নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » বিভেদে বিবর্ণ বাঙালী ছাত্র সংগঠনগুলো

বিভেদে বিবর্ণ বাঙালী ছাত্র সংগঠনগুলো

chattra_parishadসারা দেশের ছাত্ররাজনীতির সাথে পার্বত্য জেলাগুলোর ছাত্ররাজনীতির বৈপরীত্য বেশ লক্ষ্যনীয়। সারাদেশের মতো পাহাড়ে মূল রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগি ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ,ছাত্রদল,ছাত্র ইউনিয়ন,ছাত্রফ্রন্ট,ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম থাকলেও এর বাইরেও আছে কিছু ছাত্র সংগঠন। এই ছাত্র সংগঠনগুলো গড়ে উঠে মূলত স্থানীয় জাতিগত রাজনৈতিক চেতনা থেকেই। পাহাড়ী ছাত্রদের একটি বড় অংশ যেমন সবাই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের রাজনীতির সাথে জড়িত,তেমনি বাঙালী ছাত্রদের একটি অংশও একইভাবে বাঙালী ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে সম্পৃক্ত। জাতিগত পরিচয় ভিত্তিক এই সংগঠনগুলো নিয়ে পাহাড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও বাস্তবতা হলো,সংগঠনগুলো এখানে আছে,এবং বেশ জোরেসোরের নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করেই অস্তিত্ব জানান দেয় প্রায়ই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী ভিত্তিক প্রথম সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ। ১৯৯১ সালের ১ নভেম্বর তৎকালিন প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদকে অনেকটা চ্যালেজ্ঞ করেই প্রতিষ্ঠা হয় এই সংগঠনটির। তৎকালিন ছাত্রনেতা আলকাছ আল মামুন ও এয়াকুব আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি গত দুইদশক ধরে পাহাড়ে বাঙালী ছাত্রদের মধ্যে একক প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। কিন্তু পার্বত্য জেলাগুলোতে এই সংগঠনের আগের সেই একক প্রভাব প্রতিপ্রত্তি এখন আর নেই। নানা রাজনৈতিক মতবিরোধ,গোষ্ঠীদ্বন্ধ,আর স্বার্থের ভাগাভাগিতে নানা সময় বিভক্ত হলেও সম্প্রতি নানান চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে আবার সংগঠনটি পুনর্গঠিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো,একই সময় এই সংগঠনকে চ্যালেজ্ঞ করে এর সাবেক কিছু নেতাকর্মী সংগঠন থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন আরো একাধিক সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলন,পার্বত্য বাঙালী ছাত্র ঐক্য পরিষদ ও পার্বত্য যুব ফ্রন্ট। এই সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা সবাই কোন না কোন সময় বাঙালী ছাত্র পরিষদের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় পার্বত্য বাঙালী ছাত্র ঐক্য পরিষদ এবং একই বছর প্রতিষ্ঠিত হয় সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলনও।

কেনো এই বিভক্তি এই প্রসঙ্গে সংগঠনগুলোর নেতারা জানিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য। পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক মোঃ আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন,পাহাড়ীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং তাদের কাছ থেকে নানাভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়ে কেউ কেউ ভিন্ন ভিন্ন সংগঠন করছে,কিন্তু সেইসব সংগঠন জনগণের গ্রহনযোগ্যতা পাচ্ছেনা। পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদই গত ২২ বছর যাবৎ পাহাড়ের বাঙালী ছাত্রদের সবচে প্রিয় সংগঠন হিসেবে কাজ করে আসছে। তাদের দাবি,একজন ছাত্র জাতীয় যেকোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থেকেও এই সংগঠনে কাজ করার সুযোগ আছে।

নিজেদের বিরুদ্ধে জামাত শিবির সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন,যারা নিজেরাই একসময় শিবির করতো তারাই এখন আবার আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দিচ্ছে,যা মোটেও সত্য নয়। তিনি দাবি করেন,নানা মতপথের শিক্ষার্থীরা সংগঠনে আছে,কিন্তু শিবিরের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত কেউ কমিটিতে নেই। তবে প্রতিষ্ঠাকালিন দুই নেতা এয়াকুব আলী চৌধুরী ও আলকাছ আল মামুন জামায়াতের রাজনীরি সাথে জড়িত থাকার কারণেই এই অপপ্রচার হচ্ছে বলে স্বীকার করে তিনি বলেন,সাবেক কোন নেতা কোন দল করেন এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার,এর সাথেতো বাঙালী ছাত্র পরিষদের কোন সম্পর্ক নেই। বাঙালী আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্য তৃতীয় একটি পক্ষের প্ররোচনায় এই ধরণের অপপ্রচারের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলেও দাবি তার। ইসমাইল নবি শাওনকে সভাপতি ও আকতার হোসেনকে সাধারন সম্পাদক করে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি,তিনটি জেলাতেই ৩১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি এবং রাঙামাটির বাঘাইছড়ি,লংগদু,নানিয়ারচর,বরকলসহ তিন পার্বত্য জেলার অধিকাংশ উপজেলায় নিজেদের কমিটি আছে বলেও জানান তিনি। তবে এই সংগঠনটির নেতাদের বিরুদ্ধে জামাত-শিবিরের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করে থাকে অন্যান্য বাঙালী সংগঠনগুলো।

সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলনের রাঙামাটি জেলা সভাপতি আল আমিন ইমরান জানিয়েছেন,বাঙালী ছাত্র পরিষদের বর্তমান নেতৃত্ব পুরোটাই জামাত-শিবিরের নিয়ন্ত্রনে। আর সমঅধিকার আন্দোলন যেহেতু বাঙালীদের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সংগঠন তাই তাদের ছাত্র সংগঠন হিসেবেই আমরা কাজ করছি। তবে একাধিক সংগঠন থাকায় আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। আল আমিন ইমরানকে সভাপতি ও মোঃ ফয়সাল আলমকে সাধারন সম্পাদক করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় কার্যক্রম শুরু করা এই সংগঠনটি তিন পার্বত্য জেলা ও সবগুলো উপজেলায় কমিটি গঠন ও কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি। খাগড়াছড়ির সাবেক সাংসদ ওয়াদুদ ভূইয়া ও সমঅধিকার নেতা পেয়ার আহম্মেদ খান এই সংগঠনটিকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন বলে জানা যায়।

অন্যদিকে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সভাপতি উজ্জ্বল পাল জানিয়েছেন,বিশ বছরের পুরনো সংগঠন বাঙালী ছাত্র পরিষদ জামাত শিবিরের নিয়ন্ত্রনে চলে যাওয়ার কারণে পাহাড়ে বাঙালী আন্দোলন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই আমরা সব দল-মতের মানুষকে নিয়ে ২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমানে এডভোকেট পারভেজ তালুকদারকে সভাপতি ও আব্দুল আউয়াল খানকে সাধারন সম্পাদক এর নিজেদের ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি কার্যক্রম চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি। এই সংগঠনটির নেতাকর্মীরা অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। তবে সংগঠনটির নেতাদের দাবি,অনেক ছাত্রলীগ কর্মীও তাদের সাথে আছেন।

সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করে আরো একটি বাঙালীভিত্তিক সংগঠন। পার্বত্য যুব ফ্রন্ট নামক এই সংগঠনটির সকল নেতাই পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদের সাবেক নেতাকর্মী। এই সংগঠনের সাধারন সম্পাদক মোঃ শাহজাহান বলেন,বাঙালী সংগঠনগুলো নানা কারণে বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আমরা নতুন সংগঠন করার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করেই যাত্রা শুরু করেছি। আশা করছি এখন থেকে সংকট অনেক কমে যাবে।

তবে বাঙালী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা যাই বলুন না কেনো তাদের নিয়ে পাহাড়বাসি বেশ বিব্রত,বিব্রত স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। হঠাৎ করেই কোন কোন সংগঠন কর্মসূচী ঘোষনা করে বসে আবার উধাও ও হয়ে যায়। আবার এক গ্রুপ কর্মসূচী দিলে আরেক গ্রুপ প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেয়,পন্ড হয় কর্মসূচী। এমন নানা নাটকীয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংগঠনটির ইমেজ। আর ইমেজ সংকটে পড়ে সংগঠনগুলো শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে দাঁড়াতেই পারছেনা। আর এই দাঁড়াতে না পারার পেছনে নিজেদের গোষ্ঠী দ্বন্ধ,টানাপোড়েন,স্বার্থের সংঘাত আর আদর্শিক ভিন্ন অবস্থানকে মূখ্য কারণ মনে করেন পাহাড়ে বাঙালী আন্দোলনের সাথে জড়িতরা।

একসময়কার পার্বত্য বাঙালী ছাত্রপরিষদের সভাপতি ও বর্তমানে কর্মজীবি সাব্ব্রি আহম্মেদ বলেন,পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ যেভাবে নিজেদের কর্মসূচী নিয়ে পাহাড়ীদের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছে আমাদের বাঙালী ছাত্র সংগঠনগুলো তা পারেনি। এর পেছনে নিজেদের বিরোধ যেমন রয়েছে একইভাবে এটাও সত্য যে,নানা স্বার্থচিন্তার কারণে অনেকেই সরাসরি মাঠের আন্দোলনে আসেন না। তবে পার্বত্য এলাকার বাঙালীদের বেঁচে থাকার স্বার্থেই সবগুলো বাঙালীভিত্তিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন,কারো বিপক্ষে নয়,নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রশ্নে তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটা ভীষন জরুরি। তবে সাবেক এই নেতার আহ্বান বর্তমানে নানা দলে উপদলে বিভক্ত সংগঠনটির নেতাকর্মীদের কর্ণকুহরে যে প্রবেশ করছেনা তা তাদের কার্যক্রমেই স্পষ্ট।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বাঙালি ছাত্র পরিষদের প্রতিবাদ সমাবেশ

ছাদেকুল হত্যার বিচার ও পার্বত্য এলাকা থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের …

Leave a Reply