নীড় পাতা » পাহাড়ে নির্বাচনের হাওয়া » জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)’র নির্বাচনী ইশতেহার

জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)’র নির্বাচনী ইশতেহার

PCJSS-Flagপার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪

নির্বাচনী ইশতেহার

বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত তালমাতাল অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ১৫৪ প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন। এই ১০ম সংসদ কতদিন স্থায়ী হবে তাও ঠিক নেই। অবনতিশীল পরিস্থিতির কারনে দেশী-বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাসমূহ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে জড়িত হবার সম্ভাবনাও খুবই ক্ষীণ। ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলনও কতটা সফল হবে তাও এ অবস্থায় বলার মত কিছুই নেই। এই অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সমস্যাগুলোর প্রতি মনযোগ না দিয়ে আমাদের কোন উপায় নেই।

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও মৌলিক বিষয়গুলোসহ অন্যান্য বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে সরকার কোন সদিচ্ছা দেখায়নি। এমনকি ল্যান্ড কমিশনের বিতর্কিত ধারাগুলো আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে চুড়ান্ত হলেও মন্ত্রীসভা এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে এই বিল উত্থাপিতই হয়নি। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় বিগত মহাজোট সরকারের আমলে ৬ (ছয়) বার আদিবাসীদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলার পরও কোন সংসদ সদস্য এ বিষয়ে জোড়ালো প্রতিবাদ করেননি এবং পঞ্চদশ সংশোধনীতে একদিকে জাতি হিসেবে বাঙালী পরিচিতি দেয়া হয়েছে, অপরদিকে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্বা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” আখ্যায়িত করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতা বলা হলেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের সংশোধনীতে আদিবাসীদের কাছে পীড়াদায়ক কিছু বিষয় আনা হয়েছে, কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এসব বিষয়ে কোন প্রতিবাদ না থাকাতে জনগণ চরমভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। এ জন্য বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক না কেন, তাতে সব সময় জনগণের উপযুক্ত প্রতিনিধি থাকা প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের তাগিদেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আসন্ন নির্বাচনে জনগণের দাবী হচ্ছে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্য থেকে সম্মিলিত প্রার্থী দেওয়া। এ উদ্দেশ্যে ইউপিডিএফসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে কিন্তু এ জন্য কর্মসূচীগত কিছু পার্থক্য দূর করা প্রয়োজন। যেমন Ñ

১. পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ী-বাঙালীর মধ্যেকার সম্পর্ক উন্নয়ন করতে দরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন। কারণ ঐ চুক্তিতেই পাহাড়ী-বাঙালীর স্বার্থ সংরক্ষণের সুস্পষ্ট রূপরেখা রয়েছে।
২. সেনাবাহিনী ও সাধারণ প্রশাসনের সাথে জুম্ম জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দরকার পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন। কেননা ঐ চুক্তিতেই সেনাবাহিনী কিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান করবে এবং পুলিশ বাহিনী কিভাবে পরিচালিত হবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
৩. বিরাজমান ভূমি সমস্যা সমাধানেও দরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন। যেহেতু ল্যান্ড কমিশন গঠন ও সেই কমিশনের বিচার প্রক্রিয়া চুক্তিতে লিপিবদ্ধ আছে, সেহেতু এই চুক্তির বাস্তবায়ন অতীব জরুরী।

এছাড়াও জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত আদিবাসী (ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং) অধিকারসমূহের বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরীÑ সেটিও জনগণের স্বার্থে বাদ দেওয়া যায় না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জুম্ম জনগণের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী। তাই জুম্ম জনগণ রাজনৈতিক ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করার দাবী করে। এই লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছি। জুম্ম জনগণের তিনটি মৌলিক দাবী হচ্ছে (১) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন, (২) আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায় ও (৩) রাজনৈতিক ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করা। এই তিনটি দাবী বা কর্মসূচীর সাথে ঐক্যমত্য হলে আমরা যে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে নির্বাচনী সমঝোতা করতে প্রস্তুত।

