নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » জাতিগত বিভেদের উত্তাপ কমছেইনা খাগড়াছড়িতে

জাতিগত বিভেদের উত্তাপ কমছেইনা খাগড়াছড়িতে

khagrachari pic--1321খাগড়াছড়ি জেলা সদরের কমলছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বুধবার সকাল থেকে দুটি পক্ষের মধ্যে ফের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে করে কমলছড়ি ইউনিয়নসহ এর আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মূলত ভূয়াছড়ি এলাকার শহিদুল ইসলাম নামে এক শিশু নিখোঁজের গুজব ছড়িয়ে সহিংস পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বর্নাল, খ্রীষ্টান পাড়া, ভূয়াছড়িতে উভয় পক্ষের সংঘর্ষে ৮ জন আহত হয়েছে। ভাংচুর করা হয়েছে বেতছড়ি, মধ্য বেতছড়ি, পশ্চিম বেতছড়ির কমপ্লেক্সে ১০টি ঘরে ভাংচুর, লুটপাট চালানো হয়েছে। আংশিক ভাংচুর করা হয়েছে আপার বেতছড়ি চৈত্যদর্শ বৌদ্ধ বিহার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে জেলা প্রশাসন থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠে রয়েছে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি। আতংক, উত্তেজনা বিরাজ করছে ঐ এলাকাগুলোতে। এদিকে সংঘর্ষে আহতদের খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রিপন হোসেন (৪২), রেজাউল করিম(৩৩), শহীদ বিশ্বাস(৪৫), জাহেদুল ইসলাম(২৬), শাহ আলম(৪২), বিপ্লব জ্যোতি চাকমা(৩২), রাঙ্গা দেবী চাকমা(৪৫) ও মা মণি চাকমা(১৭)। আহতদের মধ্যে শহীদ বিশ্বাসের অবস্থা আশংকাজনক। তার দুই পায়ের রগ কেটে ফেলা হয়েছে। অন্যদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। এই নিয়ে দুই দিনে আহতের সংখ্যা দাড়াঁলো ১৪ জনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমলছড়িসহ আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সতর্ক অবস্থায় রয়েছে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শহিদ বিশ্বাস জানান, ‘মঙ্গলবার বিকালে ভূয়াছড়ির জৈনক শহর আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম(১২) খ্রীষ্টান পাড়া এলাকার দিকে গুরু চরাতে যায়। কিন্তু রাতে সে বাড়ী না ফেরার আমরা পাড়ার লোকজন মিলে সকাল ৯ টার দিকে ঐ খ্রীষ্টান পাড়ায় সাইদুরকে খুজঁতে যায়। এ সময় আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা পাহাড়ীরা ইট, গুলতি নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে তাঁরা চারপাশ থেকে ঘিরে আমাদের উপর লাঠিসোঠা নিয়ে হামলা চালায়। এসময় তাঁরা আমাকে মাটিতে ফেলে কিলঘুষি মারতে মারতে চাকু দিয়ে আমার পায়ের রগ কেটে কেটে।

এদিকে বেলা ১২টার দিকে কমলছড়ির বর্ণাল এলাকায় বাসায় ঢুকে মা রাঙ্গা দেবী চাকমা(৪৫) ও ছেলে বিপ্লব জ্যোতি চাকমা(৩২)কে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। আহত বিপ্লব জ্যোতি চাকমার স্ত্রী সমরাণী চাকমা জানান,‘ ১২টার দিকে শ্বাশুরী টিউবওয়েলে স্লান করছিলেন। অন্যদিকে স্বামী ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন। এ সময় ৩০/৪০ জনের একদল বাঙ্গালী ঘরে ঢুকে চিৎকার করতে থাকে। ভয়ে আমার দুই বাচ্ছাকে নিয়ে ঘরের অদূরে বাশঁ ঝারে লুকিয়ে পরি। হামলাকারীরা চলে গেলে ঘন্টাখানেক পর ঘরে এসে দেখি আমার স্বামী ঘরের সামনে অন্যদিকে আমার শ্বাশুরী টিউবওয়েলে রক্তাত্ত অবস্থায় পরে আছে। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে।

এদিকে বেতছড়ি, মধ্য বেতছড়ি, পশ্চিম বেতছড়ি এলাকায় পাহাড়ীদের ঘর-বাড়ী ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। আংশিক ভাংচুর করা হয় আপার বেতছড়ি চৈত্যদর্শ বৌদ্ধ বিহার। বিহারটির অধ্যক্ষ শ্রীমৎ প্রজ্ঞাদিপ ভিক্ষু বলেন, ‘বুধবার সকাল ১০টার দিকে শতাধিক বাঙ্গালী বিহারে ঢুকে ভাংচুর চালায়। ভেঙ্গে ফেলা হয় বৌদ্ধ মূর্তি। তিনটি দানবক্স ভেঙ্গে বিহারের রক্ষিত টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এদিকে এই হামলাকারীদের সাথে ভূয়াছড়ি এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান মেম্বার ছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন শাহজাহান মেম্বার। তিনি বলেন, ‘এটি পাহাড়ীদের পরিকল্পিত হামলা।

