নীড় পাতা » পাহাড়ের অর্থনীতি » থমকে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিল্প সম্ভাবনা : প্রশাসনিক উদ্যোগ নেই

থমকে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিল্প সম্ভাবনা : প্রশাসনিক উদ্যোগ নেই

bsic-shilpa-nagariবাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সবচে বেশি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় জেলা রাঙামাটি। এই জেলায় কিছু সমস্যার কথা বাদ দিলে অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক এবং পর্যটন সম্ভাবনা অপরিসীম। এইসব সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সংশয় ব্যাপক আলোচনা ,গবেষনা হয়েছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি বা হতে পারেনি নানা সীমাবদ্ধতা আর সংকটের কারণে।
এখানকার উৎপাদিত ফসল (আনারস, কাঁঠাল, লিচু, কলা, আমলকী, পেঁপেঁ, তরমুজ, কাজু বাদাম, আদা, হলুদ)সহ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল নির্ভর শিল্প (যেমনঃ জুস কারখানা ,ফুড প্রসেসিং কারখানা,হিমাগার,আচার কারখানা,জেলীর কারখানা,)স্থাপন করার জন্য বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে,পরিকল্পনা হয়েছে কিন্তু বা বাস্তবায়নে নেয়া হয়নি কোন কার্যকর উদ্যোগ।
বিশাল বিস্তৃত জেলা রাঙামাটি জেলা গবাদী পশু পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী এখানকার ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান ও জলবায়ু। স্থানীয় দরিদ্র উদ্যোগী মানুষদের সহজশর্তে লোন প্রদান এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করার পাশাপাশি এর বিক্রিও বাজারজাত নিশ্চিত করে ব্যাপকভাবে এখানে ডেইরী এবং পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশ সম্ভব বলে মনে করেন এখানকার শিল্প উদ্যোক্তরা।
পর্যটন শহর হিসেবে রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে কাজে লাগিয়ে এখানে প্রযুত্তি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ‘আইটি ভিলেজ’ স্থাপন করা যেতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই । সুবিশাল কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এখানে স্থাপিত হতে পারে মৎস নির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান, মৎস জাতীয় খাদ্য এবং মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিদেশেও রপ্তানী হতে পারে। বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় হ্রদ পরিচালনা করার মাধ্যমে হ্রদের আরো ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবণার দিকটি উম্মোচিত হতে পারে।
এছাড়াও এই জেলার চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে কাজে লাগিয়ে এখানে স্থাপিত হতে পারে আন্তার্জাতিকমানের পর্যটন অবকাশ কেন্দ্র। প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করে এবং বিদেশী পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা স্থাপন করে এখানকার পর্যটন শিল্প হতে পারে একটি বড় অর্থনৈতিক আয়ের সেক্টর। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এই হ্রদকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে পর্যটন শিল্পকে যথাযথভাবে পর্যটন শিল্পের বিকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। স্থানীয় ভাবে উপজাতীয়দের হাতে বোনা কোমর তাঁত শিল্পকে আধুুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে একটি আধূনিক রূপ প্রদান করে শিল্প হিসেবে গড়ে উঠার সম্ভাবণার দিকটি নিয়ে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে । তবে এইসব উদ্যোগ সফল করতে হওে প্রয়োজন কিছু গুরুত্বপর্ণ সিদ্ধান্ত। যেমন- শিল্পোদ্যক্তাদের সহজশর্তে লোন প্রদান করতে হবে, টেলিকমিউনিকেশন এক্ষং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে, বাইরের শিল্পোদ্যক্তাদের কমমূল্যে শিল্প স্থাপনের জন্য ভূমি প্রদান করতে হবে, দা বড় একটি স্থান নির্বাচন করে ইপিজেড স্টাইলে ‘শিল্পজোন’ করা যেতে পারে, অবশ্যই স্থানীয় পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন করে ফলজ উৎপাদনসমূহ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে হবে, পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই অঞ্চলের সবচে বড় সমস্যা হলো ভূমি সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানের সবচে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হতে পারে পার্বত্য ভূমি কমিশনকে সক্রিয় করা, যেহেতু রাঙামাটির সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য মিজোরাম এই জেলার নিকটবর্তী সেহেতু এই জেলার সাথে সীমান্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনার দিকটি খতিয়ে দেখা যেতে পারে, ওয়ার হাউজ নির্মাণ করতে হবে, শিল্পোদ্যক্তাদের পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান ভূমি সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে সরাসরি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে খাস জমি কমমূল্যে বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো আরো উন্নত করতে হবে। গ্রামীণ সড়কগুলোর উন্নয়ন সাধন করে প্রান্তিক জায়গাগুলো থেকে উৎপাদিত ফসল সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, বেসরকারী ব্যাংকগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে রক্ষণশীল ব্যাংকিং নীতি পরিহার করে সারাদেশের মতো উদার ব্যাংকিং নীতি পরিচালনা করতে হবে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব খাতে খুব সহজেই শিল্প স্থাপন করা সম্ভব তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা ও হ্রদ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন-পর্যটন খাত,যোগাযোগ অবকাঠামো,মৎস খাত,স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল বাজারজাতকরণ,কাঁচামালের প্রক্রিয়াজাতকরন এবং মৌসুমী ফসলভিত্তিক শিল্প স্থাপন। তবে পার্বত্য অঞ্চলে শিল্প স্থাপনে সবচে বড় যে বাধাগুলো সামনে আসে তার মধ্যে প্রধানতম হলো -অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রান্তিক স্থান থেকে ফসল বা পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা, তৃণমূল পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন, তৃণমূল পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন,প্রান্তিক উৎপাদনকারীদের সহজশর্তে লোন প্রদান এবং উন্নত প্রজাতির সার ও বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
রাঙামাটির জেলার বিভিন্ন স্তরের শিল্প মালিক এবং উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে যেটা জানা গেলো তা খুব বেশি আশাব্যজ্ঞক নয়। তারা জানিয়েছেন, ১৯৯০-৯১সালে রাঙামাটিতে শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার দীর্ঘ ২২ বছর পরও বাস্তবায়িত হয়নি এই প্রকল্পটি । জানা গেছে ,সেই সময় শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার পর স্থান নির্বাচন করতেই সময় লাগে প্রায় ৭ বছর । এরপর স্থান নিবার্চন ,ভূমি অধিগ্রহণ ,অবকাঠামো ্উন্নয়নের জন্য সরকার থেকে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে শুরু হয় ১২ একর ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া । আর ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হওয়ার সাথে সাথে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আইনী লড়াই শুরু হলে স্থবির হয়ে পড়ে শিল্পনগরী স্থাপণের সম্ভাবনা । দীর্ঘ আইনী লড়াই ও জটিলতার অবসানের পর ২০০২ সালে পুনরায় শুরু হয় ভূমি উন্নয়নের কাজ । কিন্তুু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অত্যন্ত নীচু এই জলাভূমিটি বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানির নীচে তলিয়ে থাকে । ফলে ভূমি উন্নয়নের কাজ কখনই ধারাবাহিক ও যথাযথভাবে শেষ করা যায়নি । শিল্পনগরীর কাজের ধীরগতি ও সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়ায় হতাশ স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও শিল্পোদ্যক্তারা । তারা মনে করেন- যে নগরী স্থাপিত হতেই এত অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রিতা তার ভবিষ্যত সম্পর্কে আশাবাদী হওয়া কঠিন । তবে অনেক শিল্পোদ্যক্তাই মনে করেন পার্বত্য চট্রগ্রামের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের যে অপরিসীম সম্ভাবনা ছিলো তার পরিপূর্ণ বিকাশের স্বার্থে অনেক পূর্বেই শিল্পনগরী স্থাপন করে এর বিকাশে সহায়তা করা অপরিহার্য ছিলো । দেরীতে হলে ও বর্তমান উদ্যেগ যত দ্রুত শুরু করা যায় ততই ভাল । আর সরকারী পর্যায়ে স্থাপিত এই শিল্প নগরী বেসরকারী উদ্যেক্তাদের কতটা আগ্রহী করবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে । তবে প্রস্তাবিত ও নির্মিতব্য এই শিল্পনগরী নিয়ে আশাবাদী লোকের সংখ্যাও কম নয় ।
বাংলাদেশের শিল্প বাণিজ্যের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সম্ভাবণা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা হয়েছে,তৈরী হয়েছে নানা গবেষনাপত্র। কিন্তু আন্তরিকভাবেই এই পশ্চাতপদ জনপদটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানেরা বাস্তবভিত্তিক ও সুদূরপ্রসারী কোন পরিকল্পনা গৃহীত হয়নি,কি সরকারী পর্যায়ে,কি বেসরকারী পর্যায়ে। আমরা মনে করি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর যে সুযোগ এখনো বিদ্যমান তার সম্পূর্ণ কাজে লাগানোর মাধ্যমে বিকশিত হতে পারে এই অঞ্চলে শিল্প বাণিজ্য,যা জাতীয় অর্থনীতিতেও খুলে দিতে পারে ইতিবাচক সম্ভাবণার নতুন দিগন্ত।
এই প্রসঙ্গে রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্স এর পরিচালক মামুনুর রশীদ বলেন-পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে এখানে উৎপাদিত পণ্যের বিষেশায়িত শিল্প কারখানা স্থাপন এবং পণ্যের মান এবং গুন ধরে রাখার প্রয়াস নিতে হবে। অতীতে নানাজন নানা পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে,কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি,তাই বর্তমান সরকার যেহেতু দিনবদলের কথা বলছে,সেহেতু এই অঞ্চলের শিল্প এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকেও সর্বোচ্চ কাজে লাগানো হবে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

মাইনীমুখ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নতুন কমিটির শপথ

লংগদু উপজেলার বৃহত্তর ব্যবসায়ী সংগঠন মাইনীমুখ বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির নব নির্বাচিত কার্যকারী কমিটির সভাপতি …

Leave a Reply