নীড় পাতা » পার্বত্য পুরাণ » ত্রিপুরীদের বৈসু উৎসব

ত্রিপুরীদের বৈসু উৎসব

garaya-danc-03ত্রিপুরীদের প্রধান জাতীয় উৎসবের নাম ‘বৈসু’। আর নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকার নাম ‘ত্রিপুরাব্দ’। যা সংক্ষেেপ লেখা হয় ‘ত্রিং’। পার্বত্য চট্টগ্রাম ১১টি নৃÑজনগোষ্ঠির আবাসস্থল। এর মধ্যে ত্রিপুরা, মারমা (মগ) ও চাকমা প্রধান। ত্রিপুরীদের বৈসু উৎসবের আদি অক্ষর ‘বৈ’, মারমাদের সাংগ্রাইং উৎসবের আদি অক্ষর ‘সা’ এবং চাকমাদের বিজু উৎসবের আদি অক্ষর ‘বি’। এই তিন আদি বর্ণমালার সমন্বয় সাধন করে আধুনিককালে এ বৃহত্তম পার্বত্য উৎসবের নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈসাবি’।
‘বৈসাবি’ এখন সর্বজন স্বীকৃত উৎসব। প্রাচীন সভ্যতার দাবীদার জনগোষ্ঠি মাত্রই কোন না কোন বর্ষ পঞ্জিকা রয়েছে, যাকে অবলম্বন করে তাঁরা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি উদ্যাপন করে থাকে।
বলাবাহুল্য বাংলাদেশের আদিবাসী নামে কথিত নৃÑজনগোষ্ঠির মধ্যে ত্রিপুরা ও মারমা জনগোষ্ঠি ব্যতীত আর কারোর নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকা নেই। ত্রিপুরা ও মারমা, এক সময় শাসক জাতি ছিল। চাকমা, গারো, হাজং, বম, খাসিয়া, ¤্রাে, খিয়াং, তঞ্চঙ্গা প্রভৃতি জনগোষ্ঠির নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকা নেই বিধায়, তাঁদের কেউ কেউ ত্রিপুরাব্দ, কেউ মগাব্দ কিম্বা বঙ্গাব্দ অনুসারে নববর্ষ উদ্যাপন করে থাকে।
ইউরোপীয় ঐতিহাসিক

E, F Sandys ত্রিপুরাব্দ বর্ষপঞ্জিকা সম্বন্ধে তাঁর রচিত “History of Tripura” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “ ÒIt should be noted that, the Tripura is only ruling dynasty that has an Era of its own. It dates from 590 AD, when king Bira Raj from whom the present king is the 117  in descent, extrended his conquests beyond the Ganges. The months of the Tripura year are the same as those generally prevailing in Shakabda.
ত্রিপুরাব্দ বঙ্গাব্দ থেকে ৩ বছর এবং মগাব্দ থেকে ৪৫ বছরের প্রাচীন। ত্রিপুরা জনজাতিই ভারত উপমহাদেশের উত্তরÑপূর্বাংশের একক শাসক জাতি, যাঁদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকা রয়েছে। ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরাব্দ প্রবর্তিত হয়। মহারাজা যুঝারুপা এ পঞ্জিকা প্রবর্তক। এ বর্ষ পঞ্জিকার মাসগুলি শকাব্দের মতই।
অপরদিকে মারমা জাতির নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকা মগাব্দ বা মগী সনও প্রবর্তিত হয়েছিল বর্মা রাজ দরবার থেকে ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে। রাজা থেঙ্গা পৌক সা পৌ মগী সনের প্রবর্তক। আজও বাংলাদেশের কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বৃহত্তর সিলেট, বৃহত্তর নোয়াখালী, চট্টগ্রামের উত্তারাঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরানো প্রশাসনিক নথিপত্রে ও জমিজমার দলিল দস্তাবেজে ত্রিপুরাব্দ সনের তারিখ লিপিবদ্ধ দেখা যায়। অপরদিকে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল, খুলনা, বরিশাল অঞ্চলসমূহের পুরানো নথিপত্রে মগী সন লিপিবদ্ধ দেখা যায়।
“অনেকে বৈসু বা বৈসাবি উৎসবকে বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণ উৎসব হিসাবে অভিহিত করার প্রয়াস পান। আদতে তা সঠিক নয়। বিষুব সংক্রান্তিই হচ্ছে বৈসু বা বৈসাবি উৎসবের মুখ্য বিষয়। আধুনিককালে বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণকে যুক্ত করে বিষুব সংক্রান্তিকে তিন পর্বে ভাগ করে উদ্যাপন করা হচ্ছে”

‘বিষুব সংক্রান্তি’ কি?
সৌরবর্ষ মাত্রই ৩৬৫ দিনে তার বার্ষিক গতি সম্পন্ন করে থাকে। সূর্য্যরে ১২টি রশির ভূচক্রের পরিমাণ ৩৬৫ দিন, ১৫ দন্ড, ৩১ পল, ৩১ বিপল ও ২৪ অনুপল। ত্রিপুরাব্দ, মগাব্দ ও বঙ্গাব্দ; এই তিনটি বর্ষপঞ্জিকাই সৌরবর্ষ। সূর্য ৩৬৫ দিনে ১২ রাশি অতিক্রান্তে মীন থেকে পুনরায় মেষ রাশিতে প্রবেশ করে থাকে। এই প্রবেশকালকে ‘সংক্রান্তি’ বলে। এ দিন অতিশয় পূণ্যময় দিন বলে ‘ত্রিপুরা তন্ত্রশাস্ত্র’Ñএ বর্ণিত রয়েছে। এ দিনটিই কেবলমাত্র প্রকৃতিগত পূণ্যময় দিন বলে বিবেচিত। আমাদের দেশে সমাজ ও জাতীয় জীবনে অনেক পূণ্যময় দিন রয়েছে। তবে সেসব দিনগুলি কোন কোন মহাপুরুষের আর্বিভাব ও তিরোভাব কিম্বা ধর্মীয় আঙ্গিককে কেন্দ্র করে নির্ণিত হয়েছে। কিন্তু বিষুব সংক্রান্তি সে রকম দিন নয়। বিষুব সংক্রন্তি সার্বজনীন পূণ্যময় দিন হিসাবে আপন মহিমায় ভাস্বর। এ জন্যই ভারত উপমহাদেশের মানুষ বিষুব সংক্রান্তির দিনে সংযম ব্রত পালন করে, ধর্মীয় কার্যাদি সম্পাদন করে, দানÑদক্ষিণা করে এবং নানা মাঙ্গলিক ক্রিয়াদি করার প্রয়াস পায় পূণ্যার্জনের জন্য।
‘ভালো ভালো মুখরোচক খাদ্যের আয়োজন করা, নাচÑগান করা, আনন্দÑফুর্তি করা, হৈÑহুল্লোড় করা, নানা ঢংয়ে ও রংয়ে অনুষ্ঠানাদি আয়োজন করা বৈসু, বৈসাবি বা বিষুব উৎসবের মুখ্য বিষয় নয়। এগুলো হচ্ছে উৎসবকে বরণ করার গৌণ উপাচার মাত্র। ত্রিপুরীগণ যেভাবে প্রাত্যাহিক জীবনযাপন করে থাকে তার অর্ধেক অংশই প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বলাবাহুল্য, ত্রিপুরীগণ প্রকৃতির ছন্দে জীবনযাত্রাকে করেছে, আরও প্রাকৃতিক। আর তাই, উৎসব মাত্রই ত্রিপুরীদের কাছে সৃষ্টিশীল ক্রিয়াকর্ম। ত্রিপুরীদের বৈসু উৎসবে যে অনুষ্ঠান করার রীতি রয়েছে তার পুরোটাই প্রকৃতি জগতের রুপ ও রসের ব্যঞ্জনায় আলোড়িত। আর তাই বৈসু উৎসবের দিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানসমূহ হয়ে উঠে নির্মল ও স্বাধীন। ত্রিপুরীগণের জীবন থেকে উৎসরিত নানা পূজা পার্বণের সংস্কৃতিতে বৈসু পার্বণই সবচেয়ে আবেদনময়, মানবিকময়, সবচেয়ে বেশী মুক্ত আর বাস্তব। উৎসব মাত্রই সজীব করে, বাঁচতে সাহায্য করে। চিত্তকে করে রুচিশীল ও সৌন্দর্য্যমন্ডিত। ত্রিপুরাগণ বোধ করি বৈসু উৎসবের মধ্য দিয়েই সরলতা আর সৌন্দর্য্য, এই দু’য়ের মিলিত রুপের মধ্যে জীবন নির্মাণের প্রয়াস পায়। আর এখানেই আবহমান ত্রিপুরা জাতির লোক সংস্কৃতির উৎকর্ষতা পরিস্ফুট হয়ে উঠে”।
বৈসু উৎসবের তাৎপর্য্য ঃ
“বৈসু শব্দের অর্থ নব জন্ম। এই নব জন্ম কেবল মাত্র জীব জগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন নহে। সমগ্র প্রকৃতি পুঞ্জের জন্যও নবজন্ম বটে। সমগ্র প্রকৃতিপুঞ্জ বছরে একবার নবজন্ম লাভ করে। এবং মরেও যায়, রুপ পরিবর্তন করে। প্রকৃতিপুঞ্জ’র আয়ু ক্ষয় হয় শীতে আবার নবরুপে জাগ্রত হয় বসন্তে। আর এ জন্য বসন্তকে সজীব প্রাণের প্রতীক বলে আখ্যায়িত করা হয়। শীতে প্রকৃতি পুঞ্জের রুপ হয় বিমূর্ততে। এ জন্যই ত্রিপুরীগণ নব জন্ম প্রাপ্তির কারণে বসন্তের শেষে বৈসু উৎসব উদ্যাপন করে থাকে”।
ত্রিপুরীদের বৈসু উৎসবের তিনটি তাৎপর্য্য রয়েছে। প্রথমতঃ দিনটি পূণ্যময় দিন, দ্বিতীয়তঃ পহেলা বৈশাখ ত্রিপুরাব্দের প্রথম দিন, তৃতীয়তঃ বৈসু উৎসবের দিনে গড়িয়া পূজা ও নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। গড়িয়া কর্ম, কল্যাণ ও প্রেমের দেবতা।
ত্রিপুরীদের বৈসু উৎসব উদ্যাপিত হয় তিনদিন ধরে। পুরানো বছরের শেষ দুইদিন যথাক্রমে ২৯ চৈত্র হারিবৈসু, ৩০ চৈত্র বিসুমা এবং পহেলা বৈশাখ বিসিকাতাল।
হারিবৈসু ঃ
এ পর্বকে মুলতঃ জীবজগত ও প্রকৃতিপুঞ্জের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন পর্ব বলা হয়। তিন দিনের উৎসবে “হারিবৈসু”র দিনটি হলো গৃহস্থদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ততম দিন। এ দিনে বিশেষ শ্রদ্ধাসহকারে গবাদি পশুÑপাখির সেবা ও পরিচর্যা করা হয়। উন্নত মানের খাদ্য ও পানীয় দেয়া হয়। চন্দন পানি দিয়ে গবাদিপশুদের ¯œান করানো হয়। পুস্পমালা পরিয়ে দিয়ে, ধূপÑদীপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা ও সন্মান জানানো হয়। ত্রিপুরা “তন্ত্রসার” শাস্ত্রে নিম, আ¤্র, ডুমুর, বট ও অশ্বত্থ বৃক্ষরে পল্লবকে শান্তির প্রতীক চিহ্নিত করা হয়েছে। দূর্বাকে অমরত্বের প্রতীক, পুস্পকে ভক্তির প্রতীক এবং পানÑসুপারী দ্রব্যকে কল্যাণের প্রতীক চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেন, ঘরদোর সাজানো হয়?
ঘরদোর সাজানো হয় এ জন্যই যে, “বৈসু উৎসব”Ñর দিনগুলোতে গৃহস্থের বাড়ীতে অগুনতি অতিথির আগমন ঘটবে। পরিচিতÑঅপরিচিত, ধনীÑগরীব, দুঃখীÑকাঙ্গাল; সব ধরনের অতিথির আগম ঘটবে বিনা আমন্ত্রণে। ত্রিপুরী জনগণের তন্ত্রোক্ত বিশ্বাস “বৈসু সংক্রমণ”Ñএ ত্রিপুরেশ্বর গড়িয়া (শিব) ধ্যান ভঙ্গ করে চন্দ্রালোক থেকে মর্ত্যে চলে আসেন এবং মানুষের আশা পূরণ করে দিয়ে যান। এ জন্যে ত্রিপুরী জনগণ “বৈসু”Ñর দিনে আগত অতিথিদের শিব জ্ঞানে সন্মান প্রদর্শন করে থাকে এবং গড়িয়া নাচের আয়োজন করে থাকে। এই শিবরুপী আগত অতিথিদের “শুভেচ্ছা স্বাগতম” জানানোর জন্যই ঘরদোর সাজানো হয় পত্রপল্লব ও পুস্প সমারোহে। বৈসু উৎসবের দিনগুলোতে কোন গৃহস্থের বাড়ী পত্রপল্লব ও পুস্প সমারোহে সাজানো না হলে ত্রিপুরী জনগণ কখনও সে বাড়ীতে প্রবেশ করে না। এর কারণ হিসাবে আগত অতিথিরা ধরে নেন যে, গৃহস্থ “বৈসুঃ উদ্যাপনে অপারগ কিম্বা ভিন্নমতাবলম্বী।
