ডুবছে… আওয়ামীলীগ

ELECTION-COVER-PICউপজেলা নির্বাচনে মাধ্যমেই যেনো পাহাড়ে বেরিয়ে আসছে আওয়ামী লীগের রাজনীতির বেহালচিত্র। দীর্ঘদিনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে কিভাবে একটি সংগঠন বাইরের প্রবল চাকচিক্যের মধ্যেও ভেতরে ভেতরে কিভাবে অন্তসারশূণ্য হতে পারে,তারই বড় প্রমাণ রাঙামাটি আওয়ামী লীগ। ১৯৯১ সালে থেকে জেলায় দাদাকেন্দ্রীক রাজনীতির কারণে দলটির নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পুরনো আলোচনা আবারও হালে পানি পাচ্ছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে বিজয়ের ঝড়েও পার্বত্য রাঙামাটিতে নৌকার বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকেই। আলোচনা আরো বেশি উঠছে উপজেলা নির্বাচন শুরুর পর। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় দফায় দুইটি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে কাপ্তাই উপজেলায় নিজেদের বর্তমান চেয়ারম্যান থাকলেও সেই পদটিও হারিয়েছে তারা। আর নানিয়াচরে দলটির সমর্থিত প্রার্থী যে ভোট পেয়েছে তার লজ্জাস্করও বটে। তৃতীয় দফায় যে তিনটি উপজেলা কাউখালি,বাঘাইছড়ি এবং বরকলের নির্বাচনেও নিশ্চিত ভরাডুবিই অপেক্ষা করছে দলটির জন্য। বাঘাইছড়িতে প্রার্থীই দিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। প্রার্থী দিতে পারেনি চতুর্থ দফায় অনুষ্ঠিতব্য জুড়াছড়ি উপজেলাতেও,যেখানে সর্বশেষ নির্বাচনে নৌকায় ভোট পড়েছে পুরো উপজেলা মিলে মাত্র ২৯৯ টি ! পঞ্চম দফার রাজস্থলী,লংগদু,সদর ও বিলাইছড়িতেও বেহালচিত্র। রাজস্থলীতে বিএনপি থেকেই ধার কওে আনা এক প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। লংগদু ও বিলাইছড়িতে বিজয়ী হওয়াতো দূরের কথা, আওয়ামীলীগের সমর্থিত প্রার্থীরা দ্বিতীয় নাকি তৃতীয় হবেন,সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র !

উপজেলা নির্বাচনে রাঙামাটি সদর আসনেও নানা নাটকীয়তা আর দীর্ঘসূত্রিতার আশ্রয় নিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। নানা নাটকীয়তার পর এখানে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয় বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সেলিমকে। অন্যান্য উপজেলায় প্রার্থী মনোনয়নে ভুল ছিলো বলে মনে করেন দলের নেতাকর্মীরা।

কাপ্তাই উপজেলায় দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য সিনিয়র নেতৃবৃন্দের আন্তরিকতার অভাব এবং বর্তমান চেয়ারম্যান অংসুচাইন চৌধুরী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরোক্ষ বিরোধীতা করাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। দলের প্রচারেও নেতাকর্মীদের সংঘবন্ধতা চোখে পড়েনি,ছিলোনা কাজের সমন্বয়ও। এছাড়ার বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধেও বেশ কিছু অভিযোগ আছে আওয়ামীলীগের।
কাপ্তাই উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহম্মেদ পরাজয়ের পেছনে সরাসরি প্রশাসনকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের একতরফা আচরণের কারণে আমরা জয়লাভ করিনি। কেপিএম স্কুল কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাই হওয়ায় আমাদেরকে পরাজিত দেখানো হয়েছে। প্রার্থীর পক্ষ থেকে কেআরসি ও কেপিএম স্কুল এন্ড কলেজ দুটি কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করে পুনঃ নির্বাচনের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়া যারা দলীয় মনোনয়ন পাননি তাঁরা সক্রিয়ভাবে কাজ করেননি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বিদায়ী চেয়ারম্যান অংসুইছাইন চৌধুরী নির্বাচনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বর জানান, ভোট ছিনতাই ও দলীয় কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেননি। তিনি জানান, যারা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে নানিয়রাচর উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ধর্মেশ খীসা বিশাল ভোটের ব্যবধানে হেরে যায়। এনিয়ে দলটির মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। নানিয়ারচর তৃণমূল নেতৃবৃন্দ প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে হাইকমান্ডের ভুল ছিলো বলে দোষারোপ করলেও দলের হাইকমান্ড দুই আঞ্চলিক দলের প্রভাবের কথা জানান।
জেলা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এডভোকেট মামুন ভূঁইয়া জানান, এ নির্বাচনে দল আওয়ামী লীগ হেরে যাননি, ব্যক্তি আওয়ামী লীগ হেরেছে। প্রার্থী তৃণমুল নেতাকর্মীদের কাছে আননোন ফেস (অপরিচিত মুখ)। তৃণমুলের কোনো মতামত না নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ঘোষণা করায় দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেনি। এই উপজেলায় বেশিরভাগ বাঙালি আওয়ামী লীগের ভোটার। কিন্তু, প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় বেশিরভাগই ভোট দিতে যাননি। এছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাবের কারণেও ভোট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।

জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও নানিয়ারচরের বাসিন্দা জনতা শেখর চাকমা জানান, আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাবে আমরা জয়লাভ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সদর ছাড়া কোথাও ভোট চাইতে পারেননি। এমনকি তিনি নিজের ভোটও দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে যেতে পারেননি। এছাড়া প্রার্থীর ক্ষেত্রেও তৃণমুলের সমস্যা থাকার কারণে জয়ী হওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।

নানিয়ারচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ত্রিদিব দাশ বলেন, দুই আঞ্চলিক দলের প্রভাবে আমাদের জয়লাভ করা সম্ভব হয়নি। আমরা কয়েকটি কেন্দ্র ছাড়া কোথাও এজেন্ট দিতে পারিনি। তৃণমুলের অসন্তোষ এবং নিজেদের প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, জেলা থেকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে আমাদের কোনো হাত নেই। তা ছাড়া এই নির্বাচনে দলীয় কোনোও প্রার্থী আগ্রহ না দেখায় ধর্মেশ খীসা তিনি নিজেই সাহস করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। প্রার্থীই নিজেই ভোট দিতে পারেননি। তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এবারই আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেয় বলে তিনি জানান।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বর পরাজয়ের পেছনে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব ও বন্দুকধারীদের ভয়ভীতির কারণ উলে¬খ করেন। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো ভুল ছিলো না বলে তিনি দাবি করেন।

তবে কাপ্তাই ও নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে রাঙামাটি জেলায় দলটির যে বেহাল সাংগঠনিক কাঠামোর চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা আগামী ৮ টি উপজেলার নির্বাচনেও বহাল থাকবে বলেও মনে হচ্ছে। আপাতত এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে দলটি। তবে সেই পথের দেখা তারা কবে পান কিংবা আদৌ পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেই।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply