নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » নতুন দিনের প্রত্যাশায়

নতুন দিনের প্রত্যাশায়

একটি উন্নত জাতির অবশ্যই সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থাকে। ইতিহাস ঐতিহ্য ছাড়া একটি জাতিকে কল্পনা করা যায় না। কোন জাতির ঐতিহ্যই রূপ পায় তার সংস্কৃতিতে। একটি জাতির সচেতন অংশই ইতিহাস—ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে রাখে নানা ভাবে। সেটি লেখ্যরূপ ভাবে হোক বা অন্য কোন উপায়ে হোক।
বিশ্বের নানা প্রান্তের ইতিহাস ঐতিহ্য জানতে হলে আমরা বৃটিশ মিউজিয়াম বা বৃটিশ লাইব্রেরীর মুখোমুখি হই। কারণ বৃটিশরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত শুধু শাসন করেনি তারা সেই সাথে সেসব অঞ্চলের ইতিহাস—ঐতিহ্যের উপাদানগুলো নিয়ে গিয়ে বৃটিশ মিউজিয়ামে বা লাইব্রেরীতে সংরক্ষণ করে রেখেছে। কতো দূরদর্শীসম্পন্ন জাতি হলে এটা সম্ভব তা কল্পনা করতেই অবাক লাগে।
প্রাণের উৎসব বিজু (চাকমা ভাষায় বিজু, মারমা ভাষায় সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসুক) আসলে পাহাড়ের মানুষ অতীতের ইতিহাস নিয়ে নষ্টালজিক হয়ে পড়ে। অতীতকে খোঁজার চেষ্টা করে। তাদের এই খোঁজার চেষ্টা, চেতনা দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতার কারণে কখনো বাস্তব রূপ পায়নি। ফলে অতীত ইতিহাস অধরাই থেকে যায়।
একমাত্র অবহেলা ও অজ্ঞানতার কারণে আমরা শত বছরের পুরনো স্মৃতি হারিয়েছি নিমেষেই। ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর রাঙামাটির চাকমা রাজবাড়ি আগুনে পুড়ে দু—এক ঘন্টার মধ্যে শতাধিক বছরের পুরনো সম্পদ, দলিল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই অমূল্য সম্পদ শত কোটি টাকা দিয়েও এখন পুরণ করা সম্ভব নয়। চাকমা রাজ বংশের অতীতে প্রতাপশালী রানী কালিন্দীর ব্যবহৃত হাতির দাঁতের তৈরী চেয়ার সেই আগুনে পুড়ে যায়।
পাহাড়ের মানুষ এখন অনেক দূর এগিয়েছে। কি শিক্ষায়, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, আন্দোলনে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল হিসেবে এসেছে ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি। নানা কারণে এ চুক্তিটি এখন অবহেলার আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তারপরও বলবো, এ চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকেও শক্তিশালী করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের মানুষের কল্যাণে, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সংরক্ষণে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। নানা উদ্যোগ নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে তাদের। এর জন্য প্রয়োজন শুধু মেধা ও সদিচ্ছা।
রাঙামাটির চাকমা রাজবাড়ি পুড়ে যাওয়ার পর অনেকে হা হুতাশ করেছেন। আগুনে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তার জন্য অনেককে ব্যথিত হতে দেখেছি। মানুষের এই প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক। কারণ পাহাড়ের মানুষ যে জীবন যাত্রায় অভ্যস্থ, যে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বসবাস করছে তাতে ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজসহ প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ করবে আশা করাই যায় না। একমাত্র তিন সার্কেল প্রধানের দপ্তরে বা রাজবাড়িতে সেই সব মহামূল্যবান দলিলগুলো সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই রাজবাড়ির ঐতিহাসিক মহামূল্যবান সম্পদগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া জরুরী। এক্ষেত্রে সবার আগে এগিয়ে আসতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে আমি মং সার্কেলের মানিকছড়ির রাজবাড়ির কথা উল্লেখ করতে চাই। বলাবাহুল্য তিন সার্কেল প্রধানের মধ্যে মং সার্কেলের সম্পদ ও সমৃদ্ধি অতীতে অন্য দুই রাজাদের (চাকমা ও বোমাং) চেয়ে বেশী ছিলো। মং রাজাদের নানা ঘটনা পরিক্রমায় বর্তমানে মং সার্কেলের রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নবম মং রাজা সাচিং প্র“ চৌধুরী। তার বাবা পাইহ্লা প্র“ চৌধুরী রাজার দায়িত্ব পাবার পর খাগড়াছড়ি জেলা সদরে নতুন রাজবাড়ি স্থাপন করেন। মানিকছড়িতে থেকে যায় পূর্বের রাজবাড়ি ও ধন সম্পদ। মানিকছড়ির মহামুনিতে সুদৃশ্য রাজবাড়িতে এখনো রয়েছে মং রাজাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রসহ মহামূল্যবান সম্পদ। এই মহামূল্যবান সম্পদগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এসব সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে।
আমাদের অতীত ইতিহাসের কালের সাক্ষী হয়ে আছে রাজবাড়িতে সংরক্ষিত বিভিন্ন দলিল, ধন—সম্পদগুলো। এগুলো সম্পর্কে পাহাড়ের মানুষদেরও খুব বেশী জানাশোনা নেই। আমার প্রস্তাবনা হলো— পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় তিন সার্কেল প্রধানের সাথে আলোচনা করে, প্রয়োজনে চুক্তি করে এগুলোর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। আমি মনে করি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ই এগুলোর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান। রাজবাড়ি কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় যদি একটি সমঝোতায় আসতে পারে, পরবর্তীতে সেসব দলিল ও সম্পদগুলো জনগণের সম্মুখে উন্মুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাহাড়ের মানুষ তখন তাদের অতীতের ইতিহাস, ঐহিত্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
এই দ্বার যখন উন্মোচন করা হবে পাহাড়ের মানুষ তখন পাবে এক নতুন জগত। যেখান থেকে তারা তাদের অতীতের ইতিহাস জানবে, বুঝবে, নিজেদের মূল্যায়ন করতে পারবে। আমি সেই দিনটির প্রতীক্ষায় আছি …

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply