নীড় পাতা » পার্বত্য পুরাণ » পাহাড়ের নারীদের বৈসাবী উৎসব

পাহাড়ের নারীদের বৈসাবী উৎসব

coverবৈসাবী উৎসব এলেই পুরনো বছরের সব পঙ্কিলতা মুছে দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন শুরু হয়ে যায় পাহাড়ের আদিবাসী নারীদের। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীদের একটি সামাজিক উৎসব বৈসাবি। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে চলে সপ্তাহব্যাপী নানা আয়োজন। মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাইং উদ্যাপন চলে চারদিন ধরে। বাংলা বছরের শেষ দিন ও বাংলা নববর্ষের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন পর্যন্ত। উৎসবের প্রথম দিনকে বলে পাইছোয়ে অর্থাৎ ফুল তোলা সাংগ্রাইং, দ্বিতীয় দিন হচ্ছে সাংগ্রাই (মূল সাংগ্রাইং), তৃতীয় দিন হচ্ছে আঃক্যে এবং চতুর্থ দিন হচ্ছে আতাধা,পঞ্চম দিন হচ্ছে আপ্যেং (উড়ে বিদায় হওয়া)। প্রথম দিনে গাছ থেকে ফুল তুলে বাড়ীÑঘর, গৃহপালিত পশুদের সজানো হয়। দ্বিতীয় দিনে সবাই মন্দিরে যায়, পূজাÑঅর্চনা ও প্রার্থনা করে জগতের সব প্রাণীর মঙ্গল কামনা করে। নারীরা তৈরি করে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবার। তৈরি করে বিন্নি ধানের ছিহ্ল মু, ছেসব মু, গুং মু (মু অর্থ পিঠা)। এসব তৈরি করে পাড়াÑপ্রতিবেশীদের খাওয়ান পরম মমতায়। নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত যুবতীরা মৈত্রী পানিবর্ষণ খেলায় অংশ নেয়। অন্যদিকে নানা বয়সী নারীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ধ, লারি, ছক্কা, খোঙ্যাং খেলায় অংশগ্রহণ করে থাকে। যেন পাহাড়ের আদিবাসী নারীদের ব্যস্ততার অন্ত নেই।
চাকমা সম্প্রদায় চৈত্র মাসের শেষ দু’দিন ও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পর্যন্ত এ উৎসব করে। প্রথম দিনের আচারÑঅনুষ্ঠানকে বলে ফুল বিজু। এ দিনের সূর্যোদয়ের পূর্বে পৃথিবীর সব মানুষের কল্যাণ কামনা করে গাঙে ফুল ভাসিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় দিন হচ্ছে মূল বিজু। এ দিন ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী পাঁচন রান্না, পিঠা ও পায়েস দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। তৃতীয় দিনকে বলে গজ্যাপজ্যা দিন, অর্থাৎ বছরের প্রথম দিন। এ দিনে বিশ্রাম নেবে এবং পুরো বছর যেন সাফল্য ও মঙ্গল বয়ে আনে সবার জীবনে, সে জন্য মন্দিরে পূজা ও প্রার্থনা করবে। বৈসাবীকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে সপ্তাহ আগে থেকেই নানা আয়োজন শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তাইতো কোনো বটবৃক্ষের তলায় বসে যাবে নারীদের হস্তশিল্প, কোমর তাঁত বুনন, পাঁচন রান্না, নাধেং খেলা, ঘিলা খেলার প্রতিযোগিতা। পাঁচন (মিশ্রিত সবজির রান্না) তরকারি রান্না করতে প্রয়োজন হয় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ প্রকারের শাকÑসবজি। এ সময় কে কত বেশি প্রকারের শাকÑসবজি মেশাতে পারে, কার রান্না কত সুস্বাদু হয় তার একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলে নারীদের মধ্যে। কথিত আছে, এ পাঁচন খেলে সারা বছর কঠিন রোগÑবালাই থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
চৈত্র মাসের শেষ দু’দিন ও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন থেকে তিনদিন ধরে বৈসুক পালন করে ত্রিপুরা সম্প্রদায়। এ তিন দিনে প্রথম দিনটি হচ্ছে হারি বৈসুক। দ্বিতীয় দিনকে বুইসুকমা এবং তৃতীয় দিন অর্থাৎ নববর্ষের প্রথম দিনকে বলে বিসিকাতাল। গরয়া নৃত্যদল গ্রামের প্রত্যেক ঘরে ঘরে গিয়ে গরয়া নৃত্য করে গৃহস্থকে আশীর্বাদ করে। এ সময় নারীরা অংশ নেয় ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, গানÑবাজনা ও খাবারÑদাবার তৈরির বিভিন্ন কাজে। বৈসুক শুরুর দিন থেকেই পুরো বাসস্থান পরিষ্কারÑপরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে ঘর সাজায় মেয়েরা। দ্বিতীয় দিন তাদের সংযম ও ত্যাগের দিন। এ দিনে কেউ মাঠেÑঘাটে কাজ করে না, মিথ্যা কথা বলে না, কারও অকল্যাণ কামনা করে না। পূজাÑঅর্চনা করবে এবং নতুন বছর যেন ভালো কাটে সে কামনা করবে। বিসিকাতাল অর্থাৎ তৃতীয় দিনে সবাই বছরো পুরো সময়ে বিভিন্ন খাবার তৈরী করবে ও অতিথিদের আপ্যায়ন করবে। বৈসাবী উৎসব আনন্দময় ও পূর্ণতা আনতে আদিকাল থেকে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

( খাগড়াছড়িথেকেপ্রদীপচৌধুরী,সৈকতদেওয়ানফয়সলঅভিরসম্পাদনায়প্রকাশিতউৎসবলিটলম্যাগেরসৌজন্যে )

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জেসমিন সুরভী’র কবিতাগুচ্ছ

গন্তব্যের পথিক হাস্যরসাত্মক এই পৃথিবীর বুকে, পথিক চিন্তায় মগ্ন থাকে প্রতিটি ক্ষণে! কখনো ঘুরে দাঁড়ানোর …

Leave a Reply