নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » পাহাড়ে আধিপত্যের লড়াই

পাহাড়ে আধিপত্যের লড়াই

4_n1পার্বত্য শান্তিচুক্তি সাক্ষরের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই যুগের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান হলেও চুক্তির পরপরই পাহাড়ে গড়ে উঠে আরেক সংকট-ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত। পার্বত্য চুক্তির বিরোধীতা করেই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার নেতৃত্বে জন্ম নেয় পাহাড়ীদের আরেক নতুন রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)। শুরু থেকেই পার্বত্য চুক্তি সাক্ষরকারি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে সংগঠনটি। দুই সংগঠনের বিরোধে গত দেড়শতকে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় কয়েকশত মানুষ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে জনসংহতি সমিতির ভেঙ্গে জন্ম নেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) নামের নতুন আরেক সংগঠন। এই তিন সংগঠনের বিরোধ,আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত ঝড়ছে রক্ত,ঘটছে অপহরণ ঘটনা,আদায় হচ্ছে কোটি কোটি টাকার চাঁদা।

কেনো এই বিরোধ

মূলত পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতা করেই জন্ম নেয় পাহাড়ীদের দ্বিতীয় রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ। তবে পরে আর চুক্তির তেমন বিরোধীতা না করে চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি র্পূণ স্বায়ত্ত্বাশাসনের দাবিই জানাতে থাকে সংগঠনটি। ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আনুষ্ঠানিক এক কনভেনশনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে এই সংগঠনটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে বিভিন্ন সময় নিয়মিতভাবে কর্মসূচী পালন করার পাশাপাশি বিরোধে জড়িয়ে পড়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর সাথে। জেএসএস-ইউপিডিএফ এর বিরোধ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে,যতটা না আদর্শিক কারণে, তারচেয়ে বেশি এলাকার দখলদারিত্ব,দখল নিয়ন্ত্রনে রাখা,হত্যার প্রতিশোধ,গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীকে হত্যা করে প্রতিপক্ষকে দূর্বল করা,চাঁদাবাজির পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রন,বিশাল সশস্ত্র গ্রুপের কর্মীদের ভরনপোষনের ব্যয়ভার আদায়,প্রতিপক্ষের কর্মসূচীতে বাধা প্রদান-পাল্টা প্রতিরোধসহ নানা কারণেই তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধের কারণ। যদিও জনসংহতি সমিতির নেতাকর্মীরা ইউপিডিএফকে কোন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য-এটি পেশাদার খুনি ও চাঁদাবাজদের সংগঠন। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা বিভিন্ন সময় সরকারের কাছে ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে ইউপিডিএফও পাল্টা জনসংহতি সমিতিকে সরকারের সুবিধাভোগী ও জুম্ম জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারি বলে দাবি করে আসছে।

বিরোধে নতুন ‘পালক’ জনসংহতি এমএনলারমা

জেএসএস-ইউপিডিএফ এর বিরোধের মধ্যেই নতুন করে জেএসএস ভেঙ্গে জন্ম নেয় আরেকটি জেএসএস। সংগঠনের নামের সাথে প্রতিষ্ঠাতা এমএনলারমা’র নাম সংয্ক্তু করে সাবেক জেএসএস নেতা রূপায়ন দেওয়ান,সুধাসিদ্ধু খীসা,তাতিন্দ্রলাল চাকমা,শক্তিমান চাকমাদের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে এই সংগঠন। সন্তু লারমাকে বিপদগামী ও আদর্শচ্যুত নেতা দাবি করে তারা নিজেদের মূল জনসংহতি হিসেবে দাবি করছে। তবে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি নেতাকর্মীরা,এদেরকে সংস্কারপন্থী ও সুবিধাভোগী হিসেবে দেখে থাকেন। ২০১০ সালের ৯ এপ্রিল দীঘিনালার বরাদম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কংগ্রেস করে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সর্বশেষ গত ১০-১১ জুলাই দুইদিনব্যাপী কংগ্রেস অনুষ্টিত হয় খাগড়াছড়ি শহরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে। এতে সভাপতি হিসেবে সুধাসিন্ধু খীসা ও সম্পাদক হিসেবে তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তিন সংগঠনের আন্তঃসম্পর্ক

জনসংহতি সমিতির সাথে ইউপিডিএফ ও জনসংহতি (এমএনলারমা)’র সম্পর্ক একেবারেই সাপেনেউলে। একপক্ষ আরেকপক্ষকে সহ্যই করতে পারেন। কিন্তু ইউপিডিএফ ও জনসংহতি (এমএনলারমা)’র সম্পর্ক আবার বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ। জনসংহতির ধাওয়া খেয়ে রাঙামাটি শহর ছাড়তে বাধ্য হওয়া এমএনলারমা’র নেতাকর্মীরা সবাই আশ্রয়ও নিয়েছেন ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত ও তাদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত খাগড়াছড়িতে। সেখানে বসেই এখন মূলতঃ কার্যক্রম চলছে তাদের। পাশাপাশি খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির কয়েকটি উপজেলায় ইউপিডিএফ ও এমএনলারমার সহঅবস্থানও আছে। তারা একে অপরকে নানাভাবে সহযোগিতা করে বলেও প্রবাদ আছে। জনসংহতির হামলায় নিজেদের অন্ততঃ ত্রিশজন কর্মী গত চারবছরে নিহত হয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির। আবার পাল্টা হামলায় জনসংহতির কয়েকজনকর্মীও নিহত হয়েছে দাবি আছে। সন্তু লারমা সমর্থকদের দাবি,ইউপিডিএফ এর চক্রান্তে পা দিয়ে জুম্ম জনতার আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও দূর্বল করার জন্য তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কারপন্থীদের জন্ম। যদিও এমএনলারমা’র কর্মীরা তা অস্বীকার করেন।

সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অবস্থান

তিন পার্বত্য জেলায় বর্তমানে ২৫ টি উপজেলা। এর মধ্যে রাঙামাটির দশটি উপজেলার মধ্যে বাঘাইছড়ি এবং লংগদু উপজেলায় তিনটি সংগঠনেরই কার্যক্রম আছে। নানিয়ারচর উপজেলা ইউপিডিএফ এর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এছাড়া কাউখালিতে ইউপিডিএফ শক্তিশালী। রাঙামাটি শহরে বরাবরই শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান জনসংহতি সমিতির। শহরে অন্য দুই সংগঠনের কার্যক্রম বা উপস্থিতিও নেই। রাঙামাটির কাপ্তাই,বরকল,জুড়াছড়ি,রাজস্থলী,বিলাইছড়িতে রয়েছে তাদের শক্তিশালী অবস্থান। জরুরী অবস্থার সময় জুড়াছড়ি,রাজস্থলী ও বিলাইছড়ি দখলে নেয় ইউপিডিএফ। কিন্তু দুইবছরের মাথায় সেই দখল পুনঃনিয়ন্ত্রন নেয় জনসংহতি। তবে নিয়ন্ত্রনে নিলেও ওইসব এলাকায় এখনো গোপনে ইউপিডিএফ এর কার্যক্রম আছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসি।
খাগড়াছড়ির প্রায় পুরো জেলাতেই ইউপিডিএফ এর শক্ত নিয়ন্ত্রন। সব উপজেলাতেই রয়েছে তাদের বিশাল কর্মী সমর্থক বাহিনী। তবে দীঘিনালা,মানিকছড়ি,রামগড়,গুইমরা ও লক্ষীছড়িতে মাঝে মাঝেই আক্রমন চালায় জনসংহতি ক্যাডাররা,এইসব উপজেলাতে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমও আছে। পুরো জেলায় ইউপিডিএফ এর নিয়ন্ত্রনে থাকলেও প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই কমবেশি সাংগঠনিক কর্মকান্ড আছে জনসংহতির। আবার খাগড়াছড়ির মহালছড়ি,দীঘিনালা উপজেলায় শক্ত অবসস্থানসহ সবগুলো উপজেলাতেই জেএসএস(এমএনলারমা)র কার্যক্রম আছে।
বান্দরবান জেলা সদরের বালাঘাটায় ঘাঁটি গেড়ে সদরের কিছু অংশ,রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালায় ইউপিডিএফ। এছাড়া পুরো জেলায় নিয়ন্ত্রন মোটামুটি জনসংহতি সমিতির হাতেই। এই জেলায় এমএনলারমা গ্রুপের তেমন কোন কার্যক্রম নেই।

