নীড় পাতা » আলোকিত পাহাড় » পাহাড়ের ছেলে ‘নিউজম্যান’

পাহাড়ের ছেলে ‘নিউজম্যান’

jahed rubelসাতানব্বইয়ের শেষ ভাগ। পাহাড়কন্যা রাঙামাটি ছেড়ে সবুজ ক্যাম্পাস প্রকৃতিকন্যার বুকে পা রাখা। প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুতা। প্রেম, সখ্য আর দারুন বোঝাপড়া। মাছের প্রতি আমার অন্য রকম ‘দুর্বলতা’। তাই সব কিছু ছাপিয়ে ফিশারিজ ফ্যাকাল্টিকে কাছে পাওয়া। দক্ষ কৃষিবিদ হওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। দিন যত গড়িয়ে যায় পড়াশোনায় আমি হয়ে উঠি বাউন্ডেলে, কিছুটা বহিমিয়ান।
লেখালেখির প্রতি আমার চম্বুকের টান। সেই টানে নাটাই-সুতো দিয়ে উড়ালাম ঘুড়ি। নীল আকাশের ঘুড়ির রাজ্যে আমি হলাম রাজা। এলো ২০০০,নতুন শতাব্দীর নতুন দৈনিক যুগান্তরকে হাতের মুঠোয় পাওয়া। হয়ে উঠলাম ক্যাম্পাসের লড়াকু কলমযোদ্ধা।
আজো মনে পড়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার অনেক সুখস্মৃতি। ক্যাম্পাসে গন্ডগোল বাধঁলেই ছুটতাম নিউজের পিছু। সবার আগে দিতাম ক্যামেরায় ক্লিক। নিউজ লেখার ইন্ট্রো থাকতো মাথায়। কাগজ-কলম নিয়ে সাংবাদিক সমিতি অফিসে বসে পড়তাম শব্দ বুননে। দিতাম সুই-সুতোর মিহিন সেলাই। কাগজের বুকে হয়ে উঠতো এক একটি ‘নকশীকাঁথা’। সেময় ছিল না কম্পিউটার-ইমেইল কালচার। ফ্যাক্সই ছিল ভরসা। ফ্যাক্স করতে ছুটতে হতো শহরের প্রেসক্লাবে (শেষের দিকে ক্যাম্পাসে এসেছিল ফ্যাক্স)। ভালো ছবি থাকলে কলমযোদ্ধারা জোটবদ্ধ হয়ে টাকা-পয়সা তুলে একজনকে পাঠিয়ে দিত ঢাকায়। তার কাজ ছিল ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে গিয়ে বার্তাকক্ষে ছবি পৌঁছে দেওয়া। যখন ক্যাম্পাসের হট কোন নিউজ যুগান্তরে পাঠাতাম  তখন ঘুম হতো না রাতে। কখন হবে ভোর, যেতাম কেআর মার্কেটে। পত্রিকার বান্ডিল খুলে সবার আগে দেখে নিতাম যুগান্তরের নিউজ টিট্রমেন্ট। সে সময় বাকৃবির নিউজ টিট্রমেন্টে যুগান্তরই ছিল সবার সেরা।

ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় আমি অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কাছে হয়ে উঠেছিলাম ‘চোখের বিষ’। দুই শীর্ষ ছাত্র সংগঠনের নেতাদের হাতে নাজেহাল হতে হয়েছে অনেকবার। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে ক্যাম্পাসের বাইরে কাটিয়েছি হাতেগোনা কয়েকটি রাত। বন্ধু জোসেফের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সেময় তোমার শহরের বাসায় ঠাঁই দিয়েছিলে বলে।
মনে পড়ে সে সময়ের বন্ধু কলমযোদ্ধাদের কথা। মনকুঠোয় নানা স্মৃতি দেয় ঘুরপাক। স্মৃতিপটে বেশি আচঁড় দেয় দীন মোহাম্মদ দীনু। এ মানুষটির সাহচর্য না পেলে হয়তো আমাকে ‘গ্রাজুয়েটহীন’ থাকতে হতো।

বলেই ফেলি সেই ঘটনা!
যুগান্তরে একদিন প্রকাশিত হলো কৃষিকন্যাদের আবাসন সংকট নিয়ে একটি খবর। ওই খবরের পর আমাকেও ‘খবর’ করে দেওয়ার আয়োজন চলছিল। সে সময়কার ক্যাম্পাসের অভিভাবক (উপাচার্য) আমাকে সার্টিফিকেট ছাড়া বিদায় দেওয়ার পরিকল্পনা এঁটে বসলেন। অবশেষে ত্রাণকর্তার ভূমিকায় সাংবাদিক বন্ধু দীন মোহম্মদ দীনু। আরেকজনের নাম সঙ্গে না আনলে আমি হবো অপরাধী। তিনি সে সময়ের ক্যাম্পাস রাজনীতির কর্ণধার বিশ্বনাথ সরকার বিটু। কৃতজ্ঞতা জানাতে শুধু ‘ধন্যবাদ’ দীনু-বিটুর নামের সঙ্গে বেমানান। যা তাদের জন্য প্রযোজ্য তা কলমের কালি কিংবা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করা অসম্ভব। রইল অফুরান ভালোবাসা…।
মোকাম্মেল হোসেন,সামসুজ্জামান রতন,নীলরতন সরকার,সাজ্জাদ হোসেন,খসরু সালাউদ্দিন,তানজির,এজেডএন স্বপন,কামরুল হাসান,তোফাজ্জল রনি,তাজকির সৈকত,রাজীবুর রহমান,দিদারুল ইসলাম,শরীফুল হক…। বন্ধুরা, তোমরা কেউ আছো ফেইসবুকে,কেউ আমার মন পিঞ্জিরায়।

স্যালুড, নিয়াজ পাশা। তোমাকে ভুলিনি,তোমাকে ভুললে আমার সাংবদিকতাকে অস্বীকার করা হবে। তোমার বন্ধুসুলভ উপদেশ এখনো কানে বাজে অবিকল।
অনেক স্মৃতি বাধাঁই করে যখন ক্যাম্পাসকে বলি বিদায়, তখন শহীদ নাজমুল আহসান হলের ৪৩০ নম্বর কক্ষের দেয়াল ক্যালেন্ডারে দেখি ‘আগষ্ট ২০০৪’। ফিশারিজ পড়তে গিয়ে শিক্ষাগুরুরা শিখিয়েছেন অনেক। মাছ ধরা থেকে মাছ গবেষণা। পুকুর থেকে ল্যাবরেটরি। আর আমি করি এদিক-সেদিক দৌড়াদোড়ি। আমিই ‘ঘোড়ার ডিম’ কিছু শিখিনি,মনেও রাখিনি কিচ্ছু। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ঘাটলে পাওয়া যাবে এক বর্ণচোরা ছাএের নাম। আমিই সে ছাএ যে কিনা ফিশারিজ পড়তে গিয়ে মাছ চাষের বদলে শিখেছে ‘শব্দ চাষ’। পুকুরের ফাইটোপ্লাংকটন কিংবা জুপ্লাংকটন নিরীক্ষা করতে গিয়ে দিয়েছে ডুবসাঁতার,অনুভব করেছে অবাধ্য কলমের পাগলামি।

বিদায় শব্দের নিষ্ঠুরতা কতখানি যাতনার সেদিন টের পেলাম আরেকবার। শরীর ক্যাম্পাস ছাড়লেও মন তো আর ছাড়ে না। সপ্তাহ ঘুরতেই চলে আসতাম রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতিকন্যার প্রেমে…। এরপর আরেক নেশা, আরেক প্রেম। ফিশারিজের বন্ধুরা করে মাছের কাটাছেড়াঁ, আর আমি শব্দের। এখন খবরের শব্দ নিয়ে খেলছি নিরন্তর।
১ সেপ্টেম্বর,২০০৪। রাজধানীতে ঢুকলাম আমার দেশের সাব এডিটর পদ নিয়ে। এরপর কেবল ধরা আর ছাড়ার গল্প। ২০০৫ ফেব্রুয়ারিতে সমকাল,২০০৬ এপ্রিলে যায়যায়দিনে, ২০০৮ নভেম্বরে রেডিও টুডে, ২০০৯ জুনে আবার সমকালে, সর্বশেষ ২০০৯ ডিসেম্বরে কালের কণ্ঠে। কালের কণ্ঠের বার্তাকক্ষ এখন আমার প্রিয় গবেষণাগার। নিত্যদিন সেই গবেষণাগারে তৈরি হয় পাঠকদের জন্য নানা রসদ। আমিও সেই রসদের কারিগর, খবরের ফেরিওয়ালা। সরি, বাকৃবি। তোমাকে জানিয়ে রাখি। তোমার কৃষিবিদ এখন পুরোদস্তুর ‘নিউজম্যান’। সরি, রাঙামাটি। কাজের জন্য তোমার মায়া ছেড়ে আমি এখন ইট-পাথরের ঢাকায়।

লেখক : জাহেদুল আলম রুবেল
সিনিয়র সাব এডিটর, কালের কণ্ঠ, ঢাকা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

সংকটে হাঁসফাঁস পাহাড়ে প্রাথমিকের ১৯ ছাত্রাবাস

পার্বত্য রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বিলাইছড়ি ইউনিয়নের নতুন পাড়ার বাসিন্দা অম্বামণি ত্রিপুরা। দুর্গম এলাকায় পড়াশোনার সুবিধা …

Leave a Reply