নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » পার্বত্য চট্টগ্রামে বিতর্ক চর্চা : ফিরে দেখা সময়

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিতর্ক চর্চা : ফিরে দেখা সময়

পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের এক দশমাংশ আয়তনজুড়ে বিস্তৃত এই জনপদে নানা সমস্যা দীর্ঘকালের। এখানে অসির কাছে মসি দুর্বল ছিলো স্বাধীনতা পরবর্তীকালের সিকি শতাব্দীজুড়ে। এই অরণ্য জনপদে বেয়নেটের কাছে জিম্মি ছিলো যুক্তি। কিন্তু হিংসা হানাহানির সেই দিনগুলো এখন ইতিহাস। মাঝে মাঝে এখনো এখানকার সবুজ জমিন রক্তাক্ত হলেও তা মোটা দাগে পাহাড়ের কৃষ্টি, ঐতিহ্য আর বর্নাঢ্য সংস্কৃতিকে ম্লান করতে পারেনি। বহুভাষিক আর বহুজাতিক এই জনপদ তাই তার আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। পাহাড়ী বাঙালীর যুগপৎ জীবন তাই বর্ণিল সংষ্কৃতি চর্চায় সমৃদ্ধ। সমৃদ্ধ শিল্পের নানা আয়োজনের মধ্যে ক্ষুদ্র আঙ্গিকে হলেও নিজের উজ্জ্বল উপস্থিতি ঠিকই করে নিয়েছে মেধা আর মননের প্রতীক ‘বিতর্ক’।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিতর্ক চর্চার ইতিহাস ঃ

স্বাধীনতার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিতর্ক চর্চার একটি ইতিহাস পাওয়া যায়। সেই সময় অতটা জৌলুসের সাথে এই অঞ্চলে বিতর্ক চর্চা না হলেও সামান্য যে চর্চা হতো তাও এক কথায় কম নয়। ১৯৯২ সালে এই জেলা থেকে বিতার্কিকরা জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছিল। এমনকি জিতেছেও ১ম রাউন্ডে। রাঙামাটিতে বিতর্ক চর্চার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশির দশকে মাঈনউদ্দিন ভূঁইয়া, এএসএম আব্দুল কাদের, সুখেশ্বর চাকমা পল্টু এবং পরবর্তীতে নব্বই দশকের শুরুতে মোস্তফা কামাল, হাসান উদ্দিন সরকার, নাসরিন জাহান, জোবায়রা বেগম, লিতা চাকমা, শামীম আহমেদ (কাপ্তাই), মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী এবং কবির অন্যতম। এরও পরের প্রজন্মের আলোচিত বিতার্কিকরা হলেন সিফাত মুনীর, রিফাত মুনীর, মৌসুমী চৌধুরী, শৈবাল দেব রায়, ফজলে এলাহী, সাজ্জাদ হোসেন প্রমূখ। সেই সময় রাঙামাটিতে শিশু একাডেমী, এফপিএবি, রাঙামাটি ইয়ং সোসাইটি এবং সেনা মৈত্রী’র আয়োজনে প্রায়ই জমজমাট বিতর্ক অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এই রকম জমজমাট বিতর্ক ছিলো রাঙামাটির সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রাণ। তবে সেই সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বিতর্ক প্রশিক্ষন বা কর্মশালা আয়োজনের কোন ব্যবস্থা বা উদ্যোগ ছিলোনা, ফলে বিতার্কিকরা নিজ উদ্যোগেই বিতর্ক করতো। ১৯৯৩ সালে কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসন এবং কাপ্তাই রিজিয়নের উদ্যোগে সেনামৈত্রী কার্যক্রমের আওতায় উপজেলাভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। জমজমাট সেই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় কাপ্তাই উপজেলা। অথচ সেই কাপ্তাইয়েই এখন বিতর্ক চর্চা বলা চলে একেবারেই নেই। এরপর ১৯৯৫ সাল থেকেই রাঙামাটির বিতর্ক অঙ্গনে ভাটা শুরু হয়। দীর্ঘ বিরতির পর শূণ্য দশকে এসে গ্লোবাল ভিলেজ এর হাত ধরে আবার শুরু হয়েছে পাহাড়ে বিতর্ক চর্চা এবং পৃষ্ঠপোষকতা।

বিতর্ক আন্দোলন : নবরূপে যাত্রা

২০০২ সাল থেকে গ্লোবাল ভিলেজ এর হাত ধরে পার্বত্য জেলাসমূহে বিতর্ক নতুন করে আবার নব আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করে। এই সময় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জেলাসমূহে শিক্ষার্থীদের বিতর্কের প্রশিক্ষন এবং কর্মশালার মাধ্যমে এই শিল্পটির ব্যাকরণ সম্পর্কে সচেতন করার একটি প্রয়াস নেয়া হয়। রাঙামাটি শহরে অন্ততঃ পাঁচটি বড় বড় বিতর্ক কর্মশালা হয়েছে এই সময়। খাগড়াছড়িতে দুইটি এবং বান্দরবানে দুইট বিতর্ক কর্মশালা আয়োজন করা হয় গ্লোবাল ভিলেজ’র উদ্যোগে। রাঙামাটি শহরে চারটি পরিবেশ বিতর্ক উৎসব, প্রথম আলোর সহযোগিতায় তিন পার্বত্য জেলার স্কুলসমূহকে নিয়ে পার্বত্য আন্তঃস্কুল বিতর্ক কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা, দেশের প্রথম বারের মতো আয়োজিত প্রথম জাতীয় পার্বত্য বিতর্ক উৎসবসহ নানা বর্নাঢ্য আয়োজনে উচ্ছল ছিলো রাঙামাটি। বিপরীতে খাগড়াছড়ি জেলায় তিনবার আয়োজন করা হয় খাগড়াছড়ি আন্তঃস্কুল বিতর্ক কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা। খাগড়াছড়ির বিতর্ক আয়োজনের অন্যতম সেরা অর্জন ছিলো রোহিত কুমার ত্রিপুরা নামের এক বিস্ময়বালক। দূর সাজেক’র দুর্গম পাহাড় থেকে খাগড়াছড়ি শহরে পড়াশোনা করতে আসা এই কিশোর জীবনে প্রথমবার বিতর্কে নেমে যে যুক্তির প্রখরতা আর মেধার স্ফূরণ ঘটিয়েছেন, তা বিরল। আর খাগড়াছড়িতে বিতর্ক আন্দোলনটি মূলত: প্রাণ পেয়েছে সেখানকার দুই গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠক প্রদীপ চৌধুরী আর আবু দাউদ এর প্রাণান্ত প্রচেষ্টায়। একই সময়ে বান্দরবানে নানা সীমাবদ্ধতা হেতু কোন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সম্ভব না হলেও আয়োজন করা হয় একাধিক কর্মশালার। রাঙামাটির বিতর্ক আয়োজনে প্রতিবারই বান্দরবান থেকে একাধিক স্কুল অংশ নিয়েছে নিয়মিতভাবেই। মো মং শো নামের ছাত্র ইউনিয়ন করা এক তরুন নিজস্ব উদ্যোগে কিছু কাজ করেছিলেন সেখানে, যা ছিলো বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।

আলোকিত বিতার্কিকরা ঃ

গ্লোবাল ভিলেজ এর বিতর্ক সম্পৃক্ত নানা আয়োজনে বেরিয়ে এসেছে বেশ কজন ভালো বিতার্কিক। এদের মধ্যে আলমগীর, সুচিম্মিতা, মোতালেব অপু, শাকিলা, ফারজানা, তানিয়া, দেবাশীষ, আরিফা, শতদ্রু, তাশফিয়া তাসনিম, ফাহমিদা, পূরব দে’র মতো বেশ কিছু ভালো বিতার্কিক সৃষ্টি হয়েছে। যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে হয়তো আরো ভালো বিতর্ক করবে। স্থান করে নেবে বিতর্ক শিল্পে নিজস্ব অবস্থান। আর প্রতিবছরই নানা আয়োজনের ফলে সহজেই তৈরি হচ্ছে অনেক নতুন বিতার্কিক। তবে এইসব বিতার্কিকদের অনেকেই উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে যাওয়ার পর বিতর্কের সাথে সম্পৃক্ত হয়নি বা হতে পারেনি। এটি কেনো হলো, তাও একটি ভাবনার বিষয়ই বটে। পাহাড়ী শহরের দাপুটে বিতার্কিকরা কেনো বড় শহরে গিয়ে বিতর্কের স্থানে সম্পর্ক ছিন্ন করে— সেটি বেশ বিস্ময়করও বটে।

জাতীয় বিতার্কিকদের পদচারণা ঃ

বিভাগীয় শহরগুলোর পর রাঙামাটি সম্ভবতঃ একমাত্র মফস্বল শহর যেখানে দেশের অধিকাংশ জাতীয় বিতার্কিক, বিতর্ক কর্মশালা পরিচালনা করার জন্য এসেছেন। এদের মধ্যে আনিসুল হক, শামীম রেজা, রোবায়েত ফেরদৌস, আল মামুন, হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ, একেএম শোয়েব, পার্থ সনজয়, মেহেদী হাসান তামিম, মাহফুজুর রহমান মিশু, রাশেদুল আলম রাসেল, ইকবাল কবির মোজাম্মেল হোসেন সিক্ত, ইশতিয়াক রহমান, তাজুল ইসলামসহ অজস্র বিতার্কিক রাঙামাটি এসেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অনেক সেরা বিতার্কিক গ্লোবাল ভিলেজের ডাকে সাড়া দিয়ে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানে বিতর্ক কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে যেমন এসেছেন, একই সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিচারকের গুরুদায়িত্ব। পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদে বিতার্কিকরা এইসব দেশসেরা বিতার্কিকদের কাছে পেয়ে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছে সবসময়ই।

বিতর্কের পৃষ্ঠপোষক ঃ

এই অঞ্চলের বিতর্ক শিল্পের আয়োজন বা পৃষ্ঠপোষকতা একটি বড় সংকট। একসময় পরিবার পরিকল্পনা সমিতি এবং রেডক্রিসেন্ট এর বিষয়ত্তিক বিতর্ক আয়োজনকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। উন্নয়ন সংস্থা এ্যাকশন এইড’র সহযোগিতায় গ্লোবাল ভিলেজ এর দু’টি পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তঃস্কুল বিতর্কসহ নানামুখী জমজমাট বিতর্ক আয়োজন অন্যতম। এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে শিল্পিত বিতর্ক চর্চার এবং আয়োজনের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ভিলেজ—ই। আর নানা কারণেই এই অঞ্চলে কর্পোরেট ব্যবসার প্রসার না হওয়ায় বড় কোন প্রতিষ্ঠান এখানকার বিতর্ক আয়োজনে সহযোগিতা প্রদানে আজ অবধি এগিয়ে আসেনি। ফলে সৃজনশীল এই মাধ্যমটির বিকাশের দ্বার উন্মোচন বেশ কঠিন এই অঞ্চলে। একসময় দৈনিক প্রথম আলো’র সহযোগিতায় প্রতিবছর গ্লোবাল ভিলেজ পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক একটি জমজমাট বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেও পরে অজ্ঞাত কারণে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের এই আয়োজনটি কেড়ে নেয়ার চেষ্টার প্রবণতা থেকেই গত বছর কয়েক ধরে আর আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। যা পাহাড়ের বিতার্কিকদের জন্য বড় হতাশার জায়গা তৈরি করেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের কূপমন্ডুকতার মাঝে হারিয়ে গেলো সুন্দর একটি আয়োজন। এরই মাঝে খাগড়াছড়িতে একটি জমজমাট বিতর্ক আসর করে নবগঠিত খাগড়াছড়ি ডিবেটিং সোসাইটি। যা পরে নানা বাস্তবতা আর স্পন্সর সংকটের কারণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি।

পাহাড়ে বিতর্ক চর্চায় সমস্যাসমূহ ঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিতর্ক চর্চায় বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে বড় সমস্যা হলো স্পন্সর বা পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। আর্থিক বিষয়ে তেমন কেউ সহযোগিতা না করায় এই অঞ্চলে বিতর্ক চর্চা এখনো পিছিয়ে আছে। আর বিতর্কের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এখানে বেশ সাবধানী হতে হয়। সারাদেশে চলমান নানা ইস্যূতে রম্য বিতর্ক বা বারোয়ারি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হলেও এখানে বিষয় নির্বাচনে আয়োজকরা সবসময়ই একটা চাপে থাকেন। নানা গোষ্ঠী এবং পক্ষকে সন্তুষ্ট রেখেই নির্বাচন করতে হয় বিতর্কের বিষয়ও। আর ভৌগলিক দুর্গমতার কারণে জেলাভিত্তিক আয়োজনগুলোতেও অধিকাংশ উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় জনপ্রিয় এই শিল্পটিকে প্রান্তিকে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাহাড়ে থেমে নেই বিতর্কের আয়োজন বা বিতর্কের পৃষ্ঠপোষকতা। সবুজ পাহাড়ে যুক্তির আলো ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি ক্ষুদ্র আঙ্গিকে হলেও চলছে, হয়তো চলবেও। নষ্ট এই সময়ে বিতর্ক ও বিতার্কিকরাই, এই দেশে আলো ছড়াবে আর সেই আলোয় ঝলমলে নবীন প্রজন্ম আরো উদ্যমী হয়ে, নিজের মেধাকে আরো শাণিত করে দেশ গড়ার লড়াইয়ে যোগ্যতর যোদ্ধা হিসেবেই অংশ নিবে এমন প্রত্যাশাই সবার।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply