নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » ছাত্র সংঘর্ষ কেনো বারবার জাতিগত সংঘাতে রূপ নেয় ?

ছাত্র সংঘর্ষ কেনো বারবার জাতিগত সংঘাতে রূপ নেয় ?

২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি সরকারি কলেজে দু’পক্ষের ছাত্র সংঘর্ষ পরবর্তী জাতিগত সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রতিদিন যারা পেশাগত, ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন কাজে শহরের বিভিন্ন জায়গায় যেতেন, তারাই হঠাৎ সেদিন হয়ে পড়েছেন বিপদগ্রস্ত। পাহাড়ে সবচে সহজ একটি ‘গুজব’ পরিণত হয়েছে দুই জাতির সংঘর্ষের মূল কারণ। যারাই পেরেছেন তারাই গুজব রটিয়ে দুই পক্ষকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মূল সমস্যা ছিলো কলেজ বাসের সিট নিয়ে দুই ছাত্রের তর্ক। দুই ছাত্র থেকে তা দুই সংগঠন পরবর্তীতে তা দুই জাতির মধ্যে সংঘর্ষ। এখানেই থেমে থাকেনি। এরপর কলেজে শুরু হয় ইউনিফর্ম নিয়ে বেশ আন্দোলন-পাল্টা আন্দোলন।

এ বছরের শুরুতেই ১০ জানুয়ারি রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ উদ্বোধন নিয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) জেলায় হরতালের ডাক দেয়। মেডিকেল কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাস রাঙামাটি সদর মেডিকেলের পাশে করোনারি ইউনিটে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কলেজ উদ্বোধনের বিরোধিতা করে সেদিন পিসিপি হরতালের ডাক দিলে রাঙামাটি শহর হয়ে উঠে হঠাৎ ভীতিময় অবস্থা। সেই ভীতিময় অবস্থায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা হেঁটে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেতে চাইলে কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে পিসিপি’র নেতাকর্মীদের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। যা পরে জাতিগত সংঘর্ষে মোড় নেয়। এতে প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি এবং পরদিন সন্ধ্যার পর প্রশাসন শহরে কারফিউ জারি করতে বাধ্য হয়। প্রায় দুই দিন রাঙামাটির মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেনি।

গত ১০ অক্টোবর এক পাহাড়ি ছেলে ছাত্রলীগের মিছিলে যোগ দেওয়া নিয়ে আবারো সংঘর্ষে লিপ্ত হয় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও ছাত্রলীগ। এদিন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতাকর্মীদের হামলায় কলেজ গেইট সংলগ্ন বেশ কিছু দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়। এসময় কলেজে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে যায়। তবে প্রশাসনের শক্ত অবস্থানের কারণে সেদিনের ঘটনা বেশি দূর যেতে পারেনি।

গত তিন বছরে এই তিনটি ঘটনা ঘটেছে দু’পক্ষের ছাত্রদের সাথে। এতে একপক্ষ সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। অন্যপক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগ। পিসিপি তাদের সংগঠনকে প্রগতিশীল রাজনীতির ধারা হিসেবে প্রচার করে থাকে। একইভাবে দেশের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও প্রগতিশীলতার রাজনীতি করে আসছে। কিন্তু পাহাড়ে সাম্প্রতিক কার্যক্রমে দুইটি সংগঠনই প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে কাজ করছে। দুই ছাত্র সংগঠনের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে পাহাড়িদের নেতৃত্ব দিচ্ছে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও বাঙালিদের নেতৃত্ব দিচ্ছে ছাত্রলীগ। যদিও বা ছাত্রলীগে প্রচুর পাহাড়ি ছেলে রয়েছে। এবং বর্তমানেও জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে একজন পাহাড়ি আসীন রয়েছেন। তারপরও দুই সংগঠনের মারামারি পরবর্তীতে জাতিগত সংঘর্ষে রূপ নেওয়াটা এই এলাকার জন্য একটি অশনিসংকেত।

পাহাড়ে রাজনীতি ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলিয়েছে। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতি শান্তিচুক্তি করে। এই চুক্তির ফলে পাহাড়ি জনপদে শান্তির সুবাতাস শুরু হয়। শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে তখন বিএনপি ও জামায়াত বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলে রাজপথে তা প্রতিহত করেছে আওয়ামী লীগ। সেদিন চুক্তি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যুদ্ধাংদেহী অবস্থার কারণে অনেকেরই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ক্ষতি হয়েছে। অনেকেই আহত হয়েছে। কিন্তু সেদিন তা পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতে মোড় নেইনি। সেদিনও জনসংহতি সমিতি আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিলো। কিন্তু চুক্তির চার বছর পর ২০০১ সাল থেকে জাতীয় সংসদের নির্বাচন থেকেই পাহাড়ে আওয়ামী লীগ-জনসংহতি সমিতির সম্পর্ক দা-কুমড়ার সম্পর্কে পরিণত হয়। জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীও তার বিভিন্ন বক্তব্যে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ঘায়েলের পরিবর্তে জনসংহতি সমিতির বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ে কথাবার্তা বলেন। বিপরীতে জনসংহতি সমিতিও দীপংকর তালুকদার ও তাঁর দলকে বিভিন্ন সময়ে কটুক্তি, সমালোচনা করেছেন। গত নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে এই দুই সংগঠনের মধ্যে। তাদের এই রাজনীতি দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলে সময়ে সময়ে এই দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যাচ্ছে। এবং তা ছড়িয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে।
বিভিন্ন বক্তা বিভিন্ন সময় পার্বত্যাঞ্চল নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা বলে আসছে। সেই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র খুবই সুক্ষèভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ি-বাঙালি ইস্যু নিয়ে খুবই সচেতনভাবে কিছু ব্যক্তি ও কিছু সংগঠন মানুষের মাঝে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। যখন কারো সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়, তারাই তখন তা গুজব রটিয়ে তা জাতিগত সংঘর্ষে রূপ দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ না বুঝে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সবকিছুতেই সাম্প্রদায়িকতার ধোঁয়া তুলে উন্নয়নমূলক কাজে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষেরও এখন বোঝার সময় এসেছে। যারা ঝগড়া করতে চাইবে, তারা ঝগড়া করুক। তা যেন কোনোভাবেই জাতিগত সংঘর্ষে মোড় নিতে না পারে। আমার আপনার ভাই, বোন, মা বাবা শহরের কোনো না কোনো জায়গায় প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। উস্কানিদাতাদের খেয়ালখুশি মতো উস্কানিতে জড়িয়ে না পড়ে তাদের সেই উস্কানির সময় সকল পক্ষ সজাগ থেকে ‘গুজব’ প্রতিহত করতে হবে। প্রতিদিন আমাদের সন্তানরা বিদ্যালয়, কলেজে যাচ্ছে। আমরা চাই না তাদের জীবন শঙ্কায় কাটুক। তাই যাদের স্বার্থের মারামারি শুধুই তারাই মারামারিতে থাকুক, সাধারণ জনগণ নয়। তবেই শান্তিতে থাকবে এই জনপদ।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে এক দিনেই ১১ জনের করোনা শনাক্ত

শীতের আবহে হঠাৎ করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায় করোনা সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিগত কয়েকদিনের …

Leave a Reply