নীড় পাতা » পাহাড়ের অর্থনীতি » জমেছে ব্যবসায়িদের ভোটের লড়াই

জমেছে ব্যবসায়িদের ভোটের লড়াই

rzb-electionরাঙামাটি শহরের সবচে প্রাচীন ও বনেদী ব্যবসাকেন্দ্র রিজার্ভবাজার। এখানকার ব্যবসায়িরা নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন আগামী ১৩ নভেম্বর। বৃহত্তর বনরূপা ব্যবসায়ি সমিতির জমজমাট নির্বাচনের পর শহরবাসির নজর ছিলো এই সমিতির নির্বাচনের দিকেই। বাস্তবতা হলো,প্রত্যাশা মতোই প্রায় প্রতিটি পদেই জমজমাট নির্বাচনই হতে যাচ্ছে এখানেও। রিজার্ভবাজারে ঢুকলে নির্বাচনী ঢামাঢোল আপনাকে মুগ্ধ করবে নিশ্চিত।

আগামী ১৩ নভেম্বর রিজার্ভবাজারের তৈয়বিয়া আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে রাঙামাটি অন্যতম প্রভাবশালী এই ব্যবসায়ি সংগঠনটির নির্বাচন।

নির্বাচনে সভাপতি পদে লড়ছেন দুই প্রবীন ও পরিচিত ব্যবসায়ি আনোয়ার মিয়া ভানু ও বদিউল আলম ওরফে বি আলম। এদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা। বদিউল আলম সর্বশেষ নির্বাচনে ন্যুনতম ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। সেবার তার সাথে ছিলেন শক্ত প্রতিদ্বন্ধী মরহুম হাজী ফজলুর রহমান। এবারের আনোয়ার মিয়া ভানুও শক্ত প্রার্থী। তবে বদিউল আলম জেলা অন্যতম ধনী ব্যবসায়ি হলেও তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কারণে রিজার্ভবাজারবাসির দুর্ভোগেরও শেষ নেই। অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ডিলার বদিউল আলম। ফলে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টাই রিজার্ভবাজার মূল সড়কের উপর তার বিভিণœ পণ্যের ট্রাক ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে মালামাল লোডিং আনলোডিং করে। ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে। বিড়ম্বনা পোহাতে হয় এ্যাম্বুলেন্স,টেক্সী কিংবা অন্যান্য যানবাহন চলাচলেও। সম্প্রতি এমনই এক ট্রাকের মালামাল লোডিং আনলোডিং এর সময় দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন অষ্টম শ্রেণী পড়–য়া এক ছাত্রী। বিষয়টি সম্পর্কে স্থানীয়রা বারবার বদিউল আলমকে অভিযোগ দিলেও কোন সুরাহা মেলেনি,বরং বহাল তবিয়তেই চলছে তার মালামাল লোডিং আনলোডিং কাজ। এতে স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থী হতে শুরু করে সাধারন মানুষ সবাই কমবেশি ভোগান্তি পোহালেও ন্যুনতম সচেতনতা নেই তাদের। অথচ রাতে এবং ভোরে মালামাল লোডিং আনলোডিং কার্যক্রম করলে ভোগান্তি থেকে বাঁচতো রিজার্ভবাজারবাসি। এখন সেই বদিউল আলমই যদি সভাপতি হন,তবে এই সমস্যার আদৌ কি আর কোন সমাধান মিলবে কিনা জানেনা কেউই,বিআলমেরও এই বিষয়ে কোন বক্তব্য নেই। ফলে ক্ষুদ্ধ এলাকার সাধারন ব্যবসায়িরা প্রভাবশালী এই ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেন কিনা তা দেখার বিষয় বটে। তবে সভাপতি পদে শক্ত প্রার্থীই তিনি।

বদিউল আলমের সাথে লড়াই করা আনোয়ার মিয়া ভানুর ব্যবসায়িক ইমেজও ততটা ভালো নয়। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে জড়িত থাকা এবং পুলিশের সাথে ‘অজ্ঞাত’ কারণে বিশেষ সম্পর্ক রক্ষা করা আনোয়ার মিয়া ভানুর বিরুদ্ধে পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় পিছনে পাহাড় কেটে এবং সামনে প্রধান সড়ক ঘেঁষেই ভবন নির্মান,রিজার্ভবাজার সড়ক সংস্কার কাজে বাঁধা প্রদান এবং কথায় কথায় মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আছে। স্থানীয়রা এইসব কারণে তার উপর ক্ষুদ্ধও। তবে দলীয় পরিচয় এবং পুরনো মানুষ হিসেবে তার বিশেষ পরিচিতির কারণে সভাপতি পদে জোর লড়াইয়ে থাকবেন তিনি,এমনটাই ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।

