নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » ড. মানিক লাল দেওয়ানের ‘আমি ও আমার পৃথিবী’

ড. মানিক লাল দেওয়ানের ‘আমি ও আমার পৃথিবী’

HDC-303X  ExifImageTitleড. মানিক লাল দেওয়ানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমি ও আমার পৃথিবী’ পার্বত্য চট্টগ্রামকে বুঝতে,ইতিহাসকে জানতে সাহায্য করবে। যদিও ইতিহাসকে তিনি সেভাবে দেখেননি। তার জীবনের স্মৃতি  তুলে ধরতে গিয়ে ইতিহাস উঠে এসেছে। অর্ধ শত বছরে বা তারও আগের ঘটনাবলী তিনি সুন্দরভাবে  ‍তুলে ধরেছেন। ড. দেওয়ানের যে পৃথিবী তাতে বিচরণ করলে (পড়লে) আসলেই পৃথিবীর অনেক কিছু জানা যায়। তা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু বিষয়; যেগুলো নিয়ে নানা বিতর্ক আছে, থাকবে সেগুলোতে তিনি নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছেন এবং ভালো ইতিহাসবিদ যেন সেগুলো নিয়ে গবেষণা করেন তার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছেন। বইয়ের সর্বশেষ দুই প্যারায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নিয়ে কথা বলেছেন। এ সংঘাত বন্ধের আকুতি জানিয়ে বলেছেন, অহিংস পন্থা ব্যতিরেকে এ পৃথিবীতে মহৎ কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।
ড. দেওয়ান বইটির সর্বশেস প্যারায় মহামতি গেৌতমবুদ্ধের বাণী উদ্ধৃত করেছেন, ‘ লোভের চেয়ে বড় আগুন আর নেই; হিংসার চেয়ে বড় অপরাধ আর নেই; দেহের (শরীর) চেয়ে বড় রোগ বা ব্যাধি আর নেই; কিন্তু শান্তির চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর নেই।’ অতএব নিজেদের মঙ্গলের জন্য এই শান্তি বা আর্শীর্বাদ অর্জনে পার্বত্যবাসীকে বুদ্ধের উল্লেখিত অমৃতবাণী অনুধাবন ও অনুসরণ করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি বাঙালি ভূমি বিরোধ সম্পর্কে ড. দেওয়ানের মন্তব্য হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষ যোগ্য ভূমি নেই যা চাষ করে বাঙালি শরনার্থীরা ( তিনি পুনর্বাসিত বাঙালিদের বুঝিয়েছেন) বাচতে পারে। কাপ্তই ডেম সৃষ্টির পর যে সামান্য চাষযোগ্য জমি পাহাড়িদের দখলে আছে তা হাতছাড়া হলে পাহাড়িরা বাচবে না। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিদের তা উপলদ্ধি করতে হবে। জমি জবর দখলের প্রক্রিয়া বন্ধ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্য পন্থায় বিশেষ করে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করে দেশ ও জাতির প্রভূত উন্নতি সাধন করা সম্ভব। তবে তার পূর্ব শর্ত হবে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন।
ড. দেওয়ান তার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে ভারত বিভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাওয়াকে শাপে বর (Blessing in Disguise) হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া স্বাধীনতাযুদ্ধে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়াকে ভূল বলে উল্লেখ করলেও তৎকালীন পরিবেশ পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক পাহাড়ি বাঙালির জীবন বাচানো ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা বলেছেন। বিশেষ করে রাঙামাটির পার্শ্ববর্তী রাউজানের ফজলুল কাদের চেৌধুরীর মুসলিম লীগের পান্ডাদের পাহাড়িদের ওপর হামলার প্রস্তুতির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, তৎকালীন পাহাড়িদের অসচেতনতা ও শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলে সমতলের চেয়ে পাহাড়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতো। তবে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় তৎকালীন পাকিস্তান গণ পরিষদের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কোনো যোগাযোগ না রাখায় এবং চুপি চুপি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ও তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার ডিসি এইচ টি ইমামের সমালোচনা করেছেন।
ড. মানিক লাল দেওয়ানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমি ও আমার পৃথিবী’ বইটিকে মোটা দাগে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়; ১. পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ, ২. তার দেশ বিদেশে শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষকতা জীবন এবং ৩. পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির মধ্যে ১. ভারত বিভক্তির সময়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম, ২ মুক্তিযুদ্ধকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ৩. আদিবাসীদের স্বাধীকার আন্দোলন ও পার্বত্যচুক্তি। এসব বিষয়ে ড. দেওয়ানের নিজস্ব চিন্তা চেতনা ও আদর্শ বা মন্তব্য নিয়ে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তিনি একজন লেখক হিসেবে তার স্বাধীন মতামত গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। পাঠকরাও ড. দেওয়ানের মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। সেটা যার যার স্বাধীনতা। তবে বইটি সুখ পাঠ্য এবং পরোক্ষভাবে ইতিহাসের কিছু রূঢ় বাস্তবতার দিক রয়েছে। সেটা ড. দেওয়ান অনুধাবন করে ইতিহাসবিদরা যেন সে ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেন সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
ড. দেওয়ান একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি হলেও ইতিহাসবিদ নন। সে কারণে বইটিতে ইতিহাসকে খুঁজতে হয় প্যারায় প্যারায়, অধ্যায়ে অধ্যায়ে। যেমন চাকমা ইতিহাসে বীর পুরুষ চাকমা রাজার সেনাপতি রুনু খা দেওয়ানের বাড়ির ধ্বংসাবশেষের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তাতে ইতিহাসের মসলা নেই। তবে সামান্য সূত্র আছে যা তিনি কাচালং নদী হয়ে রাঙামাটি আসার পথে কর্ণফুলী কাচালং নদীর সংযোগ স্থলে দেখেছেন। আবার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে ডক্টরেট থিসিসে ব্যস্ত ছিলেন। তবে দেশ সম্পর্কে খবরাখবর রেখেছেন। স্বাধীণতাযদ্ধের দূত হিসেবেও কাজ করেছেন। পরে দেশে ফিরে লোকমুখে যা শুনেছেন তা বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ইতিহাসের ঘটনাবলীগুলো সাজানো নয়। তিনি তার জীবনে দেখা বা ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে তুলে ধরেছেন মাত্র। ইতিহাসবিদরা সেখান থেকে ইতিহাসের নির্যাস বের করবেন। এটাই প্রত্যাশা।

হরি কিশোর চাকমা : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক প্রথম আলো,রাঙামাটি পার্বত্য জেলা। 

hari1_thumb

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: বাঙালির এক আত্মপ্রত্যয়ী রাষ্ট্রগুরু

আজ ১৭ই মার্চ ২০২০ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ দিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কেন বিশেষ তাৎপর্যবহ একথা …

Leave a Reply