নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » পাহাড়ে আবার প্রাণঘাতি ম্যালেরিয়ার হাতছানি !

পাহাড়ে আবার প্রাণঘাতি ম্যালেরিয়ার হাতছানি !

malaria-pic-011তিন পার্বত্য জেলায় হঠাৎ করেই ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়ে গেছে। চলতি বছরের সাত মাসেই তিন পার্বত্য জেলায় আশংকাজনক হারে বেড়েছে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা। সাম্প্রতিক সময়ে তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৮৪৮জন। প্রতিবেশি দুই পাহাড়ী জেলা বান্দরবানে ৬ হাজার ৪২৬জন এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ৪৮০ জন,যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।
এ বছর রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগির মধ্যে কেউ মারা না গেলেও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ১২জন এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ০৯জন রোগি মারা গেছে বলে পরিসংখ্যানে জানাচ্ছে খোদ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।

বিগত ২০০৮ সালে এই তিন পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রন র্কমসূচী চালু হওয়ার পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রনে আশানুরূপ সফলতা আসলেও চলতি ২০১৪ সালের মে মাস হতে জুলাই মাস পর্যন্ত ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধির মাত্রা এতটাই বেশি যে বর্তমানে এটিকে মহামারী হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হঠাৎ করে এই রোগের প্রাদুর্ভাব মহামারী আকারে পৌঁছানোর কারন বের করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একাধিক টিম কাজ করছে,তোড়জোড় শুরু হয়েছে পুরো স্বাস্থ্য বিভাগেই।

২০১৪ সালের প্রথম ৭ মাসে ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্তের বিগত ৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এই পর্যন্ত রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় কোন মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও অপ্রত্যাশিত ভাবে এই রোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে। জেলার সীমান্তবর্তী ৪ টি উপজেলাকে ম্যালেরিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ন এলাকা ঘোষনা করে এখানে ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রনে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারনে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনবোধে সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে সম্পৃক্ত করে গৃহিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। malaria-pic-014

স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত রাঙামাটি পার্বত্য জলায় ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৭৮৪৮ জন। এর মধ্যে জেলার সীমান্তবর্তী ৪ টি উপজেলা বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি ও জুড়াছড়িতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৪২৬ জন, যা মোট আক্রান্তের হারের শতকরা প্রায় ৮২ ভাগ। আক্রান্তের এই হার গত বছরের তুলনায় দ্বিগুনের চেয়েও বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে রাঙামাটির ৪টি ম্যালেরিয়া প্রবণ উপজেলায় স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিস্ট সকলকে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহন করে অতি দ্রুততার সাথে এই রোগের প্রার্দুভাব কমানোর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয় এবং অগ্রগতির বিষয়ে প্রতিমূহুর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবহিত করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়।malaria-pic-012

এদিকে রাঙামাটি সিভিল সার্জন ডা. মুস্তাফিজুর রহমান জানান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলার যে সমস্ত উপজেলায় ম্যালেরিয়া রোগের প্রার্দুভাব বৃদ্ধি পেয়েছে সে সব উপজেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি ব্র্যাক এবং হিল ফ্লাওয়ার যৌথ ভাবে কাজ করছে এবং বিভিন্ন জায়গায় একাধিক মেডিকেল টিম প্রেরন করে প্রত্যন্ত এলাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে জানা যায়,গত ৭ মাসে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ১২জন রোগি ম্যালেরিয়ায় আক্রন্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রকৃত পক্ষে গত জুলাই মাসে কেবল বান্দরবানের থানছি, লামা ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকাসমুহেই ম্যালেরিয়ায় মারা গেছেন অন্তত ২০ জন। এ তথ্য জানান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। malaria-pic-15

পাহাড়ি এলকায় হঠাৎ করে ম্যালেরিয়া বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ । চিকিৎসক সংকট, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকা এবং বিতরনকৃত কীটনাশকযুক্ত মশারিগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালে তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের ম্যালেরিয়াপ্রবণ ১৩ জেলায় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে মহাপ্রকল্প গ্রহণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ব্র্যাকসহ ২৩টি বেসরকারি সংস্থা একযোগে কাজ করছে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ মহাপ্রকল্পে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে। দফায় দফায় মেয়াদবৃদ্ধি পেয়ে এ ম্যালেরিয়া মহাপ্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদকাল শেষ হওয়ার কথা আগামী ২০১৫ সালে। ব্যয়-বরাদ্ধ রয়েছে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ। কিন্তু এ মহাপ্রকল্পে নেই কোন অবকাঠামো নির্মাণ, এমনকি হয়নি ম্যালেরিয়া বিষয়ক কোন গবেষণা কেন্দ্র। ২০০৭ সালের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘রোল ব্যাক ম্যালেরিয়া’ নামক আরও একটি ব্যর্থ মহাপ্রকল্প গ্রহণ করে ছিল,ওই সময় ব্যয় হয়েছিল কোটি কোটি টাকা। কিন্ত সেই প্রকল্প কার্যত ভেস্তে যায়। malaria-015

এদিকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়া রোগের উপর প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০০৭ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৭শ ৬২ জন। মারা যায় হয় ১শ ১ জন। ২০০৮ সালে এসে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৬শ ৭৩ জনে। তবে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কমে আসে ৫৩ জনে। ২০০৯ সালে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৮শ ১১ জনে। এই বছরে মারা যায় মাত্র ১২ জন। ২০১০ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৩শ ৪৮ জন। মারা যায় ১৩ জন। ২০১১ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৯শ ৬৬ জন। মারা যায় ১৫ জন রোগী। ২০১২ সালে রোগীর সংখ্যা কমে দাড়াঁয় অর্ধেকেরও কম; অর্থাৎ এই বছর রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯শ ৯৭ জনের বিপরীতে মারা যায় ৬ জন। ২০১৩ সালে রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৯৬ জন। মারা যায় ৭ জন। আর চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাড়াঁয় ৪শ ৮০ জনে। আর মারা যায় মাত্র ২ জন। সেই হিসেবে পরিসংখ্যান বলছে যেখানে ২০০৭ সালে ম্যালেরিয়া রোগে মৃত্যু ছিল ১শ ১ জনে ২০১৪ সালের মে মাস পর্যন্ত এই সংখ্যা কমে দাড়াঁয় মাত্র দুই জনে।

জুন মাসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১শ ৭৪ জনে। জুলাই মাসে এই সংখ্যা দাড়াঁয় ২ হাজার ১শ ২০ জনে। তবে চলতি মাসে এই সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। চলতি বছর ম্যালেরিয়ায় ৯ জন মারা গেছে বলেও পরিসংখ্যানে জানা যায়।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে পাঁচটি উপজেলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে মানিকছড়ি, পানছড়ি, লক্ষিছড়ি,রামগড় ও মাটিরাঙা উপজেলা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ম্যালেরিয়া রোগের মহামারী রুপে প্রার্দুভাবের সম্ভাব্য কারন হিসাবে নির্ধারিত সময়ের আগে বৃষ্টি, ম্যালেরিয়ার জীবানুবাহী মশার প্রজনন বৃদ্ধি, ম্যালেরিয়ার মশা প্রতিরোধক মশারীর কার্যকরিতা হ্রাস এবং ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রনে থাকায় কর্মক্ষেত্রে কিছুটা শৈতিলতার কারনকে দায়ী করা হয়। পাশাপাশি মশারীর যথার্থ ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টিও চিহ্নিত করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ( রোগ নিয়ন্ত্রন) প্রফেসর ডাঃ বেনজির আহমেদ জানান, হঠাৎ করে তিন পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্তের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ।

তিনি জানান, পার্বত্য জেলাগুলোতে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিতরণের জন্যে সাড়ে ৭ লাখ কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হবে। সেই সাথে পর্যাপ্ত পরিমান ম্যালেরিয়ার ওষুধপত্রও সরবরাহ করা হবে। তিনি জানান, ম্যালেরিয়া রোধে এবং এরোগে আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্যে তিন জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলায় ২ লাখ ৫৭ হাজারটি কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ৫ লাখ কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হবে পাহাড়ি জেলাগুলোতে।

প্রফেসর ডাঃ বেনজির আহমেদ আরো জানান, গ্লোবাল ফান্ডের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রন কর্মসূচীর জন্য সাড়ে ৭ লক্ষ মশারী বিতরন করা হবে। এই ক্ষেত্রে তিন পার্বত্য জেলার ম্যালেরিয়াপ্রবন উপজেলাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।

এ বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জন ডা: মং তে জ এর সাথে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি তাঁর কাছে এ মুহুর্তে কোনো তথ্য জানা নেই বলে লাইন কেটে দেন।

তবে রাঙামাটি সিভিল সার্জন ডা. মুস্তাফিজুর রহমান এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জন ডা. নারায়ন চন্দ্র দাশ জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্যাঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মেডিকেল টিমের সংখ্যা ও এক্টিভিটিস বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় মাইকিং করা হচ্ছে। যে স্থানেই মেডিকেল টিম চিকিৎসা সেবা দিতে যাচ্ছে সেখানেই সেনাবাহিনী,বিজিবি,পুলিশসহ সকল বাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে বলেও জানান তিনি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কাপ্তাইয়ে করোনা সংক্রমণ কমছে

প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং থানা পুলিশের তৎপরতায় রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে করোনা সংক্রমন হার কমছে। কাপ্তাই উপজেলা …

Leave a Reply