নীড় পাতা » প্রবাসে পাহাড়ের মুখ » দুবাইয়ে একজন ‘টিটু বাঙালী’

দুবাইয়ে একজন ‘টিটু বাঙালী’

titu-01সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই ভেসে আসে তার কোন না কোন পোস্ট,কোনটায় নিখুঁত মানবিক কোন আহ্বান,কখনো হাস্যরসময় কোন স্ট্যাটাস,আবার কখনো কখনো নিজের মা, স্ত্রী কিংবা সন্তানকে নিয়ে আবেগঘন কোন পোস্ট। সবমিলিয়ে পার্বত্য রাঙামাটিবাসির কাছে ফেসবুক ব্যবহার করেই ব্যাপক পরিচিত,জনপ্রিয় এবং চেনামুখ হয়ে উঠেছেন একজন টিটু বাঙালী। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো,দরিদ্র কিংবা অসুস্থ মানুষকে সহায়তা অথবা বিপন্ন কারো কারো পাশে দাঁড়িয়ে তিনি স্থাপন করেছেন অনন্য নজির। সর্বশেষ রাঙামাটির শহরের তরুণপ্রাণ আয়মনকে বাঁচাতে তার পদক্ষেপ,উদ্যোগ এবং চেষ্টা নাড়িয়ে দিয়েছে বিবেকবান মানুষের হৃদয়। শুধু মানবিক কাজই নয়, রাতদুপুরে হঠাৎ বিপন্ন কোন মানুষ, পরিচিত স্বজন কিংবা বন্ধুকে ফোন করে চমকে দিতেও জুড়ি মেলা ভার এই ছেলেটির।

titu-02কে এই টিটু বাঙালী ?
রাঙামাটি পৌরসভার সাবেক মেম্বার কৃঞ্চ কান্ত দে ঝুন্টু এবং অনিমা রাণী দে’র ৩ ছেলে এবং ৩ মেয়ের সংসারে ৪র্থ সন্তান টিটু কুমার দে। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ দুরন্ত আর দুষ্ট হিসেবেই রাঙামাটি শহরের মাঝিরবস্তি এলাকায় খ্যাতি ছিলো টিটু। ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত টিটু জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে। রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং রাঙামাটি পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯৫ ব্যাচের ছাত্র টিটু,রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু আট বছর আগে বাস্তব কিছু পরিস্থিতি আর জীবনের প্রয়োজনেই প্রবাস জীবনে দুবাই যেতে হয় তাকে। সেখানে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকেন এবং একটি বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন টিটু,নিজের শ্রম,মেধা আর দেশপ্রেম দিয়ে। স্ত্রী নেহা আর একমাত্র পুত্র রাঙামাটির লেকার্স পাবলিক স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র আদিত্য কুমার দে অর্ণব’কে নিয়ে তার সুখের সংসার।

ttitu-03
প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে টিটু

নামের সাথে ‘বাঙালী’ কেনো ?
সোমবার রাতে মোবাইল ফোনে টিটুর কাছে জানতে চাওয়া হয়,কেনো নামের সাথে ‘বাঙালী’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন তিনি। জবাবে হাসতে হাসতে টিটু বলেন, আমি আসলেই চাইনা,নামের মধ্য দিয়েই কেউ আমাকে হিন্দু বা মুসলিম কিংবা অন্য ধর্মের মানুষ ভাবুক। আমার কাছে আগে মানবতা। আমরা প্রত্যেকেই যে যার ধর্ম পালন করবো, কিন্তু মানবতাবোধওকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। আর আমি রক্তে মাংসে একজন বাঙালী, আমার নামের মধ্য দিয়ে যদি একজন বিদেশীও আমাদের জাতির নাম জানে,তাতেও আমি খুশি,তাইতো আমি ‘টিটু বাঙালী’।

titu-07
টিটুর তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু জাহাঙ্গীর-বাবলা এবং স্বপন……টিটুর হয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ করছেন

titi-04কেনো এসব মানবিক কাজ ?
টিটু বলেন,কোন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ কিংবা অন্য কোন কারণে নয়, আমি শুধুই আমার মনের স্বস্তির জন্য,মনের আনন্দের জন্য সামাজিক নানা কাজ করে যাচ্ছি,মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি। আমার বিশ্বাস, আমরা সবাই যদি,অসহায় বিপন্ন দরিদ্র কিংবা অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াই,তবে নিজের এলাকার অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তিনি বলেন, দেখেন, আমার কিন্তু খুব বেশি অর্থ নাই,হয়তো অন্য অনেকের চেয়ে ভালো আছি,কিন্তু শুধুই আন্তরিকতার কারণে আমি মানুষের পাশে দাঁড়াই,আমি চাই আমার মতো সবাই দাঁড়াক।

titu-06
টিটুর প্রিয় একমাত্র সন্তান আদিত্য বাবার দেয়া কম্বল দেয়ার পর পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সাথে

স্বপ্ন দেখেন ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী টিটু কুমার দে অথবা টিটু বাঙালী, বিশ্বাস করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক গনতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,সেখানে কোন ধরণের সাম্প্রদায়িক বিভেদ,জাতিগত সংঘাত থাকতে পারেনা। তিনি বিশ্বাস করেন, এসব অপশক্তিকে নিমূল করে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে অসাম্প্রদায়িক শান্তির দেশ হিসেবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

স্বপ্নে আর মননে ‘শুধুই রাঙামাটি ’
টিটু বলেন, আমি একা পুরো বাংলাদেশ কিংবা পুরো রাঙামাটির কিছুই পাল্টাতে পারবো না,সম্ভবও নয়। কিন্তু আমি জানি, আমি কিংবা আপনি,কিংবা কোন একজন ব্যক্তি চেষ্টা করলে এবং আশেপাশের সবাই আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলে একটা শহরকে পাল্টানো সম্ভব। আমি তাই আমার শহর রাঙামাটিকে নিয়েই ভাবি। আমার শৈশব,কৈশর আর যৌবণের দুরন্ত ভালোলাগা আর ভালোবাসার শহর রাঙামাটিকে নিয়েই আমার সব ভাবনা,সব কাজ, সব উদ্যোগ,সব স্বপ্নও।

titu-08
স্বামী টিটুর মানবিক কাজে যখন শরিক স্ত্রী নেহাও

টিটুরা বেঁচে থাক অনুপ্রেরণা হয়ে
টিটুর নানান স্বপ্ন আর কাজে সবসময় সহযোগিতা করে থাকেন তারই বন্ধু জেলা ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার। জাহাঙ্গীর টিটুর কথা বলতে গিয়ে বলেন, আমি মাঝে মাঝে অবাক হই,দুর পরবাসে থেকেও এতো প্রাণশক্তি কোথায় পায় টিটু। মানুষের জন্য কিছু করার প্রবণতা,মানুষের দু:খ কষ্ট আর বেদনায় তার হাহাকার,কান্না আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমাদের দেশে এরকম কয়েকশ টিটু থাকলেই দেশটা বদলে যেতো।

titu-05
টিটুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘দারিদ্রতা আমরা করব জয়’র পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ করছে তার বন্ধু রোমান-বাবলাসহ অন্যরা

টিটুর ছেলেবেলার বন্ধু ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফিরোজ আল মাহমুদ সোহেল বলেন, আমি ওকে নিয়ে গর্ব করি। কারণ আমরা একই এলাকায় একসাথে হেসে খেলে বড় হয়েছি, আবার একসাথে ছাত্রলীগের রাজনীতিও করেছি। রাঙামাটির প্রতি তার আবেগ,ভালোবাসার প্রমাণ দেশে থাকতেও বারবার সে দেখিয়েছে,বিদেশে গিয়ে তার আরো বেশি যে বেড়েছে,তারই প্রমাণ দেখি প্রতিনিয়তও। ওর কার্যক্রমকে আমি বন্ধু হিসেবে ‘স্যালুট’ জানাই।

স্বপ্ন তার ইউরোপ ঘুরার

ইতোমধ্যেই ৫/৬ দেশ ঘুরা, টিটু স্বপ্ন  দেখেন একদিন ইউরোপ ভ্রমণের। বলেন, ভ্রমন আমার নেশা,ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে চেষ্টা করি একটু ঘুরে বেড়াতে। পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর সেলফি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী টিটো জানান, ছবি তোলা,ভিডিও করা এবং তা ফেসবুকে আপলোড করে অন্যদের দেখানোর মাধ্যমে উৎসাহিত করেও মজা পাই আমি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

প্রেমিকের সঙ্গে বিয়েতে পরিবারের অসম্মতি, অতপর…

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় মুবিনা আক্তার নয়ন (১৬) নামের এক তরুনী গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে …

3 comments

  1. Symbol of the Rangamati (Bangladesh)… টিটু বাঙালী

  2. টিটু বাঙালী একজন অসাধারন ভালো ও সুন্দর মনের মানুষ।তার উত্তরোত্তর সফলতা করি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: