নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » পার্বত্য ‘শান্তি’চুক্তি নিয়ে নানামুনির নানা মত

পার্বত্য ‘শান্তি’চুক্তি নিয়ে নানামুনির নানা মত

Untitled-2১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। এই দিন সাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। অবসান হয় দীর্ঘ দুই দশকের সশস্ত্র লড়াইয়ের। চুক্তির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে গেরিলা সংগঠন শান্তিবাহিনীর ১৯৬৭ জন সদস্য। দীর্ঘসময় ধরে প্রতিবেশি দেশ ভারতে উদ্বাস্তু হিসেবে থাকা মানুষগুলোও ফিরে আসে নিজ জন্মভূমিতে। অন্তরালের রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিও প্রকাশ্যে আসে চুক্তি সাক্ষরের মধ্য দিয়ে। শুরু করে চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন। পাশাপাশি চুক্তির বিরোধিতা করে গড়ে উঠে ইউপিডিএফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন নামের আরো দুটি সংগঠন। আবার মূলধারার রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত শুরু থেকেই চুক্তির বিরোধীতা করে আসছে।
পার্বত্য চুক্তির ১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম কথা বলেছেন চুক্তির বিভিন্ন পক্ষগুলোর সাথে নীচে তাদের অভিমত তুলে ধরা হলো।

zq
মোঃ মুছা মাতব্বর,সাধারন সম্পাদক
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা

মোঃ মুছা মাতব্বর,সাধারন সম্পাদক,রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগ
জননেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টার কারণে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির অধিকাংশ ধারাও ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন হয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে,বেশ কিছু ধারা বাস্তবায়নাধীন আছে। আর ভূমি সমস্যা কেন্দ্রীক কিছু ধারা সমাধান নির্ভর করছে ভূমি কমিশনের কার্যক্রমের উপর। চুক্তি বাস্তবায়নে সকল পক্ষের সহযোগিতা দরকার। আওয়ামী লীগ চুক্তি সাক্ষর করে,চুক্তি বাস্তবায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে নিজেদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছে। চুক্তির অন্যান্য পক্ষ যারা নিজেদের চুক্তির পক্ষ মনে করে,তাদেরও আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা প্রমাণ রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়।

zw
মোঃ শাহ আলম
সাধারন সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।

মোঃ শাহ আলম,সাধারন সম্পাদক,রাঙামাটি জেলা বিএনপি

পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের বাঙালীদের কোন লাভ হয়নি। এই চুক্তিতে বাঙালীদের স্বার্থ সংরক্ষন না করায় শুধুমাত্র পাহাড়ীরা উপকৃত হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধীতা করে আসছি। আমরা মনে করি,এই চুক্তির মাধ্যমে গত ১৬ বছরেও পাহাড়ে শান্তি আসবেনা। চুক্তিতে একটি পক্ষকে ব্যাপক সুযোগ সুবিধা দেয়ার পরও এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস,অপহরণ,চাঁদাবাজি বহাল তবিয়তে চলছে।
চুক্তির কারণে পাহাড়ী বাঙালি সম্পর্ক আরো অবণতি হয়েছে মন্তব্য করে এই বিএনপি নেতা বলেন,আগামীতে আমরা ক্ষমতায় আসলে চুক্তির বিতর্কিত ধারা সংশোধন এবং চুক্তির নেতিবাচক দিক সম্পর্কে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে অবহিত করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবো।
১৯৯৭ সালে করা শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি আসেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

zt
মাইকেল চাকমা
সাধারন সম্পাদক
গনতান্ত্রিক যুব ফোরাম
মুখপাত্র,ইউপিডিএফ

মাইকেল চাকমা,মুখপাত্র,ইউপিডিএফ
পার্বত্য চুক্তি বিষয়ে নতুন করে আমাদের বলার কিছু নেই,১৬ বছর আগেও আমরা যা বলেছি,১৬ বছর পরে এসেও একই চিত্র। যেখানে চুক্তি নিয়ে চুক্তিসাক্ষরকারি সন্তু লারমা নিজেই ‘হতাশ’ এবং সরকারকে ‘প্রতারক ’ বলে অভিহিত করছে,সেখানে আমাদের আর কীইবা বলার আছে। ১৬ বছর কেনো ৩২ বছর পরেও এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি আসবেনা,পাহাড়ীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবেনা।

আমি চুক্তি গ্রহণ করিনা এটা সত্য,তবে চুক্তি বাস্তবায়নে কোন বাধা দেইনি বা প্রতিবন্ধকতাও কখনো সৃষ্টি করিনি। আমরাও চাই এই চুক্তি বাস্তবায়ন হোক। ‘অসম্পূর্ণ’ এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি আসবেনা। আমাদের ভূমি ফিরিয়ে দেয়া,সেটেলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পূনর্বাসন,সেনা শাসন প্রত্যাহার,জাতি হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ আমাদের সকল অধিকার স্বীকার করে নিয়ে নতুন আরেকটি চুক্তি বা ওই রকম কোনকিছুর মাধ্যমেই পার্বত্য সমস্যার সমাধান করতে হবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে কোথাও বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন না দাবি করে এই ইউপিডিএফ নেতা বলেন,চুক্তি বাস্তবায়নে আমরা কখনই কোথাও বাধা দেইনি।

ze
পেয়ার আহম্মেদ খান
সাধারন সম্পাদক
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।

পেয়ার আহম্মেদ খান,সভাপতি,পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন
‘আমরা শুরু থেকেই পার্বত্য চুক্তির বিরোধীতা করেছিলাম,এখনো করি। তবে এখন যেহেতু একটা চুক্তি হয়ে গেছে এবং চুক্তিটা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্যতাও পেয়েছে,তাই আমরা চাইছি চুক্তি বাতিল না হোক,অন্ততঃ চুক্তির বিতর্কিত এবং দেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ধারা সমূহ সংশোধন করেই এটা বাস্তবায়িত হোক এবং আমরা চাই এখানকার পাহাড়ী বাঙালী সবাই যেনো একসাথে মিলেমিশে বসবাস করুক।’ পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এইসব কথা বলেন পার্বত্য বাঙালীদের সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি পেয়ার আহম্মেদ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি প্রশ্নে তিনি বলেন-‘পাহাড়ে যে অবৈধ অস্ত্র আছে,চাঁদাবাজি চলছে তাতো পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার নিজেও বলেছেন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে জেএসএস-ইউপিডিএফ’ই এটা করছে। অতি দ্রুত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এইসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রন করা না গেলে পাহাড়ে সত্যিকারভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবেনা বলেও দাবী তার।

zy
সজীব চাকমা
সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি
কেন্দ্রীয় কমিটি।

সজীব চাকমা,মুখপাত্র,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি
পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র সজীব চাকমা বলেন,জনসংহতি সমিতি আশা করেছিল মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্র্ণ ভুমিকা পালন করবে। কিন্তু পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকার কার্যকরভাবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি। বিভিন্ন সময়ে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি এবং চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে এখানকার যে অবনতিশীল পরিস্থিতি তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুই হয়নি। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার কথা ছিল, ভুমি কমিশন কার্যকর করা হয়নি এবং কাজও শুরু করতে পারেনি। তবে আমরা আশা করছি এ সরকারের সামনে যে কয়দিন সময় আছে তার মধ্যে চুক্তির আলোকে ভুমি কমিশন আইনের সংশোধনীগুলো পাস করা করা হবে। চুক্তির ধারা অনুযায়ী ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি হবে। অথচ এ বিষয়টিকে নিয়ে এখনো সন্তোষজনক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সরকার বিভিন্ন সময়ে চুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে এমন বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন,এখানে ধারা বা সংখ্যা গুনে চুক্তির বাস্তবায়ন মুল্যায়ন করা যাবে না। চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোই এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। চুক্তির প্রত্যেকটি ধারাই গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো হচ্ছে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদকে কার্যকর করা। যেমন আঞ্চলিক পরিষদের কার্যবিধিমালা অনুমোদিত হয়নি। জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন না হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানসমুহ কার্যকর করা যাচ্ছেনা। নির্বাচন হওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা করা প্রয়োজন তা এখনো হয়নি। মাঝে মাঝে ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বৈঠক হলেও কমিশন এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি। এদিকে ভুমি কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন করে এ কমিশনকে কার্যকর করার উদ্যোগও নেয়া হয়নি বলে তিনি জানান। অপরদিকে,ভারত প্রত্যাগত শরনার্থীদের পুর্নবাসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তাও খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি বলে মন্তব্য করেন সজীব চাকমা।

zr
সুধাসিন্ধু খীসা
সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ( এমএনলারমা)
কেন্দ্রীয় কমিটি।

সুধাসিন্ধু খীসা,সভাপতি,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)
চুক্তি স্বাক্ষরকারী শাসকদল আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুত ভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগ এনে তারই প্রতিবাদ জানিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষনা দিয়ে সুধাসিন্ধু খীসা বলেন, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী ইশতেহারে মহাজোট ক্ষমতায় আসলে চুক্তি পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় তিন পার্বত্য জেলার তিনটি আসনেই আমরা সাধারন পাহাড়ীরা আওয়ামীলীগ প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিলাম। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। ভুমি বিরোধ নিস্পক্তি কমিশন আইন, আঞ্চলিক পরিষদের প্রবিধান প্রনয়ন করা হয়নি। তাই দশম সংসদ নির্বাচনে তার দল একক প্রার্থী দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

২ জেএসএস নেতা হত্যার প্রতিবাদে মহালছড়িতে বিক্ষোভ

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) সমর্থিত যুব সমিতির কেন্দ্রীয় নেতাসহ ২ জনকে হত্যার ঘটনার …

২ comments

  1. আমি মনে করি পার্বত্য কে জানতে হলে pahar 24.com চমতকার একটি মাধ্যম তবে অপরাপর জেলার খবর ও সামাজিক বিষয়ে যেমন পাহার,গাছ,নদি, মতস্য,মাদক এর ্পর আরও গুরুত্ব দিয়ে বেশি বেশি সংবাদ থাকলে আরও জনপ্রিয় হবে নব বিকষিত এই প্রচার মাধ্যমটি

  2. ধন্যবাদ মিঃ কামাল………….আপনাদের সহযোগিতা আর ভালোবাসাই পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর অনুপ্রেরণার উৎস………শুভেচ্ছা আপনাকে

Leave a Reply

%d bloggers like this: