নীড় পাতা » পার্বত্য পুরাণ » পথকলি নিতাই কিংবা একজন টোকাইয়ের গল্প

পথকলি নিতাই কিংবা একজন টোকাইয়ের গল্প

বয়স আর কতোই বা হবে। সাত, আট কিংবা নয়। নাম নিতাই। শিশুকালেই বাপ মরেছে, আর মা’কে হারিয়েছে বছর দু-এক আগে। স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা এখন তার জন্যে জাদুঘরে। রাস্তার সিগন্যালে গাড়ি অথবা রিকশা থামলেই এসে হাজির হয় ছেলেটি। কখনো ফুল বিক্রি করে, কখনো ভিক্ষে করে, ফুটপাতের কাগজ কুঁড়িয়ে কিংবা হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করে কোনমতে দিন কাটে তার। দু’মুঠো ভাত আর একটুখানি নির্দিষ্ট আশ্রয়-ই যেন একমাত্র চাওয়া।
আজ গায়ে কিছুটা জ্বর জ্বর লাগছে নিতাইয়ের। ঠিক চৌকাঠের মতো একটা জায়গায় বসে পা দোলাচ্ছে সে। পড়নে তার রংচটা লাল শার্ট আর কালি লাগানো ময়লা সাদা হাফপ্যান্ট। শার্টের নিচের দিকে দুটো বোতাম খোলা, হাওয়ায় তার শার্টের নিচের অংশটুকু উড়ছিল। খুব সম্ভবত বোতামগুলো খুলে পড়ে গেছে। সন্ধ্যা হবার আগেই রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছিলো। তবে নিতাই যেখানটায় বসেছে সেখানটায় সন্ধ্যাও ঝাঁপ দেয় আগে আগে, বাতিও জ্বলে না। এবং না জ্বলাটাই নিয়মের একটা অংশ হয়ে গেছে। এইটুক বয়সের ছেলে ঠিক বুড়ো মানুষের মতোই পান চিবাচ্ছে। অবশ্য পান চিবানোর সময় নিজেকে ছাগল বলেই বোধ হয় তার। পান সে ইচ্ছে করে অভ্যাসের বশে খাচ্ছে এমনটাও কিন্তু নয়। ঔষধ কেনার টাকা নেই। কেউ একজন বলেছিল কাঁচা সুপারির পান খেলে গরম লাগে, শীত কেটে যায়। জ্বরের চোটে ঠান্ডা লাগছিল বলেই স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে পান চেয়ে নিয়েছে সে।
এই জায়গাটা নিতাইয়ের বেশ পছন্দের। মন খারাপের সময়গুলো এখানে বসেই পার করে সে। সময়ে অসময়ে এই প্লাটফর্মের সামনে দিয়েই ট্রেন আসে, যায়। সাদা গোঁফওয়ালা এক লোক এসে প্রতিদিন ঘন্টা বাজিয়ে দিয়ে যায়। ঘন্টা বাজার সাথে সাথে বাড়তে থাকে মানুষের ব্যস্ততাও। সবাই ছুটতে থাকে দ্বিগ-বিদিক। কারো হাতে স্যুটকেস, কারো হাতে লাগেজ। আবার কেউ কেউ কুলির হাতে বস্তা দিয়ে তার পেছন পেছন ছুটতে থাকে। নিতাই চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে ব্যস্ত মানুষগুলোর দিকে।
হঠাৎ এক মহিলাকে দেখে উঠে দাঁড়ায় সে। ত্রস্তপায়ে হেঁটে যায় মহিলা। তার হাতেও একটা লাগেজ, চেহারায় কিছুটা উদ্বিগ্নতা।
‘আফা, দশটা ট্যাকা দিবেন, অসুধ নিমু’ -এই বলে মহিলার দিকে হাত বাড়ায় নিতাই। মহিলা থামলেন। তার চেহারায় কিঞ্চিৎ বিরক্তি। দ্রুত ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পাঁচ টাকার নোট বের করে বাঁড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘নে, ধর’। উদাস চোখে সেদিকেই তাকিয়ে নিতাই। মনে পড়লো মায়ের কথা। ঠিক এইভাবেই মা তার মুখের দিকে এগিয়ে দিত একমুঠো ভাত।
‘কি হলো; নিবি না?’ -বিরক্তি বেড়ে যায় মহিলার। নিতাই হাত বাড়িয়ে নিয়ে নেয় ঝকঝকে নোটটি। আনন্দে ঝলমল করে উঠে তার মুখ। সবসময় এরকম ভাগ্য জুটে না তার। প্রতিনিয়তি তাকে লাথি-গুঁতো খেতে হয়। এই স্টেশনটাতে এরকম আরও শত শত ছেলে-মেয়ে আছে। মানুষ ক’জনকে দেয়। কেউ কেউ তার-ই মতো হাত পাতে, কেউ বা কাঁধে বস্তা নিয়ে কাগজ টোকায়, কখনো বা রেল লাইনে কান পেতে শব্দ শোনার চেষ্টা করে। নিতাইও যোগ দেয় তাদের সাথে, এভাবেই কেটে যায় তার দিন। রাত যখন গভীর হয়, ধীরে ধীরে কিছুটা কমে আসে মানুষের আনাগোনা। তখন এই প্লাটফর্মেই ঘুমিয়ে পড়ে সে।
আগেও অনেক মানুষই তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছে। তবে কেন যেন আজকের এই ঝকঝকে পাঁচ টাকার নোটটি পেয়ে সে বেজায় খুশি। সেই খুশি ছাপিয়ে যায় প্লাটফর্মে হাঁটতে থাকা হঠাৎ দু-একজনের লাথি-গুঁতো, মশার কামড়, কিংবা গা কাঁপিয়ে দেয়া কনকনে শীতকেও। প্লাটফর্মের এক কোণে ঘুমিয়ে পড়ে নিতাই সোনা। যেভাবে সে ঘুমাতো তার মায়ের কোলে মাথা রেখে। মা তাকে “নিতাই সোনা” বলেই ডাকতো।

বিঃ দ্রঃ- একমুঠো ভাত আর একটু নিদিষ্ট আশ্রয় এদের জন্য সূদুর পরাহত। অথচ এদেরকে পুঁজি করে বিভিন্ন এনজিও, সামাজিক সংগঠন, বিভিন্ন সংস্থা শিশু অধিকার বাস্তবায়নের নামে ফায়দা হাসিল করছে প্রতিনিয়ত। সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সাধারণ জনগণের সস্তা-বাহবা পাবার জন্য ঢাক ঢোল পিটিয়ে ভালোবেসে এদেরকে নাম দিয়েছিলেন “পথকলি”। গঠন করেছিলেন “পথকলি ট্রাষ্ট”। তবে আজ পর্যন্ত ঐ “পথকলি ট্রাষ্ট” আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু পথকলি ট্রাষ্টের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লোপাট হয়েছে কোটি কোটি টাকা। শুধু ঐ সাবেক রাষ্ট্র প্রধানই নয় সব সরকার-ই বরাবর এই পথকলিদের উন্নয়নের কথা বলে থাকেন, বিভিন্ন মিছিল মিটিং সেমিনার হয় ঐ সব ছিন্নমূল শিশুদের নিয়ে। মন্ত্রী, সচিব, নেতা-নেত্রীরা দামি দামি গাড়ি হাকিয়ে মঞ্চে এসে বক্তৃতা, বিবৃতি দেন, কমিটি গঠন করেন। কিন্তু এদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। কাজীর গরু কেতাবেই থাকে গোয়ালে নয়।
মোদ্দাকথা এ সকল অবহেলিত পথকলিদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য সরকারী-বেসরকারী এবং সামাজিক ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। এরা আমাদের সমাজেরই অংশ। এদেরকে বাদ দিয়ে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন কখনও সম্ভব হবে বলে আমি মনে করিনা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান কুজেন্দ্রের

কভিড-১৯ মহামারী উত্তরণে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর ইফতার সামগ্রী বিতরণ করেছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য …

Leave a Reply