বিষুমা ঃ
এ পর্বকে সংযম ও ত্যাগের পর্ব বলা হয়। এদিনে কেউ কায়িক পরিশ্রম করে না। মিথ্যা কথা বলে না। সকল প্রকার তামসিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে। কোন কিছু ছেদন করে না। মাটি কোপায় না, গাছ, বাঁশ তরুলতা ছেদন করে না। দৈহিক, মানসিক ও সামগ্রিকভাবে সাত্বিকভাব ও মঙ্গলের জন্য এ দিনে উপাসনা করা হয়। এদিনে প্রাণীবধ নিষিদ্ধ। নিরামিষ ভোজের আয়োজন করা হয়।
বিসিকাতাল ঃ
এ পর্বে মূলতঃ নববর্ষকে স্বাগতম জানানো হয়। দৈহিক, মানসিক ও জাতির সামগ্রিক মঙ্গলের জন্য পূজা করা হয়। এ দিনে প্রতিটি পরিবারে সামথ্য অনুযায়ী আমিষ খাদ্যের আয়োজন করা হয়। কাঙ্গালী ভোজের আয়োজন করা হয় এ দিনে। গুরুস্থানীয় ব্যক্তিদের ¯œান ও প্রণাম নিবেদন করা হয়।
বৈসুর বাজার ঃ
বৈসু উপলক্ষে ত্রিপুরীগণ যেভাবে কেনাÑকাটা করে থাকে তাকে বলা হয় বৈসুর বাজার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে যত বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন হোক না কেন তা বৈসুর বাজারের মতো হয় না। ত্রিপুরীগণ প্রাণের উচ্ছ্বাস ও আবেগ দিয়ে বৈসুর বাজার করে থাকে।
অতিথিগণকে আপ্যায়ন করার জন্য ত্রিপুরীগণ সামর্থ্য অনুযায়ী পিঠা, পায়েস, মিষ্টান্ন, মাংস দিয়ে চনা বিরানী ও চোলাই মদসহ নানা ধরণের উপাদেয় খাদ্য সামগ্রী আয়োজন করে থাকে। এগুলোর মধ্যে ঘন্ট ও পাঁচন প্রধান উপাচার হিসেবে বিবেচিত হয়।
নানা ধরনের বনজ ও কৃষিজ সব্জি সংমিশ্রণ করে রান্না করা হয়, নিরামিষ ঘন্ট। ঘন্টে কোন প্রকার প্রাণীজ আমিষ দেয়া হয় না। সব্জিতে প্রণীজ আমিষ দেয়া হলে সেটি ঘন্ট হয় না। হয় সব্জি তরকারী। তেল, মরিচ, কাঁচা হলুদের রস, পেঁয়াজ ও পাঁচফোড়ন মসলা দিয়ে ঘন্ট রান্না করা হয়। অপরদিকে পাঁচন রান্না করা হয় নানা ধরনের লতাÑপাতা ও কৃষিজ শাক দিয়ে। পাঁনও ঘন্ট পদ্ধতিতে রান্না করা হয়।

( খাগড়াছড়ি থেকে প্রদীপ চৌধুরী,সৈকত দেওয়ান ও ফয়সল অভির সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘উৎসব’ লিটলম্যাগের সৌজন্যে )

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জেসমিন সুরভী’র কবিতা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

অচেনা ফেরিওয়ালা হরেক রঙের স্বপ্ন ফেরি করে হাঁটছে এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম, ইটের শহর …

Leave a Reply