নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » পাথেয় হোক এম এন লারমার পথ

পাথেয় হোক এম এন লারমার পথ

web-01মানুষের জন্ম হলে মৃত্যু অনিবার্য। তবে এমন কিছু মানুষের জন্ম মৃত্যু আসে যা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা রাখে। তেমনই একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। যিনি এমএন লারমা নামেই বেশি পরিচিত। এমএন লারমার জন্ম ও কর্মময় জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরনিপীড়িত নির্যাতিত আদিবাসী মানুষকে জাগিয়ে তুলে শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ে সচেতন করেছিলেন। আর তাঁর মৃত্যুর যে ক্ষত তা কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়।
আজ ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩০ তম মৃত্যু বার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত এ নেতা আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বে অপর আট সহকর্মীসহ নিহত হন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা এ দিনটিকে জুম্ম জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
এমএন লারমা’র রাজনৈতিক জীবন :  ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তরাঞ্চল আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরআগে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন।
এমএন লারমা কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষিত ছাত্র যুবকদের সংগঠিত করে ‘গ্রামে চলো’ শ্লোগানকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও আদিবাসীদের শিক্ষায় মনোনিবেশ করার উদ্যোগ গ্রহণে আহ্বান জানান। তিনি নিজেও ১৯৬৬ সালে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে ১৯৬৯ সালে এল এল বি পাশ করার পর চট্টগ্রাম বার কাউন্সিলে যোগদান করেন। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সংবিধান প্রণয়কালে এমএন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চলের মর্যাদা দেওয়ার দাবি ও পাহাড়িদের বাঙালি হিসেবে জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু সংবিধান প্রণয়ন কমিটি তাঁর দাবি ও প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে। এসব দাবি আদায়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। তিনি হন সমিতির সাধারণ সম্পাদক। পরে ১৯৭৩ সালে জনসংহতি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটলে এমএন লারমা পাহাড়ি ছাত্র যুবকদের নিয়ে আত্মগোপনে যান। আত্মগোপন অবস্থায় নিজ দলের বিভেদপন্থী একটি অংশের হাতে এমএন লারমা নিহত হন। দাবি আদায়ে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তুললেও এমএন লারমা সব সময় চেষ্টা করেছিলেন আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান। সেই পথ ধরে ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে সই হয় পার্বত্যচুক্তি। যা পরবর্তীতে পার্বত্য শান্তিচুক্তি নামে পরিচিতি পায়। পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে এমএন লারমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথের দেখা পেলেও শাসকগোষ্ঠীর নানা ছলচাতুরিতে তা হচ্ছে না। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদ আবার অশান্ত হয়ে ওঠার আশংকা দেখা দিয়েছে।

এমএন লারমার আদর্শ : এমএন লারমা পারিবারিক গন্ডি থেকে গণতান্ত্রিক ভাবধারার অধিকারী। ছাত্র জীবন থেকে সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তাঁর অনেক সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি ছিলেন সব জীবের প্রতি সহানুভূতিশীল ও প্রকৃতিপ্রেমী। ছিলেন পরিবেশ প্রতিবেশ সচেতন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের যে গভীর অরণ্যে আত্মগোপনে ছিলেন তার আশপাশ এলাকা ছিল বনের পশুপাখির অভয়ারণ্য। তিনি সহকর্মীদের কোনো অবস্থাতে বন্য পশুপাখিদের বিরক্ত বোধ হবে এমন আচরণ করতে বারণ করতেন।
এমএন লারমা ছিলেন খুবই অধ্যাবসায়ী। সব সময় থাকতেন পড়াশোনায় নিমগ্ন। এমএন লারমার সহপাঠী বাঘাইছড়ি তুলাবান এলাকার বাসিন্দা বিনয় কুমার খীসা একবার আমাকে জানিয়েছিলেন, পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের পাথরঘাটার পাহাড়ি হোস্টেল থেকে যখন এমএন লারমাকে গ্রেফতার করা হয় তখনও হাতে ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলী’। আর প্রয়াত সংসদ সদস্য চাইথোয়াই রোয়াজার কাছ থেকে জানতে পেরেছি, জাতীয় সংসদ সদস্য থাকার সময় এমএন লারমাকে সব সময় খুঁজে পাওয়া যেত জাতীয় সংসদ লাইব্রেরিতে।
একটি জাতিকে সচেতন করে তুলতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জরুরি তা হল শিক্ষা। সেটিই প্রথম করেছিলেন এমএন লারমা। সে কারণে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পরবর্তী সময়ে ছাত্র যুবকদের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও শিক্ষক হিসেবে আত্মনিয়োগ করার নির্দেশনা দিয়েছিলন। তিনি নিজেও বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা পেশা। মূলত সেই সময় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের শিক্ষার বিস্তার শুরু হয়েছিল।
এমএন লারমা ছিলেন মহান মনের মানুষ। তিনি সবাইকে বিশ্বাস করতেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিতে যখন অর্ন্তকোন্দল শুরু হয় তখনও তিনি কুচক্রী ও বিভেদপন্থীদের বিশ্বাস করেছিলেন। সে কারণে তিনি দলের মধ্যে ‘ক্ষমা করো ও ভুলে যাও’ নীতি প্রচার করেছিলেন। তবে মানুষের প্রতি তাঁর সেই বিশ্বাস পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নিয়ে এসেছে কলঙ্কময় অধ্যায়। তাঁরই কিছু বিপদগামী সহকর্মী এই মহান নেতার মহানুভবতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে হত্যা করেছিলেন।

জন্ম ও শিক্ষা : এমএন লারমা ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের মহাপ্রুম গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর একই কলেজে স্নাতকে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকে এম এন লারমার রাজনৈতিক জীবন শুরু। ১৯৫৭ সালে প্রথম পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনে তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ছাত্র অবস্থায় এমএন লারমা ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে এক লাখের বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হওয়াসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম শ্রেণীর আবাদি জমির ৪০ ভাগ পানিতে তলিয়ে যায়। এরপর প্রতিবাদে এমএন লারমা একটি প্রচারপত্র ছাপিয়ে ছাত্র যুবকদের মাধ্যমে বিলি করেন। প্রচারপত্র প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন সরকার ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এমএন লারমাকে গ্রেফতার করে। প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এ সময়ের মধ্যে কারাগার থেকে স্নাতক পাশ করেন।

হরি কিশোর চাকমা : স্টাফ রিপোর্টার,দৈনিক প্রথম আলো,রাঙামাটি

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: বাঙালির এক আত্মপ্রত্যয়ী রাষ্ট্রগুরু

আজ ১৭ই মার্চ ২০২০ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ দিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কেন বিশেষ তাৎপর্যবহ একথা …

Leave a Reply