নীড় পাতা » ফিচার » অরণ্যসুন্দরী » পাহাড়ের পর্যটনে দু:সময়

পাহাড়ের পর্যটনে দু:সময়

parzatan-01পর্যটনের টিকেট কাউন্টারের গেটম্যান থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপক, কারো মুখেই হাসি নেই, নেই স্বাভাবিক আচরণও। মন্দা ব্যবসার প্রতিচ্ছবিই যেনো তাদের চোখে মুখেই। অথচ মাত্র মাসখানেক আগেই ঠিকই ছিলো বিপরীত চিত্র। উপচে পড়া পর্যটক,টিকেট কাটায় হুড়োহুরিতে নি:শ্বাস ফেলার সময় ছিলোনা,গেটম্যান,রেস্তোরার কর্মচারি,বোটঘাটের ম্যানেজার কারোই। পুরো কমপ্লেক্স এর এপাড় থেকে ওপাড়ে হেঁটে একটি ট্যূর অপারেটনের গাড়ীতে ৬ জন বিদেশী পর্যটক আর স্থানীয় কিছু মানুষের বৈকালিক ভ্রমনে ঝুলন্ত ব্রীজে দাঁড়িয়ে ফটোশ্যূট ছাড়া আর কোন পর্যটকের দেখা মিললো না। বোটঘাটেও নি:সঙ্গ ঘাটের ম্যানেজার একাকী বসে ছিলেন,সেই কোন বোট চালকও। ঘাটে বাধা সাড়ি সাড়ি বোট, শুধু নৌবিহারে যাওয়ার পর্যটকের দেখা নেই ! এমন চিত্রই দেখা গেলো রাঙামাটি শহরে বেড়াতে আসা পর্যটকের বেড়ানোর প্রধানতম স্থান ‘পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স’র।

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা জের ধরে গত ৫ জানুয়ারি থেকেই রাঙামাটির পর্যটন ব্যবসায় ধ্বস নামে বলে জানালেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। দেশব্যাপি চলা রাজনৈতিক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচী আর ১০ ও ১১ জানুয়ারি রাঙামাটি শহরে পাহাড়ী-বাঙালী সহিংসতার পর দৃশ্যত: পথে বসেছে এ জেলার পর্যটন খাত। অথচ ডিসেম্বর মাস জুড়ে যেভাবে ব্যাপকহারে পর্যটক আসা শুরু হয়েছিলো শহরে সর্বত্রই ছিলো উৎসবের আমেজ। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে করে বোট চালক সবাই একবাক্যে বলেছিলেন ‘এবছর বাম্পার ব্যবসা হবে’ ! কিন্তু কে জানতো ভাগ্যদেবি তখন দূরে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হাসছে।
Rangamati-Parzatan-Pic-(2)
৩৪ বছরের রেকর্ড মিইয়ে গেলো একমাসেই !
গত ডিসেম্বর মাসের ৫ তারিখ থেকে জানুয়ারির ৪ তারিখ পর্যন্ত রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্স ব্যবসা করেছে ৩৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। যা প্রতিষ্ঠানটির ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরুর পর পর্যন্ত একমাসে সর্বোচ্চ ব্যবসার রেকর্ড ! কিন্তু ৫ জানুয়ারি থেকে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত সেই ব্যবসা নেমে এসেছে মাত্র ১ লক্ষ টাকায় ! রাঙামাটি পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা হতাশার সুরে জানালেন,১ মাসে ৩৪ বছরের রেকর্ড ভাঙ্গা যে ব্যবসা আমরা করলাম,তা দেখে আমার ভেবেছিলাম এই মৌসুমে আমাদের জন্য সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে,কিন্তু ৫ জানুয়ারি থেকে আমাদের চূড়ান্ত সর্বনাশ হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই এই জন্য প্রধানত দায়ি করে তিনি জানান, আমাদের অন্তত: ১০ টি বড় বড় কর্পোরেট বুকিং বাতিল করতে হয়েছে,পুরো মাসে ১ লাখ টাকাও ব্যবসা হয়নি !

অথচ এ বছরই চালু হয়েছিলো রাঙামাটি পর্যটন কর্পোরেশন এর নতুন আরেকটি মোটেল। বেড়েছিলো আবাসিক সুবিধা। আগে যেখানে মাত্র ৩০ টি রুম ছিলো এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ টিতে,যদিও ২৫ টি এখনো পুরো চালু করা যায়নি। এবছর থেকেই আবাসিক বোর্ডারদের জন্য সকালে ফ্রি নাস্তা সার্ভিসও চালু করেছিলো তারা।

পর্যটনের ঝুলন্ত ব্র্রীজ পেরুলেই বোটঘাট। এখানে ৪৮ জন মালিকের ৯৩ টি ইজ্ঞিনবোট আছে পর্যটকদের কাপ্তাই হ্রদে নৌবিহার এবং জলপথের দর্শনীয় স্থান সুভলং,পেদাতিংতিং,টুকটুক,জুমঘর,চাংপাং,বালুখালি ভ্রমনের জন্য। বছরের ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টাতে এই বোটগুলোর অবসরের কোন ফুসরত থাকেনা। অথচ এখন এসব বোটের চালকদের দু:সহ অবস্থা। বোট মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মুজিবুর রহমান ও সহসভাপতি নুরুল মোস্তফা জানালেন, আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে,বছরের নয়মাস আমরা কোনরকমে বেঁচে থাকি,এই তিনমাসই মূলত: ব্যবসা হয়,কিন্তু এখন কোন পর্যটকের দেখা নেই। আমাদের বোটচালকদের ঘরে ভাতের চালও নেই,দেনা করে করে আমরা নি:স্ব,এইভাবে আর কতদিন ?

মোটেলের বাইরে দেখা মিললো জার্মানীর হেনোভার থেকে আসা দুই বিদেশী পর্যটক ভ্যানিলানা ও স্টেফি’র সাথে। শূণ্য পর্যটন দেখে হতাশ তারাও। সাংবাদিক পরিচয় জানাতেই জানালেন, আমরা কিছুক্ষন আগেই রাঙামাটি আসলাম,যদিও আমাদের গাড়ীতে টুরিস্ট লেখা, তবুও সারাপথ ভয়ে ছিলাম,যদি গাড়ীতে আক্রমন হয়, ভয়ে আমরা রাতে কেউ ঘুমাইনি গাড়ীতে। তোমাদের এখানে নাকি গাড়ীতে যাত্রীসহ পুড়িয়ে দেয়া হয়,এমনকি পলিটিক্যাল এক্টিভিস্টরা নাকি পুলিশের গাড়ীও পুড়িয়ে দেয় ! এভাবে তোমাদের দেশের তো কোন উন্নতি হবেনা। বিদেশী এই দুই পর্যটক পরামর্শ দিলেন, তোমরা এসব বন্ধ কর,ট্যুরিজমকে ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা ও স্থিতিশীল করতে চাইলে এসব বন্ধ করতেই হবে তোমাদের।

শুধু পর্যটন কমপ্লেক্সই নয়, রাঙামাটি শহরের প্রায় অর্ধশতাধিক হোটেল-মোটেল-কটেজ-গেস্টহাউজের মালিক, কাপ্তাই হ্রদে ট্যুারিস্ট নির্ভর প্রায় দুইশত ইজ্ঞিন বোট চালক,শহরের প্রায় অর্ধশতাধিক টেক্সটাইল বিপনীর মালিক ও বিক্রয়কর্মীরা আর পর্যটনের সাথে সংশ্লিষ্টরা এখন অমানবিক সংকটে পড়েছেন। এভাবে আরো কিছুদিন চললে ব্যবসা লাটে উঠবে বলেও জানালেন তারা।
Rangamati-Parzatan-Pic-(3)
রাঙামাটি হোটেল ব্যবসায়ি সমিতির যুগ্ম সম্পাদক নেসার উদ্দিন জানালেন,আমরা শেষ ভাই,এসবের কোন মানে হয়না। তিনি পর্যটনখাতকে রাজনৈতিক কর্মসূচীর বাইরে রাখার দাবি জানান।

রাঙামাটি টেক্সটাইল মালিক সমিতির সভাপতি জহিরউদ্দিনও জানালেন, বছরের এই সময়টাতেই আমাদের ভালো ব্যবসা হয়,কিন্তু এবার আমাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়,কর্মচারিদের বেতন দেয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। কোন কোন দিন তো এক টাকাও বিক্রি হয়না ! এভাবে চললে আমরা শেষ হয়ে যাবো।

রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্স এর ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানালেন, ট্যুরিজম একটি বহুমাত্রিক শিল্প। এর সাথে বিভিন্ন বিষয় জড়িয়ে আছে। আপনার সার্বিক পরিস্থিতি যদি অনুকূলে না থাকে তাহলে পর্যটক আসবেনা। আমরা যদি আমাদের দেশে এই শিল্পের বিকাশ বা উন্নয়ন চাই,সত্যিকারের ব্যবসা চাই তাহলে অবশ্যই ক্ষতিকর রাজনৈতিক কর্মসূচী পরিহার করতে হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কাপ্তাইয়ে করোনা সংক্রমণ কমছে

প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং থানা পুলিশের তৎপরতায় রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে করোনা সংক্রমন হার কমছে। কাপ্তাই উপজেলা …

Leave a Reply