এদিকে তাৎক্ষনিক ঘটনাস্থলে যান খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামছুল ইসলাম, পার্বত্য জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, মহালছড়ি জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল শহীদুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি সদর জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল আলী রেজা, খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চঞ্চু মণি চাকমা। ঘটনাস্থলে পৌছে তাঁরা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাঁরা খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার শেখ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ‘মূলত সকাল থেকে গুজবের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করা কঠিন হয়ে পরেছিল। যে ঘটনা ঘটেনি সেটি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আগুন না ধরলেও বলা হচ্ছে আগুন দেয়া হয়েছে। খুন না হলেও বলা হচ্ছে খুন করা হয়েছে। আর এসব কারণে উভয় পক্ষ উত্তেজিত হয়ে পরছে। তবে এখন পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রনে আছে’।

এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে একটি শান্তি সম্প্রীতি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সুপন খীসাকে প্রধান করে ৬ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ৩ জন বাঙ্গালী ও ৩ জন পাহাড়ী প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।

কমলছড়ি ইউনিয়ন ও মহালছড়ি উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি
এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের কমলছড়ি ইউনিয়ন ও মহালছড়ি উপজেলায় বুধবার বিকাল ৪টা থেকে শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করেছে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মোঃ মাসুদ করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আজ (বুধবার) বিকাল ৪টা থেকে ২৮ তারিখ রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক মোছাম্মদ আনার কলি ১৪৪ ধারা জারি করেন। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ টহল দিচ্ছে।

ইউপিডিএফ’র বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত
খাগড়াছড়ির জেলা সদরের কমলছড়ি এলাকায় গৃহবধূ সবিতা চাকমাকে হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং পাহাড়ীদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) ও গনতান্ত্রিক যুব ফোরাম।
বুধবার দুপুরে জেলা সদরের স্বনির্ভর এলাকা থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি উপজেলা পরিষদ, চেঙ্গী স্কোয়ার, কলেজ পাড়া হয়ে আবার স্বর্নিভরে ফিরে সমাবেশ করে। এতে বক্তব্য রাকেন পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি থুইক্যচিং মারমা, জেলা শাখার সভাপতি বিপুল চাকমা প্রমুখ। সমাবেশ থেকে মঙ্গলবার কমলছড়ি এলাকায় পাহাড়ীদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলার উস্কানিদাতাদের গ্রেফতার ও গৃহবধূ সবিতা চাকমার খুনীদের গ্রেফতার করে শাস্তি দেয়ার দাবী জানান।

‘একটি কুচক্রি মহল ফায়দা লুটতে পাহাড়কে উত্তপ্ত করছে’
খাগড়াছড়িতে গৃহবধূ সবিতা চাক্মা হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন ও সুষ্ঠু তদন্তকে ব্যাহত করার অপচেষ্ঠা চালিয়ে দেশী-বিদেশী সুযোগ সুবিধা নিতে একটি উপজাতীয় কু-চক্রি মহল পাহাড়কে আবারও উত্তপ্ত করে তুলছে বলে অভিযোগ করেছে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ(পিবিসিপি)। বুধবার পিবিসিপির খাগড়াছড়ি শাখার সাধারণ সম্পাদক এস এম মাসুম রানা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই অভিযোগ করেন সংগঠনটির সভাপতি সাহাজল ইসলাম সজল। এতে বলা হয়, বুধবার সকালে কমলছড়ি ইউনিয়নের ভূয়াছড়ি খ্রিষ্টান নামক এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার পাহাড়ী-বাঙ্গালী সংঘর্ষের পর থেকে নিঁখোজ হওয়া শহিদুল ইসলাম (১২) কে ¯’ানীয় বাঙ্গালীরা খুঁজতে গেলে পুর্ব পরিকল্পিতভাবে ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত হয়ে গুলতি নিপেসহ হামলা চালিয়ে ০৬ জন নিরীহ বাঙ্গালীকে গুরুতর আহত করে। নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা ও আহতদের উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করনে সরকারের নিকট জোর দাবী জানিয়েছে সংগঠনটি। অবিলম্বে অপহৃত বাঙ্গালী কিশোর শহিদুল ইসলামকে অত অব¯’ায় ফেরত সহ ভূয়াছড়ি এলাকার নিরীহ বাঙ্গালীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে দুর্বার আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে সংগঠনের প থেকে হুশিয়ারী দেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, গত ১৫ ফেব্রুয়ারী বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের কমলছড়ির চর এলাকা থেকে পাহাড়ী গৃহবধূ সবিতা চাকমার মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবী তাকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় চর এলাকায় বালু উত্তোলন কারী ট্রাক্টর চালক ও হেলপাররা জড়িত দাবী করে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন করে আসছিল। এদিকে এই ঘটনায় বাঙ্গালীদের উপর চাপানো ষড়যন্ত্র বন্ধ ও ঘটনার প্রকৃত তদন্ত উন্মোচনের দাবীতে গত মঙ্গলবার শহরের শাপলা চত্বরে মানববন্ধন করে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ। মানববন্ধন শেষ করে তিনটি চাদেঁর গাড়ী যোগে বাড়ী ফেরার পথে গত মঙ্গলবার বিকালে কমলছড়ি মুখ এলাকায় দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ঘের ঘটনা ঘটে। ঘটনায় ঐ দিন উভয় পক্ষের ৬ জন আহত হয়। এরপর থেকেই পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়ে জাতিগত রাজনীতির উত্তাপ।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জনপ্রিয় হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে …

Leave a Reply