নীড় পাতা » আলোকিত পাহাড় » তারুণ্যের প্রভাবে রাঙামাটির রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া

তারুণ্যের প্রভাবে রাঙামাটির রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির রাজনীতিতে দিনে দিনে বাড়ছে তারুণ্যের জয়জয়কার। প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দুটি দলেই তরুণদের উপস্থিতি বাড়ছে। তবে দুইটি দলের মধ্যে তরুণ নেতাদের উপস্থিতির বিষয়ে সংখ্যাদিক্যের দিকে এগিয়ে আছে বিএনপি। এই দলের জেলা কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূলের সর্বত্রই এখন তারুণ্যের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এইসব তরুণরা দলটির অবস্থান সমৃদ্ধ করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক,যুগ্ম সম্পাদকসহ বেশিরভাগ নেতাকর্মীই তরুণ। অন্যদিকে দীর্ঘদিন প্রবীণদের দখলে থাকা আওয়ামী লীগ বিএনপির দেখাদেখি দলটিও নড়েচড়ে বসেছে। ইতোমধ্যেই জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সাধারন সম্পাদক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মুছা মাতব্বর। ধারণা করা হচ্ছে,অতিশীঘ্রই ঘোষিত জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতেও থাকবে তারুণ্যের ব্যাপক উপস্থিতি।
স্থানীয় রাজনীতিতে তারুণ্যের এই অংশগ্রহণ ও উপস্থিতির মধ্যেও নানা কারণে আলোচনায় আছেন বেশ কয়েকজন। এদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ মুছা মাতব্বর,পৌর বিএনপির সভাপতি ও পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টো,জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির,সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সেলিম, সদর থানা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরী।

মো মুছা মাতব্বর

১৯৭৮ সালে রাঙামাটি শহরের শহীদ আব্দুল আলী একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মোঃ মুছা। এরপর রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি,জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি,ভারপ্রাপ্ত সভাপতি,একাধিকবার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য থাকার পর ২০১২ সালে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক। এর আগেই তিনি নির্বাচিত হয়েছেন রাঙামাটি সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে। জেলার রাজনীতিতে তারুণ্যের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-রাজনীতিতে তরুণদের দায়িত্ব গ্রহণ যতটা বাড়বে ততই রাজনীতির গুনগত মান বাড়বে। প্রবীনের অভিজ্ঞতা আর নবীনের উদ্যোম এর যৌথ প্রচেষ্টায় রাজনীতির মান পরিবর্তন হবে,এই বিশ্বাসের কথা জানিয়ে তিনি বলেন,নবীনের অংশগ্রহণে রাজনীতি সমৃদ্ধ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন,সৎ ও দেশপ্রেমিক তরুণরা রাজনীতিতে যত বেশি এগিয়ে আসবে,দেশ ততই এগিয়ে যাবে।

সাইফুল ইসলাম ভূট্টো ঃ ১৯৮৬-৮৭ সালে রাঙামাটি পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন সাইফুল ইসলাম ভূট্টো। এরপর ১৯৮৮ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সহসভাপতি,শহর ছাত্রদলের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৯৬ সালে জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও পরে জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি,একই সময় তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে রাঙামাটি জেলা যুবদলের সম্মেলনে সভাপতি পদে নির্বাচন করে একই ভোট পাওয়া সত্ত্বেও টসে হেরে সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৭ সালে পৌর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন,বর্তমানে তিনি একইসাথে জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক। পরে পৌর নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন এই নেতা। তরুণ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন,তরুণ নেতৃত্ব রাজনীতিতে আসলে রাজনীতির গুণগত মান পরিবর্তন আসবে,তবে একই সাথে এই তরুণ নেতৃত্বকে অবশ্যই কারো লেজুড়বৃত্তির বাইরে থাকতে হবে। তরুণ নেতৃত্ব যদি অন্য কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে কাজ করে তবে তা হবে দুঃখজনক। তরুণ নেতৃত্বকে অবশ্যই নিজ নিজ দলের আদর্শ ও চেতনা বাস্তবায়নে কাজ করা উচিত মন্তব্য করেন তিনি বলেন-তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে পদের প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু তা যেনো শত্রুতায় পরিণত না হয়। তারুণ্যের সকল জয়যাত্রাকেই তিনি স্বাগত জানান বলেও জানান তিনি।