তাদের রাজনৈতিক অবস্থান

দীর্ঘ দুইযুগ পাহাড়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে প্রায় দুইহাজার সশস্ত্র গেরিলাসহ অস্ত্রসমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে সংগঠনটি। বর্তমানে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন,ভূমি সমস্যার সমাধান,চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের পূর্ণ ক্ষমতায়ন আর নানান সামাজিক ইস্যুতে আন্দোলন করছে সংগঠনটি। অন্যদিকে ইউপিডিএফ এর প্রধান দাবি পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসন। তাদের মতে পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসন ছাড়া পার্বত্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আবার জনসংহতি সমিতি( এমএনলারমা) বরাবরই শান্তিচুক্তির সমর্থক। তারা পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই পাহাড়ের সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন। আদর্শিকভাবে দুই জনসংহতি সমিতির অবস্থান একই বিন্দুতে হলেও তাদের মধ্যে সখ্য বা সদ্ভাব একেবারেই নেই বললেই চলে। আবার আদর্শিকভাবে বিপরীত মেরুতে অবস্থান সত্ত্বেও ইউপিডিএফ এর সাথে জেএসএস(এমএনলারমা)র সম্পর্ক ও নৈকট্য চোখে পড়ার মতই।

পাহাড়ের সশস্ত্র ভূগোল

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য,প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও পাহাড়ীদের এই তিনটি রাজনৈতিক দলই সশস্ত্র কর্মী পোষে। তাদের রয়েছে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী,যারা নিজ নিজ দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই তিনদলের মধ্যে সশস্ত্র ক্যাডার ও অস্ত্রের দিক দিয়ে স্পষ্টতঃই এগিয়ে আছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি। পাহাড়ের প্রাচীন এই সংগঠনের প্রশিক্ষিত সাবেক গেরিলাদের প্রায় সবাই সম্পৃক্ত থাকা,আর্থিক সক্ষমতা,বিদেশী কানেকশন এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক ও সামাজিক কাঠামোর কারণে সশস্ত্র লড়াইয়ে তারাই পাইওনিয়ার। তাদের সশস্ত্র ক্যাডাররা জলপাইরঙের একরঙা পোষাক ব্যবহার করে থাকে। বিভিন্ন সময় আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর হাতে আটক হওয়া তাদের ক্যাডারদের এই পোষাক পরিহিতই পাওয়া গেছে। দুইযুগের গেরিলা লড়াইয়েও তারা এই পোষাক ব্যবহার করতেন। অস্ত্রের সক্ষমতায় দ্বিতীয় অবসস্থানে ইউপিডিএফ। মূলত তরুণ ছাত্র ও যুবকদের এই সংগঠনটি সশস্ত্রভাবে বেশ উন্নত অস্ত্র ও বিপুল গোলাবারুদ মজুদ থাকা সত্ত্বেও জনসংহতির সাথে অনেকক্ষেত্রেই পেরে উঠেনা মূলতঃ অভিজ্ঞতার অভাবে। নানা উপায়ে তারা অস্ত্র ও গোলাবারুদ ঠিকই সংগ্রহ করে নেয় কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের অভাব,অনভিজ্ঞতা আর সশস্ত্র জীবনের প্রতি তরুনদের অনাগ্রহের কারণে তারা খুব একটা যুৎসই করতে পারছেনা। তবে ইউপিডিএফ সূত্রগুলোর দাবি,অভিজ্ঞতা কম হলেও দায়িত্বশীলতা ও কমিটমেন্ট এর কারণে তারা জনসংহতির চেয়েও এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে অস্ত্রের লড়াইয়ে সবচে পিছিয়ে জনসংহতি (এমএনলারমা)। তাদের সাথেও বেশ কিছু সাবেক গেরিলা সম্পৃক্ত থাকলেও অস্ত্র ও অর্থের দিকে পিছিয়ে থাকায় খুব একটা সুবিধা করতে পারছেনা তারা। সম্প্রতি অস্ত্রের একটি চালান আনতে গিয়ে ভারতের মিজোরামে গ্রেফতার হন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতা অংশুমান চাকমা,হাতছাড়া হয় অস্ত্রের চালানটিও। ফলে গত দুইবছরে বিভিন্ন আক্রমে জনসংহতির হাতে তাদের সুদীর্ঘ চাকমাসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেতাকর্মী নিহত হলেও পাল্টা কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি তারা। তাই সশস্ত্র লড়াইয়ে একেবারেই ইউপিডিএফ এর মুখাপেক্ষী এই সংগঠনটি।