প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার পরবর্তীতে এ যাবৎ কয়েকজনকে আমাদের রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হলেও জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পরিপূরণে তাঁরা কেউই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাই, বর্তমান পরিস্থিতি ও জনদাবীর প্রেক্ষিতে আমরা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও সৎ নেতাদের দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। আমাদের কাছে জনগণের মতামত ও জনগণের স্বার্থই বড় কথা। তাই জনগণের স্বার্থে ও প্রয়োজনে, সংসদের ভেতরে-বাইরে এবং দেশের ভেতরে ও বাইরে জুম্ম জনগণের উল্লেখিত মৌলিক দাবীসমূহ পরিপূরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে ২৯৯ রাঙ্গামাটি আসনে শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা (জেএসএস এর সভাপতি) এবং ২৯৮ খাগড়াছড়ি আসনে ইঞ্জিনিয়ার শ্রী মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা (জেএসএস এর সহসাধারণ সম্পাদক) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁরা উভয়ে বই মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আমরা তাঁদের জন্য আপনাদের সমর্থন চাই। আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি এজন্য আমাদের কেউই আপনাদেরকে দুর্ব্যবহার বা বলপ্রয়োগ করবে না।

আমাদের লক্ষ্যসমূহ :

১) পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা।
২) পার্বত্য চট্টগ্রামে আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পূনর্বাসনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া।
৩) যে কোন সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলা।
৪) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সংসদের ভিতরে ও বাইরে, দেশে ও বিদেশে জনমত সৃষ্টি করা।
৫) আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ে সংসদের ভিতরে ও বাইরে জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।
৬) রাষ্ট্রীয় মূলনীতি- গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা কার্যকরকরণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলা।
৭) সমগ্র দেশে কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থের অনুকূলে সংসদের ভিতরে ও বাইরে সোচ্চার আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে যাওয়া।
৮) পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের মধ্যে ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া।
৯) পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান দুর্নীতি ও চরম দলীয়করণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।
১০) পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষী ও বাগান চাষীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
১১) উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, হেডম্যান, কার্বারী ও এনজিওসমূহ যাতে নির্বিঘেœ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে তজ্জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা।
১২) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাহাড়ী-বাঙালীর মধ্যকার সম্পর্কের উন্নতি সাধন করা।
১৩) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সাথে জনগণের সম্পর্কের উন্নতি সাধনে সক্রিয় ভুমিকা রাখা।
১৪) পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ উপযোগী কৃষি-প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। পাশাপাশি সমগ্র দেশের কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থের অনুকূলে সংসদের ভিতরে ও বাইরে সোচ্চার আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে যাওয়া।
১৫) পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক অবস্থার উপযোগী স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন ও সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে দায়িত্ববান ভূমিকা রাখা।
১৬) পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণে যথাযথ ভূমিকা রাখা।
১৭) পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত সকল জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
১৮) সবার জন্য মানসম্মত মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের উচ্চ-শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
১৯) প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
২০) স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীসমূহের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি সংরক্ষণ, চর্চা ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
২১) পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড এবং সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বরাদ্ধকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
২২) পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যুৎহীন দুর্গম এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
২৩) পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিসমূহের অস্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্যতায় নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণে দাতাগোষ্ঠীর অর্থ সহায়তা নিশ্চিত ও বৃদ্ধি করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
২৪) পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, সম্পর্ক উন্নয়ন ও সৃদৃঢ়করণের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, মিলনপুর, খাগড়াছড়ি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা কর্তৃক প্রচারিত।

১৬ ডিসেম্বর ২০১৩ খ্রীঃ

Micro Web Technology

আরো দেখুন

মহিলা কাউন্সিলর হলেন জোসনা-নির্মলা ও জুবায়তুন

রাঙামাটি পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডকে তিনভাগে বিভক্ত করে সৃষ্ট তিনটি নারী ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হিসেবে যথাক্রমে নির্বাচিত …

Leave a Reply