মামুনুর রশীদ মামুন ঃ বর্তমানে সদর থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মামুনুর রশীদ মামুন রাজনীতি শুরু করেন সেই স্কুলজীবন থেকে। বাবা জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গঠিত ছাত্রদলের কমিটির সভাপতি ছিলেন সেই ১৯৮৪/৮৫ সালে। এরপর ১৯৮৮ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি,৯১ সালে শহর ছাত্রদল,৯২ সালে জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি,৯৪ সালে জেলা ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক,পরে ৯৭ সালে সভাপতি,৯৮ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ২০০১ সালে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর বর্তমানে জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এবং সদর থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। পেশায় আইনজীবি এই তরুণ রাজনীতি ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত। রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে সমৃদ্ধ করতেই তরুণরা রাজনীতিতে আসছে,আসবে। তবে তরুণদের মূল্যায়ন হওয়াটা জরুরী। তবে তরুণ নেতৃত্বকে অবশ্যই প্রবীন নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। তবে যুগের চাহিদা মেটাতে তরুণদেরকে রাজনীতিতে প্রবেশকে সাধুবাদ জানাতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আকবর হোসেন চৌধুরী ঃ বর্তমানে জেলা যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আকবর হোসেন চৌধুরীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও বেশ বর্নাঢ্য। ১৯৮৯ সালে শহরের রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতির হাতেখড়ি তার। এরপর ৯১ সালে কালিন্দীপুর আঞ্চলিক কমিটির সম্পাদক,৯২ সালে বনরূপা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি,৯৪ সালে কলেজ কমিটির সাধারন সম্পাদক,৯৬ সালে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি,২০০০ সালে জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য,ও পরে সম্পাদক, ২০০৩ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি,২০০৭ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করার পর ২০১২ সালে রাঙামাটি জেলা যুবলীগের সভাপতি হিসেবে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন তিনি। একইসাথে তিনি জেলার বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত তিনি।
তরুণদের রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন,রাজনীতির মান ও এতে সাধারন জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে তরুণরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যেসব তরুণরা সামাজিক আন্দোলন ও সমাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে তারাই রাজনীতির নেতৃত্বে আসলে সামগ্রিক রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাকির হোসেন সেলিম ঃ নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে সদর থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন জাকির হোসেন সেলিম। এরপর ছাত্রলীগের জেলা কমিটির সদস্য,কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে দলের জন্য আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়ে তিনমাস এগারোদিন কারাভোগ করা এই ছাত্রনেতা ২০০৯ সালে উপজেলা নির্বাচনে রাঙামাটি সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। বর্তমানেও দলের সকল আন্দোলন সংগ্রামে মাঠের সামনের সারির এই নেতা জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। রাজনীতিতে তরুণদেও অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-রাঙামাটির রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বেশ আশাব্যজ্ঞক। তবে বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগ এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে মন্তব্য করে তিনি বলেন,দলকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য দলের সকল ক্ষেত্রেই তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এই অংশগ্রহণ যত বাড়বে ততই রাজনীতি সমৃদ্ধ হবে,দল উপকৃত হবে।

সাইফুল ইসলাম পনির ঃ রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির ১৯৮৫ সালে স্কুল কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই রাজনীতিতে আসেন। এরপর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি,১৯৮৬ সালে রাঙামাটি কলেজ ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক,৮৮ সালে শহর ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক,১৯৯১ সালে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি,২০০০ সালে জেলা যুবদলের আহ্বায়ক,২০০৩ সালে জেলা যুবদলের সভাপতি ও ২০০৯ সালে সর্বশেষ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন কওে আসছেন। পেশায় আইনজীবি এই তরুণের বক্তব্য,রাঙামাটিতে তরুণ নেতৃত্বেও ইতিবাচক প্রভাব আমরা সর্বক্ষেত্রেই ইতিবাচক দেখতে পাচ্ছি। সেই কারণে সারাদেশে সহিংস ও হিংসাত্মক নানান ঘটনা ঘটলেও রাঙামাটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এখানকার রাজনৈতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধকরণে তরুণ নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন,একসময় রাঙামাটিতেও হিংসাত্মক হানাহানির রাজনীতি হতো,এখন আর তা হয়না। কিছু কিছু অনাকাংখিত ঘটনা ঘটলেও ধীরে ধীরে তা কমে আসছে ।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

‘আওয়ামীলীগ চুক্তি করেছে, তারাই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে’

‘আওয়ামীলীগ সরকারের আগে অনেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করার চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি। উল্টো তারা পার্বত্য …

Leave a Reply