অতঃপর লাশের উৎসব

২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের মাত্র ৪৭ দিন পর ১৯৯৮ সালের ১৮ জানুয়ারি রাঙামাটির জেলার নানিয়ারচর উপজেলাধীন কুতুকছড়ি এলাকায় চুক্তিবিরোধীদের প্রহারে নিহত হন জনসংহতির এক সমর্থক। জনসংহতি সমিতি এই হত্যাকান্ডের হন্য তৎকালীন প্রসিত-সঞ্চয়-দীপায়ন গ্রুপ(যাদের নেতৃত্বেই পরবর্তীতে গঠিত হয় ইউপিডিএফ) কে দায়ী করে থাকে। তবে ইউপিডিএফ এর বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবী,১৯৯৮ সালের ৪ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লতিবান এলাকায় জনসংহতি সমিতির কর্মীদের হাতে খুন হন তাদের সমর্থক প্রদীপ লাল চাকমা এবং কুসুমপ্রিয় চাকমা। আর এর মাধ্যমেই পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের পাল্টাপাল্টি দাবী তাদের। তবে দুটি দলই যে দাবীই করুক না কেনো,বাস্তবতা হলো,গত ১৫ বছরে ইউপিডিএফ এর দেয়া তথ্য অনুসারে নিহত হয়েছে ২৪৩ জন নেতা-কমী-সমর্থক। আর বিপরীতদিকে জনসংহতির নিহত হয়েছে ৯০ জন প্রত্যাগত শান্তিবাহিনীর সদস্যসহ ৩১০ জন কর্মী ও চুক্তির সমর্থক। পাশাপাশি ২০০৮ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে নতুন সংগঠন জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) নামে আত্মপ্রকাশ করা সংগঠনটির ২৯ জন নেতাকর্মী নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়ে সংগঠনটি সকর হত্যাকান্ডের জন্য সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছে। সেই হিসেবে গত ১৫ বছরে তিনটি সংগঠনের নিহত হয়েছে পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী। আবার ইউপিডিএফ এর অভিযোগ নিরাপত্তাবাহিনীর হাতেও তাদের ১৩ নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উভয় সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা যেমন আছে,আছে দলগুলোর সামান্য সমর্থক। আবার কখনো পিতার সাথে নিহত হয়েছে ৩ মাস বয়সী শিশু সন্তানও। এই বিবাদমান দলগুলোর সহিংসতা থামাতে একাধিকবার পাহাড়ী সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগও নেয়া হয়। আলোচনার টেবিলেও নিয়ে আসা হয় উভয়পক্ষকে। তবে একবারই উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে নষ্ট হয়ে যায় শর্তভঙ্গের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে।
ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রসঙ্গে ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা ও প্রদীপন খীসা বলেন- ‘এটা শুরু হয় চুক্তির পর ১৯৯৮ সালে চেয়ারম্যান কুসুমপ্রিয়-প্রদীপলালকে হত্যার মধ্য দিয়ে। সেই সময় সন্তু লারমার সাথে সাক্ষাত শেষে ফেরার পথে সন্তু লারমার নির্দেশেই খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লতিবান নামক এলাকায় সন্তু লারমার নির্দেশে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে সন্তু লারমারা একের পর এক আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের হত্যার রাজনীতি শুরু করলো। আমরা তাদের কাছে বারবার এই সংঘাত বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আমরা এটা(সংঘাত) চাইনি। সন্তু লারমা এই সংঘাতের জন্য দায়ী।
তারা বলেন-‘সন্তু লারমাদের সাথে ২০০০ সালে,২০০৬ সালে এবং এর মাঝে একবার ঐক্যের ব্যাপারে আমরা বৈঠক করেছি। এই ব্যাপারে একটি চুক্তিও হয়েছিলো। গনতান্ত্রিকভাবে যে যার মতো আন্দোলন করে যাবে,এমন সিদ্ধান্তই ছিলো চুক্তিতে। কিন্তু সন্তু লারমারাই সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তবুও আমরা এখনো ঐক্য চাই। জাতির বৃহত্তর সাথে মতপার্থক্যকে পেছনে ফেলে আামাদেরকে আলোচনার মাধ্যমে একটা চুক্তিতে উপনীত হওয়ার দরকার,আমরা ঐক্যের আহ্বান জানাই। এটা বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি,মানবাধিকারকর্মী, সমাজের বিশিষ্টজনরা অর্থাৎ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে বসেই আমরা সমস্যাটির নিরসন চাই। জনসংহতি সমিতির কোন নেতাকর্মী হত্যার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে তিনি বলেন-তারা (জনসংহতি) কল্পনাপ্রসূত অভিযোগ করে । এইসব তাদের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ । তারা জনগণের উপর নানাভাবে নিপীড়ন করায়,জনগণের পাল্টা প্রতিরোধে তাদের ক্ষতি বা কেউ মারাও যেতে পারে। এর জন্য ইউপিডিএফ সাংগঠনিকভাবে দায়ী নই।
আর জনসংহতির বক্তব্য হলো–চুক্তি সাক্ষরের পরপরই ইউপিডিএফ এর জন্ম দেয়া হয়েছে জনসংহতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য এবং চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা-এই দুটি মূল উদ্দেশ্য নিয়ে। সরকার তথা শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ মহলের সহযোগিতায়। ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাাসের কারণে পার্বত্যাঞ্চল অশান্ত অবস্থা,নিরাপত্তাহীনতা। এখানে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি। এখানে শত শত মানুষকে জিম্মি করে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তাই ইউপিডিএফ এর হাতে নিপিড়ীত মানুষ সংগঠনিত হয়েছে এবং ইউপিডিএফ বিরোধী একটি সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে। আত্মরক্ষার জন্য, নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য যে গ্রুপটি গড়ে উঠেছে তারা চুক্তির স্বপক্ষের,চুক্তির বাস্তবায়ন চায় এবং একটা নিরাপদ জীবন পেতে চায়। তারাই ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাসের বিপক্ষে অস্ত্র ধরেছে। এবং আজকের বিভিন্ন স্থানে যে সংঘাত চলছে তা হচ্ছে,ইউপিডিএফ এর বিরুদ্ধে যারা আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ধরেছে তাদের মধ্যে,এটা জেএসএস নয়। জেএসএস এখনো সেই পথে যায় নাই।
ইউপিডিএফ এর জন্মই হয়েছে একটা হীন উদ্দেশ্য নিয়ে,যারা জন্ম দিয়েছে তারাও হীন উদ্দেশ্যে জন্ম দিয়েছে-এমন অভিযোগ করে সন্তু লারমা সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার দাবী জানান। তিনি বলেন- তাদের সাথে আমাদের কখনই কোন চুক্তি হয় নাই,এটা সত্যি,তাদের সাথে বৈঠক হয়েছে অনেকবার। তারা সন্ত্রাসী হলেও আমরা শান্তির স্বার্থে ধৈর্য্য ধরে, দুরদর্শী হয়ে চেষ্টা করেছি সমঝোতার। আমরা তাদের একটা কথাই বলেছি-তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করো, তোমাদের অস্ত্র কাকে জমা দিবা তা আমরা জানিনা,সে অস্ত্র জমা দিয়ে তোমরা আরো দশটা রাজনৈতিক দল করো,এতে আমাদের কোন আপত্তি নাই। তিনি আরো বলেন- এরা সন্ত্রাসী,এদের সাথে কিসের চুক্তি হবে। এদের সাথে আমরা বৈঠক করেছি,আমরা বলেছি,এখনো বলছি,এই মুহূর্তে তারা যদি অস্ত্র ত্যাগ করে এসে বলে আমাদের কাছে আর অস্ত্র নাই,আমরা আর কাউকে খুন করবেনা,পঙ্গু করব না,তাহলে ঐক্য হতে পারে। এটাও আমরা আহ্বান করেছিলাম,তারা সেটা মানে নাই।

চাঁদায় বন্দী রাজনীতি

নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন ছাড়াও সশস্ত্র কর্মীদের খোরপোষ ও দল চালানোর জন্য বিপুল অর্থের সংস্থান করতে হয় তিনটি রাজনৈতিক দলকেই। আর এই বিপুল টাকার উৎস নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত। টাকার অর্থের সাথে আন্তর্জাতিক সংযোগের নানান আলোচনা চায়ের টেবিলে ঘুরপাক খেলেও বাস্তবতা হলো,পাহাড়ে সাধারন মানুষ,ব্যবসায়ী,পরিবহন মালিক,কৃষক থেকে শুরু করে সবার কাছ থেকে নিয়মিতহারে সংগৃহীত চাঁদাই এই তিনটি দলের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন কোন খাত নেই যেখান থেকে চাঁদা আদায় করা হয়না। কাঠ,বাঁশ বা ঠিকাদার ব্যবসাই চাঁদা আদায়ের সবচে বড় খাত হলেও এছাড়াও রয়েছে অজ¯্র খাত। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপনন পর্যন্ত স্তরে স্তরে দিতে হয় চাঁদা। তাও আবার একটি সংগঠনকে নয়,এলাকাভেদে তা তিনটি সংগঠনকেও দিতে হয়। কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণকারি জেলে নৌকা,শহরের একমাত্র বাহন অটোরিক্সা,কিংবা পুরো জেলাজুড়ে চলা বাস,ট্রাক,জিপ বা যেকোন গাড়ী বার্ষিক নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে শিক্ষকরা মানুষগড়ার কারিগর,তাদেরকেও বার্ষিক চাঁদা দিতে হয় এই সংগঠনগুলোকে। এলাকা,ক্ষেত্র এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় চাঁদার হারেও রয়েছে উঠা নামা,বৈপরীত্ব। নিয়মিত এই চাঁদার পাশাপাশি আবার অপহরণও পাহাড়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য হিসেবে বিবেচিত। বছরে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি হলেও এনিয়ে মুখ খোলেন না ভুক্তভোগিরা। আর তিন সংগঠনের নেতারাই প্রতিপক্ষকে চাঁদাবাজ হিসেবে উল্লেখ করলেও নিজেদের বেলায় বিপরীত অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেন,ড়ল চালানোর জন্য সহায়তা নিতে হয়,এটা কোন অন্যায় নয়।

তবে দলগুলো বক্তব্য,আদর্শ বা লড়াই নিয়ে নিজেরা যাই বলুক না কেনো,বাস্তবতা হলো,তাদের আচরণ,কার্যক্রম আর সিদ্ধান্তে হতাশ সাধারন পাহাড়ী বাঙালী সবাই। সাধারন পাহাড়ীদের বক্তব্য স্পষ্ট,আন্দোলন হতে হবে গনতান্ত্রিক এবং লড়াই হবে রাজপথেই। ভ্রাতৃঘাতি যেকোন সংঘাতের তীব্র বিরোধীতা করা পাহাড়ের মানুষ মনে করেন-‘অস্ত্র দিয়ে বুক হয়তো ঝাঁঝড়া করা যায়,কিন্তু সাধারন মানুষের হৃদয় স্পর্শ করা যায়না’। আর মানুষের এই ভাবনা যত দ্রুত এই তিনটি সংগঠনের দায়িত্বশীলদের হৃদয় স্পর্শ করবে,ততই পাহাড়ের মঙ্গল,দেশের মঙ্গল।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কাপ্তাইয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান

কাপ্তাই নতুন বাজারে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফ আহমেদ …

Leave a Reply