নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » জাতিগত জিঘাংসার বলি মনির

জাতিগত জিঘাংসার বলি মনির

Rangamati-Monir-Hossen-Dead২০০৩ সালে নানিয়ারচর উপজেলার চেঙ্গী নদীর খারিক্ষ্যং এলাকায় নদীতে মাছ ধরছিলেন মৎসজীবি বারেক মিয়া। কিন্তু ওই এলাকায় তখন বাঙালীদের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো একটি আঞ্চলিক সশস্ত্র গ্রুপ। বিষয়টি জানতেন না বারেক। আর এ না জানাই কাল হলো তার ! পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা সেদিন কুপিয়ে হত্যা করে নদীতেই ফেলে গিয়েছিলো তার লাশ। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, ১২ বছর পর তারই চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান মনির রাঙামাটি শহরে সাম্প্রদায়িক জিঘাংসার বলি হয়ে নিহত হলেন ! অথচ মেডিকেল কলেজের জন্য প্রাণ দিতে হলো মনির’কে সেই মেডিকেল কলেজে মনিরের অনাগত সন্তান বা স্বজনরা কেউ আদৌ পড়তে পারতো কিনা তাইবা কে জানে !

গত ১০ জানুয়ারি পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ উদ্বোধনের দিন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত মনির হোসেন দীর্ঘ ২১ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ৩১ জানুয়ারি শনিবার রাত ১১.৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার চিকিৎসার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা এডভোকেট মামুন ভূইয়া মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহত মনির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট এলাকার মৃত মো: বারেক এর পুত্র। সে রাঙামাটি শহরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। তার লাশ রোববার চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি শহরে না এসে সরাসরি তার গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয়,সেখানে জানাজা শেষে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। প্রথমে নিহত মনিরের প্রথম জানাজা রাঙামাটি শহরে হওয়ার কথা থাকলেও অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের অনুরোধেই তার লাশ সরাসরি নানিয়ারচর নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার।

কি হয়েছিলো সেদিন
১০ জানুয়ারি শহরের আদালত ভবন এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের একদল নেতাকর্মী পায়ে হেঁেট মেডিকেল কলেজ উদ্বোধনস্থলের দিকে যাওয়ার পথে শাপলা হোটেল এলাকায় তাদের উপর হামলা করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে আগে থেকেই অবস্থান নেয়া কয়েকশ পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) কর্মী। এসময় পিসিপি কর্মীরা ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীদের ধাওয়া দিয়ে শেভরন ক্লিনিক পাড় করে দেয়। পরে বনরূপা ও চম্পকনগর থেকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা মেডিকেল কলেজ সমর্থকদের নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে পাল্টা ধাওয়া দিলে পিসিপি কর্মীরা ফিরে যাওয়ার পথে হ্যাপীর মোড় এলাকার পুষ্পপ্লাজা মার্কেট,শাপলা হোটেল,ইসলামী ব্যাংক,নিউমার্কেটে ব্যাপক ভাংচুর চালায়,ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরাও শেভরন ক্লিনিক,টেলিটক কাস্টমার কেয়ার ভাংচুর করে।
এসময় পিসিপি কর্মীরা জনতা ব্যাংকের নির্মানাধীন ভবনের নীচে মনির হোসেনকে একা পেয়ে বেদম মারধর করে ফেলে যায় এবং গাউছিয়া মার্কেটে জামাল হোসেন নামে এক যুবককে পিটিয়ে মার্কেটের উপর থেকে ফেলে দেয় । গুরুতর আহত মনির ও জামালকে প্রথমে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। গুরুতর আহত মনিরের মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায় এবং লিভার ফেটে যায় বলে জানিয়েছিলো চিকিৎসকরা। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা পরিষদ,জেলা প্রশাসন ও একাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে সহায়তা করলেও শেষপর্যন্ত বাঁচানো গেলোনা পেশায় নির্মাণ শ্রমিক মনিরকে।

Rangamati-Jamal-Injured
মেরুদন্ডে আঘাত পাওয়া জামালের অস্ত্রপাচার হয়েছে ঢাকায়
Rangamati-Jakir-Injured
এক্ষুনি চোখের অপারেশন প্রয়োজন জাকিরের

পঙ্গুত্বের পথে জামাল ও জাকির
একই হামলায় মেরুদন্ডে আঘাত প্রাপ্ত সুন্দরবন কুরিয়ারের কর্মচারি জামাল হোসেনকে ঢাকায় ব্যয়বহুল অস্ত্রপাচারশেষে বৃহস্পতিবার রাঙামাটি আনা হয়েছে। আহত জামালের বড় ভাই ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, জামালের চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যেই প্রায় তিনলক্ষাধিক টাকা খরচ হয়ে গেছে,এখনো পরিবার বহুকষ্টে তার চিকিৎসা চালাচ্ছে। তবুও আমার নিরপরাধ ছোট ভাইকে হয়তো সারাজীবনই এই বেদনা বয়ে বেড়াতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন,ওইদিন পিসিপি কর্মীরা তার ভাইরে বেদম মারধর করে গাউছিয়া মার্কেটের উপর থেকে নীচে ফেলে দেয়।
আরেক আহত আসবাবপত্র শ্রমিক জাকির হোসেনের একটি চোখও প্রায় নষ্ট হওয়ার পথে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হলেও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে স্বজনরা তাকে রাঙামাটি নিয়ে আসতে বাধ্য হন,অথচ তার চোখের অপারেশন জরুরী বলে জানিয়েছে তার স্বজনরা। প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে এবং সঠিক সময়ে অপারেশন করতে না পারলে চিরজীবনের জন্য অন্ধ হয়ে যেতে হবে তাকে।

অসহায় পরিবারটি আবারো সংকটে
২০০৩ সালে মো: বারেক এর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী কমলা বেগম অসহায় চার পুত্রকে নিয়ে বিপাকে পড়ে যান। অসহায় মা সন্তানদের মানুষ করতে পাঠিয়ে দেন এতিমখানায়। রাঙামাটি শহরের আল আমিন মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বড় হয়েছে মনির। পড়াশুনার পাশাপাশি পরিবারের ভরণ পোষন চালাতে ছোটবেলা থেকেই নানা জায়গার কাজ করতো সে। কিন্তু পরিবারের প্রয়োজনে এতিমখানাও ছাড়তে হয় তাকে। বেছে নেন নির্মাণ শ্রমিকের জীবন। অন্য তিন ভাই শহীদুল,আল আমিন ও মোস্তফাকে নিয়েই মা কমলা বেগমের বেদনার সংসারে আরো একবার বেদনার মেঘ নেমে আসবে কেইবা জানতো।

নানিয়ারচরে মনিরের প্রতিবেশী ও পেশায় আইনজীবি এডভোকেট মামুন ভূঁইয়া জানান, ১০ জানুয়ারি রাঙামাটি শহরের কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় নির্মানাধীন জনতা ব্যাংক ভবনেই কাজ করছিলো মনির। ওইদিন ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীদের ধাওয়া দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কর্মীরা যখন নির্বিচারে বিভিন্ন স্থাপনা ভাংচুর করছিলো এবং সামনে যাকে পাচ্ছিলো তাকেই পিটাচ্ছিলো সেই সময় তার বেদম মারধরে মেরুদেন্ডর হাঁড় ভেঙ্গে যায় মনিরের,লিভারও মারাত্মকভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়,পরে প্রথমে তাকে রাঙামাটি রাঙামাটি হাসপাতাল ও পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার চিকিৎসার জন্য অনেকেই সহায়তা করেছে,কিন্তু তা ছিলো প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য,বহু চেষ্টা করেও তাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না।

মামুনের মা কমলা বেগমের কান্না যেনো আকাশ কাঁপিয়ে তুলছিলো। তিনি বলেন,আমরা ছেলেতো কোন রাজনীতি করেনা,পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ তাকে কেনো মারলো ? আল্লাহ তাদের বিচার করবে…। তিনি তার পুত্র হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, আমি স্বামী হত্যার বিচার পাইনি এক যুগেও,এখন পুত্র হত্যার বিচার কি পাবো ?

নিহত মনিরের ভাই আল আমিন কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, বাবা হত্যার বিচার পাইনি, আবার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা ! কেনো ? কি অন্যায় করেছি আমরা ? কেনো বারবার বাবা-ভাই হারাতে হবে আমাদের।

অভিযোগ অস্বীকার পিসিপি’র
এদিকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের হামলায় আহত হওয়ার পর মনির হোসেন মারা যাওয়ার ঘটনায় নিজেদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংগঠনটি। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক জুয়েল চাকমা দাবি করেন, নিহত মনির ক্যান্সারের রোগী,১০ জানুয়ারি সে আহত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেকোন ঘটনা ঘটলে তাকে সাম্প্রদায়িক আকার দেয়ার চেষ্টা করে একটি মহল,এটাও তারই অপচেষ্টা। তবে ১০ জানুয়ারি পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাথে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ এবং তাতে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। সেদিন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নয়,ছাত্রলীগ-যুবলীগই প্রথমে হামলা করেছিলো বলেও দাবি করেন তিনি।

ফিরে দেখা ১০-১১ জানুয়ারি’২০১৫

১০ জানুয়ারি রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ উদ্বোধনের দিন শহরে অবরোধের ডাক দেয় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। ওইদিন সকাল সাড়ে নয়টায় মেডিকেল কলেজের যাওয়ার জন্য রওনা হলে ছাত্রলীগ-যুবলীগের একদল কর্মীর উপর হামলা চালায় অবরোধে পিকেটিংরত পিসিপি কর্মীরা। পরে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে তা পরে জাতিগত সংঘাতে রূপ নেয় এবং পরদিন ১১ জানুয়ারি আবারো শহরে ছড়িয়ে পড়া নানান গুজবে পাহাড়ী ও বাঙালীরা পরস্পরের উপর পাল্টাপাল্টি হামলা চালায় এবং এতে উভয় পক্ষে অর্ধশতাধিক আহত হয়,ভাংচুর করা হয় মার্কেট,দোকান,ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান,শহরের ভেদভেদী এলাকায় আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় বাঙালীদের ৪ টি দোকান ও বসত। পিসিপি কর্মীরা ভাংচুর করে পুষ্পপ্লাজা,হ্যাপীর মোড় ও শাপলা হোটেলের নীচে কয়েকটি দোকান,গাউছিয়া মার্কেট,ইসলামী ব্যাংক,রূপালী ব্যাংক,নিউ মার্কেট আর ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা ভাংচুর করে শেভরন ক্লিনিক,টেলিটক কাস্টমার কেয়ার।

পরে শহরে প্রথমে ১৪৪ ধারা ও পরে কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনা হয়। সেই সময় শহরে মোতায়েন করা হয়েছিলো সেনাবাহিনী,বিজিবি,র‌্যাব এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ। এই ঘটনায় ৪ টি মামলা হয় এবং পুলিশ ৩৫ জনকে গ্রেফতারও করে। পরে ১৩ জানুয়ারি রাঙামাটি শহরে শান্তির‌্যালির মাধ্যমে স্বাভাবিক হয়ে আসে শহরের পরিস্থিতি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বিবর্ণ পাহাড়ের রঙিন সাংগ্রাই

নভেল করোনাভাইরাসের আগের বছরগুলোতে এই সময় উৎসবে রঙিন থাকতো পাহাড়ি তিন জেলা। এই দিন পাহাড়ে …

Leave a Reply

%d bloggers like this: