নীড় পাতা » ফিচার » অরণ্যসুন্দরী » পর্যটনশিল্পে তরুণদের উদ্যোগ দরকার

পর্যটনশিল্পে তরুণদের উদ্যোগ দরকার

goutomপার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটেনি। পর্যটনশিল্পের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ অবকাঠামো এ অঞ্চলে ছিল না। তারপরও ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি হওয়ার পর স্থানীয় মানুষ নানা দিকে নতুন কিছু চিন্তা শুরু করে। তার মধ্যে পর্যটনশিল্প অন্যতম।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড় নদীর সম্মিলন, কর্ণফুলী নদীর বিশালতা, শান্ত-স্বচ্ছ জলরাশি, সবুজ পাহাড় যে কাউকে আকর্ষণ করবেই। সেটাই পর্যটনের বড় সম্ভাবনার দিক। সেই চিন্তা থেকেই আমি পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমার ধারণা, আমাদের গড়ে তোলা ‘পেদা টিং টিং’ এ এলাকার প্রথম বেসরকারি পর্যটন উদ্যোগ। তবে পর্যটনে যেভাবে বাণিজ্যিক চিন্তা করা হয়, আমি ঠিক সেভাবে চিন্তা করিনি। আমি চেয়েছি আমাদের উদ্যোগের সঙ্গে যেন স্থানীয় গ্রামীণ লোকজনের সম্পৃক্ততা থাকে। রাঙামাটির পাহাড়, নদী, ঝরনা, সবুজ বনের সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পরিচিতি ঘটানো বা ইকো ট্যুরিজমের ভাবনা ছিল আমার মনে। পেদা টিং টিং আসলে ছিল আমাদের একটি পাইলট প্রকল্প। তবে তিন বছরের মতো ভালোভাবে এগিয়ে থমকে যেতে হয়েছে।
পর্যটনশিল্পের প্রসারের চিন্তা মাথায় আসার পর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই, রাঙামাটি শহরের পূর্ব পাশে কাপ্তাই হ্রদসংলগ্ন পাহাড়ে তা স্থাপন করব। সেখানে একদিকে থাকবে পাহাড়, অন্যদিকে থাকবে নদী। রাঙামাটি শহর থেকে নৌপথে যোগাযোগও সহজ। কিন্তু যখন আমার চিন্তা নিয়ে কয়েকজন বন্ধু এবং পরিচিতজনের সঙ্গে কথা বলি, তখন অনেকে বলেছিলেন, ‘সে ঝারত যেইনে হি গত্তেগোই, হন্না যেব সিদু? সিয়ান ন’ গরিনে গম এক্কান চিন্দে গর।’ (সে জঙ্গলে গিয়ে কী করবে, কে যাবে সেখানে? সেটা না করে বরং ভালো একটা কিছু চিন্তা করো)। আমি কিন্তু তাদের কথায় দমে যাইনি। তবে দুই বন্ধু আমার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়। ওদের মধ্যে এক বন্ধু এখন আর আমাদের উদ্যোগের সঙ্গে নেই। অবশ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রথম থেকে সবটাই আমার ছিল।
যা হোক, আমাদের উদ্যোগের প্রথম দিকে পর্যটনকেন্দ্রের নাম নিয়ে অনেক চিন্তা করতে হয়েছে। কী নাম হবে সেই কেন্দ্রের? ইংরেজি, বাংলা না কোনো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার নাম? অনেক চিন্তাভাবনার পর ঠিক হলো চাকমা ভাষার ‘পেদা টিং টিং’ নামটি। প্রথম যখন শুরু করি তখন প্রায় পর্যটকেরা, বিশেষ করে দেশীয় পর্যটকেরা জিজ্ঞেস করতেন, পেদা টিং টিং নামের অর্থ কী? শব্দটি চীনা কি না। পেদা টিং টিং নামের মধ্যে একটা তৃপ্তির ছোঁয়া আছে। আমরা যখন কোনো কিছু তৃপ্তিসহকারে খাই তখন বলি ভূরিভোজ হয়েছে। চাকমা ভাষায় পেটভরে খাওয়া মানে ‘পেদা টিং টিং’। এ নামের অর্থটা শোনার পর প্রায় সবার পছন্দ হয়েছে। পেদা টিং টিং এখন রাঙামাটির বেসরকারি পর্যটনের অঙ্গনে একটি বহুল পরিচিত নাম। রাঙামাটি বেড়াতে এসে পেদা টিং টিং পর্যটনকেন্দ্রে যাননি এমন পর্যটকের সংখ্যা কম। বিদেশি পর্যটক ছাড়াও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা রাঙামাটি এলে পেদা টিং টিংয়ে যাবেন, এটা প্রায় নিশ্চিত।
অনেকে পেদা টিং টিংয়ে এসে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। অনেকে প্রশংসা করার পাশাপাশি নানা উপদেশও দিয়েছেন। আমরা তাঁদের মন্তব্যে অনেক অনুপ্রাণিত হয়েছি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পেদা টিং টিং এসে পরিদর্শন বইয়ে লিখেছিলেন, ‘এখানে আমরা ঘণ্টা দুয়েক বড় শান্তিতে কাটিয়ে গেলাম। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রন্ধনশৈলীর সঙ্গে আনন্দদায়ক পরিচয় ঘটল। আমি এই প্রতিষ্ঠানের সমৃদ্ধি কামনা করি।’
যা হোক, আমি আগেই বলেছি, আমাদের পর্যটনচিন্তা ঠিক পুরোপুরি বাণিজ্যিক নয়। অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে পেদা টিং টিং শুরু করি। আমার চিন্তা অনুসারে রাঙামাটি শহরের পূর্ব পাশে বালুখালী ইউনিয়নে কাপ্তাই হ্রদের তীরঘেঁষে পেদা টিং টিং গড়ে তুলি। সেখানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের বাড়ির আদলে কয়েকটি কটেজ নির্মাণ করি। শুরুতে ওসব কটেজে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এসে কয়েক দিন থেকে যেতেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে পেদা টিং টিংয়ের নাম বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় মোবাইল ফোন না থাকা সত্ত্বেও বিদেশি পর্যটকেরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসতেন আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে কয়েক দিন সময় কাটিয়ে চলে যেতেন। অনেক বিদেশি পর্যটক ঢাকা থেকে এসেছিলেন সি প্লেনে করে।
আমাদের পরিকল্পনা ছিল এখানে গাইড ট্যুরের ব্যবস্থা করা। পর্যটকদের গাইডের মাধ্যমে পাহাড়ে হাইকিং, কাপ্তাই হ্রদে ওয়াটার স্কিসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা করা। আশপাশের গ্রামীণ লোকজনও যেন পর্যটন থেকে আয় করতে পারে, তার ব্যবস্থা করা। শুরুতে স্থানীয় লোকজন তাদের তৈরি বাঁশ-বেতের আসবাব, কাপড় আমাদের এখানে দিয়ে যেতেন। সেগুলো পর্যটকেরা কিনতেন। এ ছাড়া অনেক পর্যটক গ্রামে গেলে তাঁদের কাছ থেকেও সরাসরি এসব কিনে নিয়ে আসতেন।
উদ্যোগ শুরুর পর প্রথম দুই-তিন বছর ভালোই চলছিল। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা ভালো ছিল। প্রচুর পর্যটক এসেছে রাঙামাটিতে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হবে এমন চিন্তা আমাদের ছিলই না। তখন বিদেশি পর্যটক এলে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা নিজেদের উদ্যোগে ব্যবস্থা নিত। এখন সে ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বিদেশিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের ওপর জারি করা হয়েছে নানা শর্ত। সেসব শর্ত পূরণ করে এলেও তাঁদের ঘুরতে হয় পুলিশ সঙ্গে নিয়ে, যা অনেক পর্যটকের জন্য অস্বস্তিকর। এখন বিদেশিরা এলে তাঁদের পেছনে পুলিশ দেওয়া হয়। তাতে তাঁরা অস্বস্তি ও বিরক্তবোধ করেন। সে কারণে কোনো বিদেশি একবার এলে আর দ্বিতীয়বার আসতে চাইবেন না। এ ব্যাপারে সরকারের একটা সুনির্দিষ্ট পলিসি থাকা দরকার।
এখন যে ব্যবস্থা চলছে, তা পর্যটনশিল্পের জন্য সহায়ক নয়। বলতে গেলে পর্যটনের দুর্দিন চলছে। এ বছরের শুরুতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে পর্যটন খাত। সেটা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারছি না।
পেদা টিং টিং শুরু করার পর খুবই কষ্ট করতে হয়েছে। আমাদের কর্মচারীসহ কারও তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। আমি নিজে প্লেট সাজিয়েছি, অতিথিদের পরিবেশন করেছি। তারপর স্থানীয় উপকরণ দিয়ে কীভাবে অতিথিদের আপ্যায়ন করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করেছি। যেমন, বাঁশের চোঙায় এবং কলাপাতায় কিছু রান্না করার পর সেই উপকরণ দিয়ে কীভাবে পরিবেশন করা যায়। রাত-দিন পরিশ্রম করে পেদা টিং টিংকে একটি সবার প্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করিয়েছি।
কিন্তু পর্যটনশিল্প শুধু ব্যক্তি উদ্যোগে প্রসার ঘটানো সম্ভব নয়। সরকারের অবশ্যই সেখানে ভূমিকা থাকা দরকার। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা বেশি। বালুখালী ইউনিয়নে বিদ্যুৎ না থাকা আমাদের ও পর্যটকদের জন্য একটা ভোগান্তি।
পর্যটন সবার ব্যবসা। একজনের ব্যবসায় পর্যটন চলে না। এখানে অটোরিকশাচালক, বোটচালক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক-শ্রমিক, হোটেল মালিক-শ্রমিক এমনকি স্থানীয় গ্রামীণ পণ্য উৎপাদকেরাও এর সঙ্গে জড়িত। পর্যটনের আয় সবার কাছে যাবে, এটা নিশ্চিত। সে কারণে সরকার বা প্রশাসনকে পর্যটকদের জন্য সুবিধাজনক, স্বস্তিকর ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কক্সবাজারে এখন পর্যটন পুলিশ গঠন করা হয়েছে। এখানেও সেভাবে করা যায়। পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটলে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় তরুণ-যুবকদের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। (অনুলিখন)
গৌতম দেওয়ান, পর্যটনশিল্প উদ্যোক্তা ও স্বত্বাধিকারী, পেদা টিং টিং পর্যটন কেন্দ্র, রাঙামাটি।

(পাহাড়ের পরিচিত জনপ্রিয় মুখ ও পর্যটন ব্যবসার পথিকৃত গৌতম দেওয়ান। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রথম ও একমাত্র নির্বাচিত সাবেক এই চেয়ারম্যান এখন ব্যস্ত নিজের ব্যবসা আর রাজনীতি নিয়ে। দৈনিক প্রথম আলো’তে প্রকাশিত তার এই লেখাটি পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো প্রথম আলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা সহ)

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জুরাছড়িতে গুলিতে নিহত কার্বারির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় স্থানীয় এক কার্বারিকে (গ্রামপ্রধান) গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারী সন্ত্রাসীরা। রোববার …

Leave a Reply