নীড় পাতা » রাঙামাটি » পাহাড়ে ‘অপহরণ’ আতঙ্ক

পাহাড়ে ‘অপহরণ’ আতঙ্ক

অপহরণের মুক্তি পাওয়া টেলিটক কর্মচারিরা
অপহরণের মুক্তি পাওয়া টেলিটক কর্মচারিরা
অপহরণ শব্দটি এখন পাহাড়ে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। পুরো পাবর্ত্যাঞ্চলে এটি এখন একটি খুব সাধারন ঘটান হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতি মাসেই,এমনকি সপ্তাহান্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও না কোথাও ঘটছে অপহরণ। অপহরণের শিকার হচ্ছেন পাহাড়ের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া দিন মজুর, কৃষক পর্যন্ত। গত ৮ জুলাই বাঘাইছড়িতে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব মোবাইল অপারেটর টেলিটকের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বি টেকনোলজির ৪ কর্মীসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। প্রায় ১৮দিন পর তাদেরকে উদ্ধার করা হয়।

২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি অপহৃত হন রাঙামাটি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জেলা কৃষকলীগের সভাপতি অনিল তঞ্চঙ্গ্যা। অপহরণের দেড় বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো তার কোনো হদিস জানে না কেউ। রাত দুপুরে বসতবাড়ি, দিনের বেলায় হাটবাজার বা কর্মক্ষেত্রে থেকে কে কখন অপহরণের শিকার হচ্ছেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অপহরণের এক অজানা আতঙ্কে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে পার্বত্য জনপদে। আতঙ্কে ঘুম নেই পাহাড়ের মানুষের। এক গ্র“পের অপহরণ ঘটনা ঘটলে কয়েকদিন পর দেখা যায় আরেক গ্র“পের অপহরণ ঘটনা। এর ফাঁকে মাঝেমধ্যেই চলে গোলাগুলি; অতঃপর লাশ। গত ১২ মার্চ জেএসএস (এমএন লারমা) গ্র“পের রাঙামাটি জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক সুদীর্ঘ চাকমাসহ অপর তিন কর্মী নেতা নিহত হওয়ার ঘটনা যেনো এই অপহরণ রাজনীতিকে আরো উস্কে দিয়েছে। পার্বত্য চুক্তির পর ২০১২ ইংরেজি পর্যন্ত ৯৫৯জন অপহরণ হয়েছে বলে জানায় আইনশৃঙ্গলা বাহিনী। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তির পর ২০১৩ আগস্ট পর্যন্ত দাবি সহস্রাধিক, ইউপিডিএফের দাবি অপহৃত হয়েছে তাদেরও সহ¯্রাধিক নেতাকর্মী। সে হিসেবে চুক্তির পর এই এলাকায় প্রায় দুই হাজারের ওপর অপহরণ ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অনেকেই মুক্তিপণের মাধ্যমে মুক্তি পেলেও পরবর্তীতে অনেকের লাশ হ্রদে বা বনে জঙ্গলে পরিত্যক্ত পাওয়া গেছে। আবার অনেকের আর কোনদিন হদিসই মেলেনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে, এবছরে প্রথম আটমাসে রাঙামাটি থেকে শতাধিক মানুষকে অপহরণ করেছে সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে কয়েকজন লাশ হয়ে, আবার কেউ মুক্তিপণের বিনিময়ে ফিরে এলেও খোঁজ নেই অনেকের। পাহাড়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অপহরণ ঘটনা ঘটে এই বছরের ১৬ ফেব্র“য়ারি। ওইদিন রাঙামাটিতে জেএসএসের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে ফেরার পথে লংগদুর কাট্টলি থেকে প্রায় সত্তর জন জেএসএস কর্মীকে অপহরণ কর্মীকে অপহরণ করা হয়। এদের মধ্যে জেএসএসের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী প্রথমে নয় জনকে ও পরে ৩৪ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাকিদের এখনো উদ্ধার করতে পারেনি প্রশাসন। আবার পাঁচদিনের ব্যবধানে লংগদুতে আরো ছয়জন অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
এসব অপহরণের ঘটনার জন্য পাহাড়ে বিবাদমান তিন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) ও জেএসএস(এমএন লারমা) পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল তুলছে। অপহরণ ঘটনার পর পরস্পরকে পাল্টাপাল্টি দায়ি করা হয়। তবে তিন গ্র“পই অপহরণের সাথে নিজেদের সম্পর্ক নেই বলে দাবি করে আসছে। অপহরণের শিকার বেশিরভাগ পাহাড়ি জনগোষ্ঠির মানুষ এবং এদের অধিকাংশই সাধারণ গ্রামবাসী, শিক্ষক, কৃষক ও দিনমজুর। সাধারণত চাঁদাবাজির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কর্মচারীকে অপহরণ করা হয়। আর পাহাড়িদের মধ্যে যাদেরকে অপহরণ করা হয় তাদের দোষ তারা প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোক, অথবা নিজ সংগঠনের বিরুদ্ধচারণ করা কিংবা সন্দেহের কারণে অপহরণ করা হয়ে থাকে। গত বছরের ১৭জুন রাঙামাটির বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নের চিলাকধাঁক এলাকা থেকে কলা বোঝাই বোট থামিয়ে অস্ত্রের মুখে ১৩ জনকে অপহরণ করা হয়। এদের অপহরণের মূল উদ্দেশ্যে ছিলো এরা সুবলং বাজারে পণ্য বিক্রি না করে বোটবোঝাই কলা নিয়ে রাঙামাটিতে আসছিলো। এতে তাদের অপহরণ করার কারণে পরবর্তী শুক্রবারে সাপ্তাহিক হাট বসতে থাকে। যদিও এর পেছনে কাজ করছিলো চাঁদার অর্থ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-তথ্য ও প্রচার স¤পাদক সজীব চাকমা বলেন, মূলত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্তও জনসংহতি সমিতিকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে এই অপহরণগুলো করা হচ্ছে। অপহরণের এইসব ঘটনা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ জনগণের মধ্যে চুক্তি বিষয়ে আতঙ্ক তৈরির জন্য তারা এই অপহরণগুলো করছে। তিনি পাহাড়ে অপহরণ ঘটনার জন্য চুক্তিবিরোধী ইউপিডিএফকে দায়ী করেন।

ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় নেতা মাইকেল চাকমা বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি জিইয়ে রেখে সরকার ফায়দা লুটতে চায়। সরকার ইচ্ছে করে সন্তু লারমাকে দিয়ে এই অপহরণ ঘটনা ঘটাচ্ছে। আবার জেএসএসের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে এসব ঘটনার পাল্টা জবাব দিচ্ছে। ইউপিডিএফ কোন অপহরণ ঘটনার সাথে জড়িত নয় বলে দাবি করেন তিনি।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির জন্য অপহরণ ঘটনা ঘটেছে। তবে গত ১২ মার্চ সুদীর্ঘসহ তাদের কয়েক কর্মীকে গুলি করে মারার পর তাদের সশস্ত্র গ্রুপও প্রতিশোধ স্পৃহায় মাঠে নেমেছে। তবে একসময় সব ঠিক হয়ে আসলেও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত আবারো উস্কে দেয় এইসব অপকর্মকান্ডের।

এদিকে একের পর এক অপহরণ ঘটনায় পাহাড়ের জনজীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে, সর্বত্র বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা। থেমে যাচ্ছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। কিন্তু, সাধারণ পাহাড়ি বাঙালি কেউই এ ব্যাপারে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে ভয়ে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় যে, এসব অপহরণের অধিকাংশ ঘটনার জন্য থানায় কোনো মামলাও হয় না। কয়েকটি ঘটনায় মামলা হলেও অপহৃতদের উদ্ধার বা অপহরণে জড়িতদের আটক করতে পারেনি পুলিশ। আর অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগম বলেন,অপহরণ ঘটনাগুলো কারা করে তা সবাই জানে। কিন্তু ভুক্তভোগিরা এইসব বিষয়ে মুখ খোলেনা,কোন অভিযোগও করেনা। আবার অনেক ঘটনা ঘটে অনেক দুর্গম এলাকায়,বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যার কোন অভিযোগ পুলিশ পর্যন্ত আসেইনা কিংবা আইনশৃংখলাবাহিনীরও কিছুই করার থাকেনা। এই অপহরণ ঘটনা বন্ধে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট বলে মন্তব্য করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাজস্থলীতে মাস্ক না পরলেই গুনতে হচ্ছে জরিমানা

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মুখে মাস্ক না পরে ঘরের বাইরে আসায় বাজারে …

Leave a Reply