নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » নানিয়ারচরে শক্তিমান আর সুপনের শক্তির পরীক্ষা !

নানিয়ারচরে শক্তিমান আর সুপনের শক্তির পরীক্ষা !

Soktiman-supan-cover-picরাঙামাটি শহর থেকে সড়ক কিংবা নৌপথে চলে যেতে পারেন দুর শহর নানিয়ারচরে। কিন্তু যদি গাড়ীতে কনে যান উপজেলা সদরে পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহুর্তে নেমে যেতে আপনাকে,পাড়ি দিতে হবে চেঙ্গী নদী ! প্রায় আধকিলোমিটার দীর্ঘ প্রাণহীন নদী চেঙ্গী,শুধু একটি সেতুর অভাবে যা নানিয়ারচরসহ তিনটি উপজেলাকে রাঙামাটি থেকে পৃথক করে রেখেছে সুদীর্ঘকাল। স্থানীয় সরকার কিংবা জাতীয় নির্বাচন,সবসময়ই নানিয়ারচরের অন্যতম ইস্যু এই সেতু,এবারেও ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি শেষ হওয়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই উপজেলা বিপুল ভোটের ব্যবধান ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার যে পরাজিত হয়েছেন,তারও অন্যতম কারণ এই সেতু ! রাজা যায়,রাজা আসে,কিন্তু নির্মিত হয়না প্রত্যাশিত সেতুটি।
আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাচনের সার্বিক চিত্র দেখতে সম্প্রতি নানিয়ারচর ঘুওে নির্বাচনের যে চিত্র দেখা গেলো,তাতেও ইস্যু এই সেতুটি। ভোটাররা মনে করছেন,নতুন নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সেতুটি নির্মাণে প্রানান্ত প্রচেষ্টা চালাবেন।

নানিয়ারচর উপজেলায় এবার চেয়ারম্যান প্রার্থী চারজন। এদের মধ্যে রয়েছেন ইউপিডিএফ সমর্থিত সুপন চাকমা (সুশীল জীবন),জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র কেন্দ্রীয় নেতা শক্তিমান চাকমা,আওয়ামী লীগ নেতা ধর্মেশ খীসা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী পঞ্চানন চাকমা। তবে নানিয়ারচরের স্থানীয় রাজনীতির নানান সমীকরণ আর বাঁক বিবেচনায় নিলে এবং ভোটারদের সাথে কথা বলে ভোটের যে চিত্র পাওয়া গেলো,তাতে স্পষ্ট নির্বাচনী লড়াইটা চারজনের মধ্যে নয়,মূলতঃ লড়বেন সুশীল এবং শক্তিমান’ই। ধর্মেশ কিংবা পঞ্চানন চেষ্টা হয়তো করবেন,কিন্তু কতটা হালে পানি পাবেন,বুঝা মুশকিল।

নানিয়ারচর উপজেলা পার্বত্য রাঙামাটির একমাত্র উপজেলা যেখানে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর থেকেই ইউপিডিএফ এর সবচে শক্তিশালী সাংগঠনিক এলাকা এবং এখানকার জনগণের মধ্যেও দলটির প্রভাব স্পষ্ট। ফলে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীরা বরাবরই এখানে নির্বাচিত হয়েছে নিকট অতীতে। এবারো তাদের প্রার্থী, ইউপি নির্বাচনে তাদেরই সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত সুপন চাকমা,যার অন্য নাম সুশীল জীবন চাকমা। ফলে তাকে জেতাতে মরিয়া ইউপিডিএফ,পাশাপাশি গত শনিবার সরেজমিন নানিয়ারচর ঘুরে,স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের যেভাবে তার পক্ষে প্রকাশ্যে মিছিল এবং গণসংযোগ করতে দেখা গেলো,তাতে আর তার বিজয় অনেকটা সময়ের ব্যাপার মাত্র বলে করে করছেন স্থানীয়রা। আর সুপন চাকমাও নিজের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদের কথা জানিয়ে বলেছেন,আমি জনগণের প্রার্থী,জনগনই আমাকে নির্বাচনে নামিয়েছে এবং তারাই ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে।’ নির্বাচনে প্রশাসনের ভূমিকা নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি,একই সাথে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও কোন অভিযোগ করেননি তিনি।

এডভোকেট শক্তিমান চাকমা,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)ও কেন্দ্রীয় নেতা এবং গতবারের নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত প্রার্থী। এবার জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। তবে নির্বাচন কতটুকু স্বচ্ছ ও অবাধ হবে,এনিয়ে সংশয় আছে তার। কারো বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ না করলেও তিনি বলেন, প্রার্থী এবং ভোটাররা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে পারবে কিনা এটা নিয়ে আমি শংকিত। একসময়কার অবিভক্ত জনসংহতির প্রভাবশালী এই নেতা,এবার তার মূল দলের সাবেক সহকর্মীদের প্রবল বিরোধীতার মুখে পড়বেন। কারণ সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি কোনভাবেই তিনি বিজয়ী হন,তা চাইছেনা। এই উপজেলায় তাদের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভীত না থাকলেও তাদের যে হাজারদেড়েক ভোট আছে,সেটাকে তারা শক্তিমানের বিপক্ষেই ব্যবহার করবে,এটা পরিষ্কার। এটাও শক্তিমান চাকমার জন্য মাথাব্যাথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবুও নানিয়ারচরের সন্তান হিসেবে এলাকার মানুষের সহানুভূতি আর স্বজনদের ভোট তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠলে তিনিও হয়ে উঠতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

ধর্মেশ খীসা,এই উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী। মাত্র মাসাধিককাল আগে শেষ হওয়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেলেও এখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি ততটা ভালো নয়। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা নিজে এই এলাকার সন্তান হলেও এখানে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রবল প্রতাপে তিনিও অসহায়। সম্প্রতি দলটির উপজেলা কমিটির সভাপতি ত্রিদিব কান্তি দাশ নিজেই অপহৃত হয়ে মুক্তির পর এখন রাঙামাটিতেই কাটাচ্ছেন বেশিরভাগ সময়। ফলে আসন্ন নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

নির্বাচনে এই উপজেলার চেয়ারম্যান পদে আরেক প্রার্থী পঞ্চানন চাকমা। একসময় ইউপিডিএফ এর সমর্থন নিয়ে সদর ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে যোগ দিয়েছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি(এলডিপি)তে। বিএনপির দাবি,তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থি হিসেবে তিনি দাঁড়ালেও এখনো এলাকায় গণসংযোগ করছেন না তেমন একটা। শোনা যাচ্ছে, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি ও বিএনপি তাকে নীরবে মৌন সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারপক্ষে মাঠে দেখা যাচ্ছেনা,দল দুটির কোন নেতাকর্মী বা সমর্থককে। তবে পঞ্চানন সমর্থকদের দাবি,তিনি প্রকাশ্যে সবখানে গণসংযোগ করতে না পারলেও বিএনপি ও জনসংহতির নীরব ভোটাররা ভোটের দিন ব্যালটের মাধ্যমে তার পক্ষেই রায় দিলে,তিনিই নির্বাচিত হবেন। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাকে অতটা বিবেচনায় নিচ্ছেন না।

সার্বিক বিবেচনায় শেষাবধি নানিয়ারচর উপজেলায় ভোটের লড়াইটা সুপন ও শক্তিমানের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে,এইদুজন প্রার্থীর মধ্যেই ভোটের লড়াই জমে উঠেছে ইতোমধ্যেই। তবে বাকী দুই প্রার্থীও যে খুব একটা ছেড়ে কথা বলবেন না,তা স্পষ্ট। শেষাবধি ভোটের ফলাফল কি হয়,তা জানতে তাই অপেক্ষা করতে হবে ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা পর্যন্ত।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জনপ্রিয় হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে …

Leave a Reply