না। দুনিয়ার পাহাড়ি সব এলাকায় জুমচাষ প্রচলিত। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এই চাষপদ্ধতি গায়ের জোরে বন্ধ করা অগণতান্ত্রিক এবং প্রান্তিক মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার শামিল।’ তিনিও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে জুম বন্ধের চিন্তা করার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) দর্শনে, গঠনতন্ত্রে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি জুমচাষ, তামাকচাষ, রাবার বা সেগুনের মতো মনোকালচারকে নিরুৎসাহিত করে থাকে বলেও জানা যায়। ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র নিরন চাকমা দলের সাংগঠনিক কর্মসূচির উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারেও প্রস্তুত। বিশেষত জুমচাষে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ায় দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রাচীন এই চাষপদ্ধতির বদলে বিকল্প চাষ প্রক্রিয়া অনুসরণের অনুরোধ করছি। তবে জোর করে জুমচাষ বন্ধের অভিযোগ সঠিক নয়। বরং জুমে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আর চাঁদাবাজির অভিযোগ ডাহা মিথ্যা। ’

(দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত রিপোর্ট)

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক কেন এতটা জোরালো?

বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলের বিভিন্ন জায়গায় যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করেন তারা আদিবাসী কিনা …

Leave a Reply