নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » জাতীয় বাজেটে পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের প্রবেশাধিকার এবং জনপ্রতিনিধি-নাগরিক সমাজ ও এনজিওর ভূমিকা

জাতীয় বাজেটে পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের প্রবেশাধিকার এবং জনপ্রতিনিধি-নাগরিক সমাজ ও এনজিওর ভূমিকা

প্রতি বছরের জুন মাস এলেই আমাদের দেশে অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী বাজেট প্রনয়ণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সমতলের মানুষ, নানাভাবে-নানা মাধ্যমে বাজেটের বিষয়ে ছিটেফোঁটা ধারণা লাভ করতে পারেন। পাহাড়ের মানুষ বরাবরই বঞ্চিত থাকেন সে সুযোগ থেকে। এই ‘ডিজিটাল’ বাংলাদেশের আমলেও সে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন ঘটেছে বলে আমাদের মনে হয়না।
অথবা তথ্য অধিকার আইনের মতো জবরদস্ত একটি ভালো আইন হবার পরও পার্বত্যবাসী অর্জন করে নিতে পারেনি বাজেট সম্পর্কে জানা এবং বোঝার বিষয়টি।

১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সময় থেকেই পার্বত্যাঞ্চলে মূলতঃ গণমুখী এবং জন অংশগ্রহণমুলক উন্নয়ন প্রচেষ্টা সরকারীভাবে সূচিত হয়। বেসরকারী উদ্যোগে এ রেয়াজ শুরু হয় আরো প্রায় একদশক পরে যখন ঐতিহাসিক পার্বত্যচুক্তি সম্পাদিত হয়। এমনকি বাজেট প্রনয়ন এবং প্রস্তাবনা প্রক্রিয়ায় পার্বত্যাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা কী তাও আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়।
অথচ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ’ এবং ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ এর মতো ব্যতিক্রমী ও শক্তিশালী বিশেষায়িত স্থানীয় সরকার কাঠামো বাংলাদেশে একমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামেই বিদ্যমান। কিন্তু এসব কাঠামো পার্বত্যবাসী আপামর জনসাধারণের উন্নয়নের জন্য জাতীয় নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কতোটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে সেটাও দারুন প্রশ্নবিদ্ধ।

আমরা সবাই জানি, দেশের সকল অঞ্চলের বার্ষিক উন্নয়নের চুড়ান্ত হিসেব-নিকেশ নির্ধারিত হয় বাজেট অধিবেশন বা বাজেট প্রনয়ন প্রক্রিয়াতেই।

অবশ্য তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতরও পার্বত্য তিন জেলায় সরকারী উদ্যোগে অতীতেও উন্নয়ন হয়েছে এবং এখনও তা অব্যাহত। কিন্তু তা কতোটা জনগণের প্রত্যাশা এবং স্থানীয় প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সেটা ভেবে দেখার সময় আসন্ন। একজন সাধারণ নাগরিক যেহেতু কর প্রদান করেন এবং রাষ্ট্রের দেয়া অত্যাবশ্যকীয় সেবা গ্রহন করেন সেহেতু কেমন সেবা তিনি পেতে চান বা সে সেবা গ্রহণে তিনি রাষ্ট্র ও সরকারকে কী দিতে চান; এ দুইয়ের বোঝাপড়া গণতান্ত্রিক বিকাশমানতারই একটি অংশ।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বাজেটের মতো রাষ্ট্রের এত বড়ো অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে পার্বত্যবাসীর কোন প্রবেশাধিকার নেই।

হয়তো তিন পার্বত্য জেলা থেকে কম পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয় বলেও সরকার জাতীয় বাজেটে এ এলাকার মানুষের মতামত বা প্রত্যাশাকে কম গুরুত্ব দিয়ে থাকতে পারেন। অবশ্য এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত অভিমত। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯০০ সালের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা’ অনুযায়ী এ অঞ্চলের বিশাল একটি জনগোষ্ঠি আয়কর প্রদান করেন না। আবার রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার একটা ভয়াবহ প্রবণতাও এ তিন জেলায় বিদ্যমান।

কিন্তু তাই বলে এ অঞ্চলের মানুষকে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আমার দৃষ্টিতে একেবারে অনৈতিক।

খুব অহংকার করেই উদাহরণ দিতে চাই, পার্বত্য এলাকার হলুদ নিয়ে ইদানীং দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে চমকপ্রদ একটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে। যেটিতে তিন পার্বত্য জেলার অন্যরকম সম্ভাবনাময় কৃষিজ ঐতিহ্যকে সবার চোখের সামনে তুলে ধরেছে। কৃতজ্ঞচিত্তে আমি এ ধরণের একটি সৃজনশীল বিজ্ঞাপন নির্মাণ এবং প্রচারের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘প্রাণ’ কে।

গণমাধ্যমই যদি গণতান্ত্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি সহায়ক মাধ্যম হয়ে থাকে তাহলে পার্বত্যাঞ্চলের উন্ননের ক্ষেত্রে এই বিজ্ঞাপনটিই আমাদের দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মননকে নাড়া দেয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এ ধরণের দৃশ্যমান একটি উদাহরণ পার্বত্যাঞ্চলের নীতিনির্ধারদের হৃদয়কেও জয় করতে পারেনি।

পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার ধারাবাহিক প্রভাবে পার্বত্যাঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবন-যাত্রায়ও ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেই মান্ধাতা আমলের জুমচাষের বিপরীতে পাহাড়ে এখন ব্যাপকভাবে আবাদ হচ্ছে হলুদ, আদা, আনারস, লিচু, আম, কাঁঠাল, ইক্ষুর মতো অর্থকরী ফসল।

শুধু তাই নয়, দেশের মৌসুমী শাক-সবজি চাহিদার একটি বড়ো অংশের যোগান কিন্তু এ তিন পার্বত্য জেলা থেকেই দেয়া হচ্ছে। ব্যবহার্য গাছ এবং বাঁশের অবদানও খাটো করে দেখার মতো নয়। পরিবেশগত দিক থেকে ক্ষতিকর হলেও নগদ অর্থকরী ফসল হিসেবে পার্বত্য এলাকা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার টন তামাক দেশে-বিদেশে সরবরাহ হচ্ছে। এখানকার মানুষ সমতলের মানুষের মতো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে আয়কর কম দিলেও শ্রম এবং পরিচর্যার বিনিময়ে দেশের জন্য খুলে দিয়েছেন উৎপাদনের নতুন এক দিগন্ত।

আমরা পাহাড়ের তরুণরা একে ‘গ্রীন ইকোনমি’ বা সবুজ অর্থনীতি বলে অভিধা দিতে পারি। গ্রীন ইকোনমির জনপ্রিয় এ দর্শণকে মাথায় নিয়ে তিন পার্বত্য জেলায় গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক মিশ্র ফলের বাগান। এসব বাগানের অনেকগুলোই অর্জন করেছে জাতীয় কৃষি পুরষ্কারও। এসব বাগানের অধিকাংশই গড়ে উঠেছে কোন প্রকার ব্যাংক লোন ছাড়াই, অনেকটা নিজস্ব মনোবলেই। কী অবাক করা ব্যাপার, গত বছর থেকে সরকারীভাবে বাজেট প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও বাজেটকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যেতে ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ (পিপিপি) নামে নতুন একটি খাত সৃষ্টি করা হয়েছে। গত অর্থ বছরের বাজেটে পিপিপি’র জন্য তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও রাখা হয়েছে। অথচ পিপিপি’র জন্য বরাদ্দকৃত সেই টাকার ছিটেফোঁটাও পার্বত্য তিন জেলার ভাগ্যে জুটেছে কিনা হলফ করে কেউ বলতে পারবেন না।

বেশ ক’বছর ধরে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে পার্বত্যাঞ্চলে পর্যটন ব্যবসার উন্নয়নে ব্যাপক আওয়াজ তোলা হচ্ছে। কখনো কখনো চমকে দেবার মতো আজগুবি তথ্যও বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের জানান দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোন বাজেট আলোচনায় বা উন্নয়ন পরিকল্পনায় সেই সুন্দরতম উন্নয়ন ভাবনার জায়গা বাস্তবিক অর্থে আমরা কোথাও দেখতে পাই না।

সেই ষাটের দশকে অসভ্য-স্বৈরাচারী পাকিস্তানী সরকার বিদু্যৎ সুবিধার কথা বলে পার্বত্য এলাকার মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে জোরপূর্বক একটি বাঁধ উপহার (?) দিয়েছিলেন, যার নেতিবাচক প্রভাব এখনো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। একইভাবে আশির দশকে জুমচাষের মতো ব্যাপক পরিমাণ পাহাড় এলাকায় জায়েজ করা হয় বাণিজ্যিক রাবার চাষের সাম্রাজ্য। সেই পদাংক অনুসরণ করে পিছিয়ে নেই কাসাভা কিংবা বাণিজ্যিক বৃক্ষ-বেনিয়ারাও। কী এক অদৃশ্য ক্ষমতার বলে হাজার হাজার একর ভূমির দখল নিয়ে গড়ে উঠা এসব বাগানের মালিকরাও আওড়ান পর্যটন নিয়ে নানা কথা। সোজা কথা, বাজেটের মতো জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইসু্যতে পার্বত্য এলাকার করণীয় নির্ধারণের বিষয়টি যেন সবারই অচেনা এবং অংপাক্তেয়।

খাগড়াছড়ি-বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটি জেলার অধিকাংশ এলাকা এখনো বিদু্যত সুবিধার বাইরে। বিদু্যত সংযোগ থাকলেও তার মান এবং স্থায়ীত্ব কেমন তা একমাত্র তিন পার্বত্য জেলায় নিয়মিত বসবাসকারী বাসিন্দারাই বলতে পারবেন।

এ অজুহাতে স্বাধীনতার চার দশক পরেও দেশের সম্ভাবনাময় এ অঞ্চলে স্থাপিত হয়নি বেসরকারী কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান। এমনকি গড়ে উঠেনি একটি হিমাগারও। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, যেসব জনপ্রতিনিধি এ অঞ্চলের মানুষের ভোটে নির্বাচিত হন কিংবা এ এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন দেশে-বিদেশে, তাঁদেরকে। তাঁরা কেন এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের সাথে কিংবা স্থানীয় জনগণের সাথে শেয়ার করেন না?

মাঝখানে সরকার জেলা বাজেটের একটি ঘোষণা দিলেও আবার তা থেকে পিছিয়ে যান। কিন্তু পাহাড়ে যে পরিমাণ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান (এনজিও) কাজ করে তাঁরাও কী জনগণের উন্নয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠার অজুহাতে এগিয়ে আসতে পারেন না। অথচ, আমরা দেখি-অনেক কম প্রয়োজনীয় কিংবা অ-সার্বজনীন ইসু্যতে নামজানা এনজিওর অতি উৎসাহী ভাব দেখে রীতিমতো লজ্জাবোধ করেন অনেক সাধারণ জনগণ।
পাহাড়ের কথিত সুশীল বা নাগরিক সমাজের দায়িত্ববোধের বাহারতো উল্লেখেরই দাবী রাখেনা। দেশেতো বটেই বিদেশের মাটিতের তাঁরা আমাদের জন্য কান্না করেন অর্হনিশ। এটা হতে পারবে না, এটা করা যাবে না। কিন্তু নিজের স্বার্থে সবকিছু জায়েজ হবে এমন মানসিকতার রাজনৈতিক অথবা অ-রাজনৈতিক বুদ্বিজীবিদের কাছে নিজেদের খুব অসহায় মনে হয়।

বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে স্রেফ পেশাগত কারণে ঘন্টার পর ঘন্টা এসব বুদ্বিজীবি-বিশিষ্টজন-গবেষক এবং সিনিয়রদের বয়ান শুনতেই হয়।
বাজেটের মতো ইসু্যই যদি উন্নয়ন এজেন্ডা হিসেবে বিবেচিত হতে না পারে তাহলে আমার আর কিছুই বলার নেই। কাউকে আহত কিংবা জ্ঞান দেয়ার হীন উদ্দেশ্যে বলছিনা, যা সরকার করে না, প্রশাসন করে জনগণকে না জানিয়ে কিংবা করার মতো সামর্থ্য জনগণ রাখেনা- সেই কাজই তো সিভিল সোসাইটি এবং এনজিও করার জন্য এগিয়ে আসবে। সাধারণ জ্ঞানে আমি বুঝি, জনগণকে দেশ ও এলাকার স্বার্থে, সার্বজনীন উদ্যোগে ঐক্যবদ্ধ করা, মৌলিক অধিকার আদায়ে প্রণোদিত করাই তো এনজিও এবং সিভিল সোসাইটির অন্যতম কাজ।

প্রদীপ চৌধুরীঃ সংবাদকর্মী

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বেইলি সেতু ভেঙে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বন্ধ

রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় রাঙামাটি-বান্দরবান প্রধান সড়কের সিনামা হল এলাকার বেইলি সেতু ভেঙে পাথর বোঝাই ট্রাক …

One comment

  1. আমি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বলতে পারি, একমাত্র ওয়াদুদ ভূইয়ার সময়েই তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ হয়েছিল। এখানে ভিন্ন মতকে অস্বীকার না করেই ব্যাপারটি স্বীকার করা সম্ভব। তবুও আমরা আশাবাদী, এই সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রামকে দিয়ে গ্রিন ইকোনমির সূচনা করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সাজেকের মত ভূস্বর্গে যখন সেনাবাহিনী ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, তখনও এক শ্রেনির বিরোধীতাকারীরা এর বিরোধীতা করে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর উন্নয়নের স্বার্থে এই ধরনের অপপ্রচারকারীদের সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিৎ। তাদের সকল দাবীই মেনে নিয়ে আশকারা দেয়ার প্রবনতা বন্ধ করা উচিৎ।

    লেখককে অনেক ধন্যবাদ, অনেক সুন্দর লেখনীর জন্য।

Leave a Reply

%d bloggers like this: