নীড় পাতা » পাহাড়ে নির্বাচনের হাওয়া » জাতীয় বনাম আঞ্চলিক রাজনীতির লড়াই

জাতীয় বনাম আঞ্চলিক রাজনীতির লড়াই

pic-0111দ্বৈরথটা আগেও ছিলো,কিন্তু তখন মাঠে বিএনপি থাকায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি আঞ্চলিক দলগুলো,এবার মাঠে বিএনপি নেই,নেই ভোটের জটিল সমীকরণের হিসাব নিকাশও,তাই এবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া একমাত্র জাতীয় দল আওয়ামীলীগকে বাগে পেয়ে বেশ চেপেই ধরেছে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো। শুধু চেপে ধরাই নয়,১৯৯১ এর পর টানা অপ্রতিদ্বন্ধি হয়ে উঠা আওয়ামী লীগের দুই হেভিওয়েট প্রার্থী বীর বাহাদুর ও দীপংকর তালুকদার এবার অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশ কোনঠাসাও। পাহাড়ের আওয়ামী রাজনীতির এই দুই ‘দাদা’কে শিক্ষা দিতে মরিয়া আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল,পাহাড়ী ভোটার এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটও। তার সাথে আছে অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষুদ্ধ ভোটারদের একটি অংশও। ফলে চতুর্মুখি চাপে নাভিশ্বাস নির্বাচনী মাঠের দুই পাকা খেলোয়ারের। আবার দুইজনের বিপক্ষের মাঠে নেপথ্যে কাছ করছে দলেরই একটি সংক্ষুদ্ধ অংশ।

রাঙামাটি আসনে প্রার্থী ছয়জন। তবে শুরু থেকেই মাঠে নেই জাতীয় পার্টির প্রার্থী ডাঃ রূপম দেওয়ান। আর জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র প্রার্থী সুধাসিন্ধু খীসাকে সমর্থন করে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন ইউপিডিএফ প্রার্থী সচিব চাকমা। ফলে দৃশ্যতঃ নির্বাচনের মাঠে প্রার্থী এখন চারজন। এরা হলেন আওয়ামী লীগের দীপংকর তালুকদার,স্বতন্ত্র প্রার্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি উষাতন তালুকদার,স্বতন্ত্র প্রার্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র কেন্দ্রীয় সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন এর রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক এডভোকেট আবছার আলী। শেষের তিনজনই সরাসরি আঞ্চলিক রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও নিজেদের দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত না হওয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন।

এদের মধ্যে দীপংকর তালুকদার ৯১ থেকে তিনবারের নির্বাচিত এমপি। ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেননি এবং ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এছাড়া বাকীসবগুলো নির্বাচনে তিনিই বিজয়ী। বরাবরই শক্ত প্রার্থী দীপংকর এবার চ্যালেজ্ঞের মুখেই পড়েছেন। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় তাদের ভোটের একটি অংশ পেয়ে যেতে পারেন তার বিরোধীরা,আবার চুক্তি বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে পাহাড়ী ভোটের খুব সামান্য একটি অংশ বড়জোর পেতে পারেন তিনি,আর ভোটারদের নির্বাচন বিমূখতাও তার জন্য বুমেরাং হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি যদি বিজয়ীও হন এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে পুনর্বাসিত বাঙালী ভোট,সংখ্যলঘু হিন্দু ও বড়–য়াদের ভোট,পার্বত্য রাজনীতির প্রভাবক শক্তিগুলোর সহযোগিতা। এছাড়া একথাতো প্রমাণিতই যে,নির্বাচনী মাঠে দীপংকর তালুকদার বরাবরই কূশলী ও ঝানু খেলোয়াড়,বিজয়ী হওয়ার যাবতীয় কৌশল যার মুখস্থ।

অন্যদিকে জনসংহতি নেতা উষাতন তালুকদার ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রায় ৫২ হাজার ভোট পান। সেই সময় রাজস্থলি,জুড়াছড়ি,বরকল, লংগদু,কাউখালির একটি বড় অংশই ছিলো ইউপিডিএফ এর নিয়ন্ত্রনে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে,ওই এলাকাগুলোতে জেএসএস এর উপস্থিতিও বেশ আশাব্যজ্ঞক। ফলে ভোটের হিসেবে আগের চেয়েও সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন তিনি। এর সাথে যোগ হয়েছে বরাবরই জনসংহতি সমিতির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার সহযোগিতা,বাঘাইছড়ি ও লংগদুতে দুই বাঙালি বিএনপি নেতার হাতির পক্ষে অবস্থান,আওয়ামী লীগের দীপংকর বিরোধী অংশের নেপথ্য সহযোগিতা,দীপংকর বিরোধী সেন্টিমেন্ট এর প্রভাব,পাহাড়ী ভোটারদের একাট্টা হওয়া। ফলে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন উষাতন। কিন্তু তার জন্য গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দিয়েছেন তারই সাবেক সহকর্মী ও জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র প্রার্থী সুধাসিন্ধু খীসা। নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন,সুধাসিন্ধুর ভোট যত বাড়বে ততই উষাতনের পরাজয় তরান্বিত হবে। তবে বিজয়ী হওয়ার দৌড়ে বেশ শক্তভাবেই আছেন উষাতন। Untitled-2-copy

জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র কেন্দ্রীয় সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা খাগড়াছড়ির ভোটার,কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেখানে তার মনোনয়ন বাতিল করে রিটার্নিং অফিসার। ফলে তিনি রাঙামাটিতে প্রার্থীতা বহাল রাখেন। কাকতালীয়ভাবে রাঙামাটিতে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পেয়ে যান ইউপিডিএফ এর সমর্থনও । বিগত নির্বাচনে এই জেলায় ইউপিডিএফ না ভোটের প্রচারণা চালিয়ে প্রায় ৩২ হাজার ভোট পেয়েছিলো। ফলে এই রিজার্ভ ভোটগুলোও তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। ইউপিডিএিফ নিয়ন্ত্রিত নানিয়াচর,কাউখালিতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পাবেন তিনি। এছাড়া বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলায় তার দলেরও রয়েছে বেশ শক্ত অবস্থান। পাহাড়ী সুশীল সমাজের একটি অংশ নেপথ্যে সহযোগিতা করছেন তাকে। ফলে বিজয়ী হওয়ার মতো ভোট তিনি পাবেন কিনা তা নিশ্চিত বলা না গেলেও,এটা সত্য যে এবারের নির্বাচনেও তিনিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন। পাহাড়ী রাজনীতির নানান সমীকরণে তিনি বিজয়ী হয়ে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়।

নির্বাচনে একমাত্র বাঙালী প্রার্থী এডভোকেট আবছার আলী। তার ভরসাও ‘বাঙালি’ হওয়াটাই। যদিও তার নিজের দল সমঅধিকার আন্দোলনও সরাসরি তার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। কিন্তু পার্বত্য রাজনীতির সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত চরিত্রের কারণে নানাভাবে বঞ্চিত ও উপেক্ষিত বাঙালীরা যদি যূথকদ্ধভাবে আবছার আলীকে ভোট দেয়,আর প্রভাবক শক্তিগুলো পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে বাঙালীদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য মাঠে নামে তাহলেই হয়তো আবছার আলীর বিজয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে,নতুবা অতীতের আরো অনেক বাঙালী প্রার্থীর মতো জামানত হারানোর করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে তাকে।

জয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন চারপ্রার্থীই। জেলার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত চষে বেড়ানো প্রার্থীরা মনে করছেন,সারাদেশের নির্বাচনী চিত্র যাই হোকনা কেনো পাহাড়ের হিসাব নিকাশ সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে ভোটাররাও ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্রে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ভোটের লড়াইয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক দল ও জাতীয় দলের মধ্যে কিংবা আঞ্চলিক দল বনাম আঞ্চলিক দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর বিবৃতি যুদ্ধ শুরু হয়েছে,গুলি করা হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী সুধাসিন্ধু খীসার গাড়ীতে। বিভিন্নস্থানে নির্বাচনকর্মীদের কাজ করতে না দেয়া ও বাধা দেয়ার অভিযোগ করেছে আওয়ামী লীগ ও জেএসএস(এমএনলারমা)।

কয়েকটি স্থানে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও ঘটেছে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে। নির্বাচন পর্যন্ত এ লড়াই কতদূর যায় তাই এখন দেখার বিষয়। কারণ বাঙালী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া কিংবা না যাওয়া নিজস্ব মর্জির উপর নির্ভর করলেও পাহাড়ী ভোটারদের ‘বাধ্যতামূলক’ ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার জন্য ত্রিমুখি চাপ আছে এবং থাকবে। এই চাপ সহ্য করে পাহাড়ী ভোটাররা আদৌ নিজের ইচ্ছায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কিনা এবং তাদের উপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন আঞ্চলিক দল কতটা সফল বা ব্যর্থ তার উপরই নির্ভর করছে জয় পরাজয়। কিন্তু এটাও নির্মম বাস্তবতা যে,যত চাপই প্রয়োগ করা হোকনা কেনো,শেষ পর্যন্ত একজন ভোটার নিজের ভোট প্রয়োগ করবেন একান্ত নির্জনতায়,যেখানে তার ইচ্ছাশক্তি আর বিবেববোধ প্রকৃত বিচারক হিসেবে কাজ করবে। আর এই ইচ্ছাশক্তি আর বিবেচনাবোধের উপর নির্ভর করছে কে হচ্ছেন রাঙামাটি আসনে বিজয়ী প্রার্থী।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সচিবের অনুপস্থিতে ক্ষেপেছেন ডিসি !

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ও কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব এটিএম …

Leave a Reply