সভাপতি পদে এই দুইজনের সাথে আছেন প্রবীন ব্যবসায়ী এন ইসলাম,যার নির্বাচনী শ্লোগান ‘উড়ছে পাখী দিচ্ছে ডাক,সকল সম্প্রদায়ের ব্যবসায়িরা সুখে থাক’। তার এই শ্লোগান চটকদার ও জনপ্রিয় হলেও নির্বাচনে তিনি ততটা সুবিধা করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছেনা।

নির্বাচনে সাধারন সম্পাদক পদে লড়ছেন দুই তরুন প্রার্থী । এদের একজন ১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হেলালউদ্দিন,অপরজন শহীদ আব্দুল আলী স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য মোঃ শাওয়ালউদ্দিন। দুইজনই তরুন,নানান সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। আবার দুইজনের রাজনৈতিক পরিচয়ও ভিন্ন। হেলাল বিএনপির নেতা,ছাওয়াল আওয়ামীলীগের। সেই হিসেবে রাজনৈতিক ভিন্নমত ও প্রতিদ্বন্ধিতাও আছেই। আবার একজন পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা,অপরজন ২ নং ওয়ার্ডের। ফলে সবমিলিয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে জমজমাট লড়াইও বেশ জমে উঠেছে। প্রচার প্রচারনায়ও কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। দুই প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমেছেন নিজ নিজ দলের রাজনৈতিক কর্মী সমর্থকরাও। ফলে অরাজনৈতিক নির্বাচনটিতেও রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আবার দুই প্রার্থীর সমর্থকরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন,অব্যবসায়িসুলভ আচরনের। যদিও দুই প্রার্থীর কেউই কারো বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে কোন লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ জমা দেননি।

সমিতির সবচে গুরুত্বপূর্ণ পদ সাধারন সম্পাদক। তার উপর সভাপতি পদে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় সবার নজর সাধারন সম্পাদক পদের দিকেই। সঙ্গত কারণেই এই পদে লড়াই বেশ জমে উঠেছে। প্রচারে হেলাল বা শাওয়াল কেউই কম যাচ্ছেন না।

কে বিজয়ী হবেন,শেষাবধি তা বলা মুশকিল। ভদ্র এবং অমায়িক আচরণের প্রার্থী হিসেবে সবমহলের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা আছে ১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হেলালের। প্রথমবার পৌর কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েই তিনি রাঙামাটি পৌরসভার প্যানেল মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। নিজ এলাকার সব শ্রেণীর ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে বেশ। ফলে লড়াইয়ের মাঠে বেশ শক্ত প্রার্থীই তিনি।

ছেড়ে কথাই কইবেন না শাওয়াল উদ্দীনও। স্বেচ্ছাসেবকলীগের এই নেতা দীর্ঘদিন ধরেই নানান সামাজিক কাজের সাথে জড়িত। শহীদ আব্দুল আলী একাডেমি স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য ছাড়াও মানুষের বিপদে আপদে পাশে থাকেন শাওয়াল। সবার কাছে পরিচিত মুখও তিনি। তার পক্ষে মাঠে আছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও। ভোটের ময়দানে বেশ শক্ত প্রতিপক্ষ তিনি।

তবে হেলাল না ছাওয়াল,কে বিজয়ী হবে রিজার্ভবাজার ব্যবসায়ি সমিতির নির্বাচনে তা জানার জন্য প্রতীক্ষা করতে হবে ১৩ নভেম্বর,শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত।
নির্বাচন বেশ জমে উঠলেও স্থানীয় এলাকাবাসি ও সাধারন ব্যবসায়িরা চাইছেন এমন নেতৃত্ব যারা এলাকার স্বার্থ নিয়ে ভাববেন এবং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে কাজ করবেন। রিজার্ভবাজারের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, তারা চাইছেন যোগ্য,সৎ এবং আন্তরিক নেতৃত্ব।

রিজার্ভবাজারের তরুণ সংবাদকর্মী শংকর হোড় বলেন, রিজার্ভবাজারের মানুষের কিছু নৈমত্তিক সমস্যা আছে। সারাদিন রাস্তার উপর ট্রাক,লড়ি দাঁড় করিয়ে মালামাল লোড আনলোড করার কারণে এই এলাকার মানুষের কী যে বিড়ম্ভনা হয় বোঝানো যাবেনা। সুতরাং যে নেতৃত্ব দিনের বেলায় স্কুল-কলেজ-অফিস টাইমে এসব কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে, আমরা তাদেরকেই নেতৃত্বে চাই। একই সাথে সারা শহরের গরু বাজার এখন পৌর ট্রাক টার্মিনালে চলে গেছে। কিন্তু শুধুমাত্র রিজার্ভবাজারের গুটিকয়েক বাজার সমিতির নেতৃত্বের জেদের কারণে ছোট আঙ্গিকে গরু বাজার এখনো রিজার্ভবাজারে রয়ে গেছে,এই কারণে সাধারন মানুষের পথচলায় নানান বিড়ম্ভনা হয়। যারা প্রার্থী হয়েছেন,তাদের পুরো রাঙামাটি শহরবাসির সাথে একাত্ম হয়ে বাজার সমন্বিতভাবে ট্রাক টার্মিনালে করার ব্যাপারে একমত হতে হবে।

রিজার্ভবাজারের বাসিন্দা ও পরিবহন মালিক নেতা মঈনুদ্দিন সেলিম জানান, আমরা এমন নেতৃত্ব চাই যারা রিজার্ভবাজারকে প্রকৃতভাবেই নেতৃত্ব দিতে পারবে। একটা সময় ছিলো যখন রিজার্ভবাজারে প্রচুর মারামারি হতো,এই কারণে আমাদের বাজার ঐতিহ্য হারিয়েছে। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এখন এমন নেতৃত্ব দরকার যারা রিজার্ভবাজারের পুরনো ভাবমূর্তি আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে।

পরিবহন মালিক সমিতির প্রভাবশালী এই নেতা বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য সভাপতি পদে আমরা এমন দুজন প্রার্থীকে পেয়েছি,যাদের একজন নানা কারণে বিতর্কিত আবার আরেকজন বেশি টাকাপয়সার মালিক হওয়ায় মানুষের সাথে মিশতে পারেননা। এদের দুইজনের কাউকেই দিয়েই রিজার্ভবাজারের সাধারন মানুষের কোন উপকার হবেনা। তাই এই পদ নিয়ে এখন আর ভাবছিনা। সাধারন সম্পাদক হিসেবে তাই এমন একজনকেই চাইছি,যে হলে আমরা এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।

সিপিবি’র রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি ও রিজার্ভবাজারের পুরনো ব্যবসায়ি সমীর দে বলেন, আমরা এমন নেতৃত্ব চাই,যারা রিজার্ভবাজারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ অক্ষুন্ন রেখে শান্তি ও স্বস্তিতে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করবে। বাজার চলে যাওয়ার পর রিজার্ভবাজারের ব্যবসায় যে ধ্বস,নতুন এবং তরুন নেতৃত্ব সবাইকে পাশে নিয়ে,আলোচনা করে সব সমস্যার সমাধান করবে বলে আমরা আশা রাখছি।

তরুন ব্যবসায়ি বিশু ঘোষ বলেন, আমরা চাই এমন নেতৃত্ব আসুক,যারা সুখে দু:খে আমাদের পাশে থাকবে,একই সাথে রিজার্ভবাজারের যেসব প্রধান সমস্যা আছে,সেসব সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে। আমাদের বিশ্বাস,যোগ্য নেতৃত্ব এলে রিজার্ভবাজার তার পুরনো ঐতিহ্য আবার ফিরে পাবে।

রিজার্ভবাজারের বাসিন্দা ও শহরের তরুণ ব্যবসায়ি শহীদুজ্জামান মহসিন রোমান বলেন,আমরা এমন নেতৃত্ব চাই,যারা রিজার্ভবাজারের হারানো ব্যবসায়িক ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে। একই সাথে নতুন নেতৃত্ব যেনো দল মতের উর্ধ্বে উঠে সকল ব্যবসায়িদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে সেই প্রত্যাশা করি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জুরাছড়িতে গুলিতে নিহত কার্বারির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় স্থানীয় এক কার্বারিকে (গ্রামপ্রধান) গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারী সন্ত্রাসীরা। রোববার …

Leave a Reply